বিড়ালের আঁচড়ে শিশুর ‘মিউ মিউ’ গুঞ্জন: নেপথ্যে জলাতঙ্ক নয়, তীব্র প্যানিক অ্যাটাক

নয়ন তারা

২৬ আগস্ট ২০২৬, ১২:০১ এএম


বিড়ালের আঁচড়ে শিশুর ‘মিউ মিউ’ গুঞ্জন: নেপথ্যে জলাতঙ্ক নয়, তীব্র প্যানিক অ্যাটাক

 

পোষা বিড়ালের আঁচড় কিংবা কামড়ে জলাতঙ্ক হতে পারে—এমন সাধারণ আতঙ্ক থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক বিষাদময় বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছিল। বিড়ালের মতো ‘মিউ মিউ’ শব্দ করা এক নিষ্পাপ শিশুর স্পর্শকাতর ভিডিও ক্লিপ গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ার পর লাখ লাখ মানুষ সেটিকে ‘জলাতঙ্ক’ বা ‘নাটক’ বলে মন্তব্য করতে থাকেন। তবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের গভীর পর্যবেক্ষণ, ঢাকার মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং শিশুটির মায়ের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে যে, এটি জলাতঙ্ক কিংবা কোনো অলৌকিক ঘটনা নয়; বরং মানসিকভাবে চরম ভীতি থেকে সৃষ্টি হওয়া ‘প্যানিক অ্যাটাক’ (Panic Attack)।

ঘটনাটির সূত্রপাত কুষ্টিয়া জেলার ভেড়ামারা উপজেলার বাহিরচর এলাকায়। সেখানকার স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যাংক কর্মকর্তা সাব্বিরের পাঁচ বছর বয়সী শিশুসন্তান মুস্তারীন আদ্রিতাকে ঘিরে এই চাঞ্চল্য ছড়ায়। গত ১৭ আগস্ট (রবিবার) সন্ধ্যায় শিশুটি অসুস্থ হয়ে পড়লে এবং বিড়ালের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত শব্দ করতে থাকলে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে আসা হয়। পরিবার জানায়, কয়েক মাস আগে তাদের বাসার পোষা বিড়াল শিশুটিকে আঁচড় দিয়েছিল, যদিও পাঁচ মাস আগেই শিশুটিকে প্রতিষেধক (র‍্যাবিস ভ্যাকসিন) দেওয়া হয়েছিল। পরে হাসপাতালের চিকিৎসকদের পরামর্শে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকার মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে অনুসন্ধানে উঠে আসে বিস্তারিত তথ্য। গণমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওতে কোনো প্রকার স্থান, তারিখ বা চিকিৎসকের মতামত না থাকায় নেটিজেনরা অহেতুক উপহাস ও নানা কাল্পনিক ব্যাখ্যা দিতে থাকেন। কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালের আরএমও ডা. ইকবাল হোসেন ২২ আগস্ট জানান, শিশুটিকে সাধ্যমতো চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে এবং তার শরীরে জলাতঙ্কের কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ মেলেনি। অতিরিক্ত ভয় বা মানসিক চাপের কারণেই শিশুটির এমন অস্বাভাবিক আচরণ হতে পারে বলে তিনি আশঙ্কাপ্রকাশ করেন। একই দিন সন্ধ্যায় শিশুটির মামা মো. আলিফ রহমান ফেসবুকে ভিডিও প্রকাশ করে জানান, শিশুটি এখন হাঁটতে পারছে এবং গুজবে কান না দিয়ে না জেনে বাজে মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানান।

ঢাকার মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে বিস্তৃত অনুসন্ধানের পর চিকিৎসকরা নিশ্চিত করেছেন, এটি জলাতঙ্কের ঘটনা নয়। আদ্রিতার মা জানান, শিশুটি গত দুই বছর ধরে ঠান্ডা ও অ্যাজমার জটিলতায় ভুগছিল। সম্প্রতি তাদের বাসায় থাকা দুটি পোষা বিড়াল হঠাৎ নিখোঁজ হয়ে গেলে শিশুটি প্রচণ্ড মানসিক ধাক্কা খায়। বিড়াল চলে যাওয়ার পর থেকেই তার মধ্যে তীব্র আতঙ্ক জন্ম নেয় এবং এর পরিণতিতে প্যানিক অ্যাটাক শুরু হয়। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, ফুসফুসের এক্স-রে সহ অন্যান্য সব রিপোর্ট সন্তোষজনক হলে খুব দ্রুতই তাকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়া হবে।

চিকিৎসাবিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক গবেষণাও এই প্যানিক অ্যাটাকের ব্যাখ্যা প্রদান করে। প্রাণি চিকিৎসকদের মতে, বিড়ালের আঁচড় থেকে ব্যাকটেরিয়াজনিত ‘ক্যাট স্ক্র্যাচ ডিজিজ’ (Bartonella henselae) বা শারীরিক ব্যথা হতে পারে, কিন্তু এতে মানুষের স্বর বদলে বিড়ালের মতো শব্দ হওয়া বৈজ্ঞানিকভাবে অসম্ভব। ইউনিসেফ (UNICEF) ও বৈশ্বিক স্বাস্থ্য নির্দেশিকা ‘এমএসডি ম্যানুয়ালস’ (MSD Manuals)-এর তথ্য অনুযায়ী, শিশুরা প্রচণ্ড আতঙ্কের মুখোমুখি হলে গলার পেশি সংকুচিত হয়ে শ্বাসপ্রশ্বাসের গতি অস্বাভাবিক হয়ে যায়, ফলে গলায় অদ্ভূত শব্দের সৃষ্টি হতে পারে। এছাড়া ২০১৭ সালের এক মানসিক স্বাস্থ্য গবেষণায় দেখা যায়, চরম ভীতিজনক পরিস্থিতিতে শিশুরা ‘ডিসোসিয়েশন’ (Dissociation) বা বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্নতার পর্যায়ে চলে গিয়ে অবচেতনভাবে পরিচিত কোনো প্রাণীর ডাক অনুকরণের চেষ্টা করতে পারে।

এই সংবেদনশীল ঘটনাটি আধুনিক সাংবাদিকতা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দায়িত্বশীলতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে ধরেছে। কোনো তথ্য যাচাই-বাছাই না করে, রোগীর সুরক্ষা বা স্থান-কাল উল্লেখ না করে সংবেদনশীল ভিডিও প্রকাশ করা একটি অসুস্থ শিশু ও তার পরিবারের জন্য মারাত্মক মানসিক পীড়নের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও শিশু চিকিৎসকরা জোর দিয়ে বলছেন, যেকোনো শারীরিক বা মানসিক অস্বাভাবিকতাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের আলোকেই ব্যাখ্যা করা উচিত। গণমাধ্যম ও সাধারণ নাগরিক উভয়েরই উচিত স্পর্শকাতর ও বিভ্রান্তিকর তথ্যে কান না দিয়ে দায়িত্বশীল ও সহানুভূতিশীল আচরণের পরিচয় দেওয়া।

 

Ads