এসএসসিতে ১৯ বছরের সর্বনিম্ন পাসের হার

ধাক্কা ইংরেজি ও গণিতে, নির্মোহ মূল্যায়নের বার্তা

নয়ন তারা

১১ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৪০ এএম


ধাক্কা ইংরেজি ও গণিতে, নির্মোহ মূল্যায়নের বার্তা

 

টানা কয়েক বছর উচ্চ পাসের হারের পর মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফলে আবার বড় ধরনের পতন ঘটেছে। প্রশ্নপত্রের ধরণ, খাতা মূল্যায়নে কঠোরতা এবং প্রধান দুটি বিষয়সহ মানবিক বিভাগে বড় ধরনের শিখনঘাটতির কারণে এবার সার্বিক ফলাফলে এই প্রভাব পড়েছে। দীর্ঘ ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পাসের হারের পাশাপাশি সার্বিক জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যাও লক্ষণীয়ভাবে কমেছে।

গতকাল সোমবার সকালে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে এক অনাড়ম্বর আয়োজনের মাধ্যমে ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীন অনুষ্ঠিত ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল একযোগে প্রকাশ করা হয়। দেশের মাধ্যমিক শিক্ষার ইতিহাসে এই ফলাফল শিক্ষার্থীদের শিখনমান এবং শ্রেণিকক্ষের পাঠদান প্রক্রিয়া নিয়ে শিক্ষাবিদ ও অভিভাবকদের মাঝে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

প্রকাশিত ফলাফল পর্যালোচনায় দেখা যায়, দেশের ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে এবার পাসের হার দাঁড়িয়েছে ৬৪ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশে, যা ২০০৭ সালের পর সর্বনিম্ন। গত বছরও এই পাসের হার ছিল ৬৮ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ। এবার ১৪ লাখ ৪ হাজার ৫৩৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ৮ লাখ ৯৯ হাজার ৬১০ জন। ফলশ্রুতিতে এক-তৃতীয়াংশের বেশি, অর্থাৎ ৫ লাখ ৪ হাজার ৯২৯ জন শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হতে পারেনি। একই সঙ্গে সর্বোচ্চ সাফল্য জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ৬ হাজার ৯ জন শিক্ষার্থী, যা গত বছরের (১ লাখ ২৫ হাজার ১৮ জন) তুলনায় প্রায় ১৯ হাজার কম। ফলাফলে ঢাকা বোর্ড শীর্ষ স্থান দখল করলেও সবচেয়ে পিছিয়ে রয়েছে ময়মনসিংহ বোর্ড। এছাড়া শতভাগ অকৃতকার্য প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা গত বছরের ৪৮টি থেকে বেড়ে এবার ৫৭টিতে পৌঁছেছে।

বরাবরের মতোই ফলাফলের মেধা ও পাসের সূচকে ছেলেদের পেছনে ফেলে এগিয়ে রয়েছে ছাত্রীরা। এবার মেয়েদের পাসের হার প্রায় ৬৮ শতাংশ, যেখানে ছেলেদের পাসের হার মাত্র ৬০ শতাংশের কাছাকাছি। জিপিএ-৫ প্রাপ্তির ক্ষেত্রেও ৫৮ হাজারেরও বেশি ছাত্রী এই অর্জন তুলে নিয়েছে, আর ছেলেদের ক্ষেত্রে এই সংখ্যা প্রায় ৪৭ হাজার।

শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের মতে, ফলাফলের এই নিম্নমুখী প্রবণতার প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে আবশ্যিক বিষয় ইংরেজি ও গণিতে বিপর্যয় এবং মানবিক বিভাগের দুর্বল পারফরম্যান্স। কুমিল্লা বোর্ড ব্যতীত বাকি আটটি বোর্ডে ইংরেজিতে পাসের হার ৮০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। এমনকি ময়মনসিংহ বোর্ডে ইংরেজিতে পাসের হার প্রায় ৬৭ শতাংশ এবং গণিতে ৭০ শতাংশ। সেরা ফলাফল করা ঢাকা বোর্ডেও ইংরেজিতে পাসের হার গত বছরের ৮৮ শতাংশ থেকে নেমে ৭৮ শতাংশের ঘরে পৌঁছেছে। অন্যদিকে, বিজ্ঞান বিভাগে পাসের হার ৮০ শতাংশের বেশি হলেও ৬ লাখের বেশি পরীক্ষার্থী থাকা মানবিক বিভাগে পাসের হার ছিল অত্যন্ত হতাশাজনক; যেখানে ছেলেদের পাসের হার মাত্র ৪১ শতাংশ এবং মেয়েদের ৫৪ শতাংশ।

ফলাফলের এমন পরিস্থিতি নিয়ে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানান, উত্তরপত্র মূল্যায়নে কোনো প্রকার শিথিলতা না দেখানোর কারণেই এই বাস্তবসম্মত ফল এসেছে। তিনি মন্তব্য করেন, "মন খুলে গান গাওয়া যায়, তবে পরীক্ষার খাতায় ইচ্ছেমতো নম্বর দেওয়া যায় না।" একই প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, "এবারের এসএসসি পরীক্ষার উত্তরপত্র অত্যন্ত নির্মোহ ও নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে। ফলে শিক্ষার্থীরা যেভাবে পড়াশোনা করে পরীক্ষার খাতায় লিখেছে, ঠিক সেভাবেই তাদের ফলাফল তৈরি হয়েছে।"

বাংলাদেশের তিন দশকের এসএসসির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৯০ সালে পাসের হার ছিল মাত্র ৩২ শতাংশ। ১৯৯২ সালে এমসিকিউ (বহুনির্বাচনী প্রশ্ন) চালুর পর ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত পাসের হার ৬১ থেকে ৭৩ শতাংশে ওঠানামা করে। পরবর্তীতে ২০০৭ সালে পাসের হার কমে ৫৭ শতাংশে নামলেও ২০০৮ সাল থেকে সৃজনশীল পদ্ধতি চালুর পর থেকে পাসের হার ৮০ থেকে ৯০ শতাংশের কোটায় পৌঁছায়। দীর্ঘ সময় উচ্চ পাসের হার বজায় থাকার পর গত দুই বছর ধরে টানা পাসের হার হ্রাস পাওয়া মূলত খাতা মূল্যায়নের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন এবং শিক্ষার্থীদের করোনা-পরবর্তী শিখনঘাটতিরই প্রতিফলন।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ১০ বছর পড়াশোনা করার পর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়া এবং ইংরেজি-গণিতের মতো বিষয়ের দুর্বলতা দূর করতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে মানসম্মত শিক্ষক নিয়োগ ও বিষয়ভিত্তিক পাঠদানের দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। কেবল পাসের হার বা জিপিএ-৫ নিয়ে আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সার্বিক শিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামোগত পুনর্বিন্যাস এখন সময়ের দাবি।

Ads