মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগে আবারও সিন্ডিকেটের ছায়া: স্বচ্ছতা নিশ্চিতে জোর দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক

২৩ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৫২ এএম


মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগে আবারও সিন্ডিকেটের ছায়া: স্বচ্ছতা নিশ্চিতে জোর দাবি

 

বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগের জন্য ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সির একটি নতুন তালিকা প্রকাশ পেয়েছে, যার বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানই অখ্যাত ও অপরিচিত। কর্মী নির্বাচনের মানদণ্ড গোপন রাখা এবং সীমিত সংখ্যক এজেন্সিকে কাজ দেওয়ার এই পুরনো পদ্ধতি দেশের শ্রমবাজারে আবারও সিন্ডিকেট ও ব্যাপক দুর্নীতির গভীর আশঙ্কা তৈরি করেছে। অতীতে বারবার এমন সিন্ডিকেটের কারণেই মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধ হয়েছিল; তাই নতুন করে একই পথে হাঁটার খবরে জনশক্তি রপ্তানিকারক ও সাধারণ কর্মীদের মাঝে চরম উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারের অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ার খবরটি- প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং জনশক্তি ব্যবসায়ীদের সাথে আলোচনা সূত্রে প্রতিদিনের চিত্র বিডি নিশ্চিত হয়েছে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বাজার খোলার ইতিবাচক সম্ভাবনা তৈরি হওয়া এজেন্সির তালিকা বাছাইয়ে পুরনো ও বিতর্কিত পদ্ধতি অনুসরণ করায হয়েছে। এখন এ নিয়ে চলছে তুমুল সমালোচনা ও হতাশা।

এ বিষয়ে প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, মালয়েশিয়া সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও বাংলাদেশকে কোনো তথ্য জানায়নি। তবে বেসরকারি প্ল্যাটফর্ম ফরেন ওয়ার্কার্স সেন্ট্রালাইজড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এফডব্লিউসিএমএস) থেকে ২৫টি এজেন্সির যে তালিকা দেওয়া হয়েছে, তার ভিত্তিতে মালয়েশিয়ার কাছে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা চেয়ে শনিবার চিঠি পাঠানো হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য হলো, দেশের স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে এবং সকল সক্ষম এজেন্সির অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করে কর্মী পাঠানো। সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ ডিসেম্বর পর্যন্ত থাকায় বর্তমান নিয়মে কর্মী পাঠাতে হলেও, পরবর্তীতে বাংলাদেশ নতুন চুক্তির দিকে হাঁটবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।

জনশক্তি ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, নির্বাচিত এই ২৫টি এজেন্সি প্রত্যেকে পাঁচ কোটি টাকা করে চাঁদা দিয়ে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও ১২ কোটি টাকা দেওয়ার অলিখিত চুক্তি করেছে। এই বিপুল পরিমাণ টাকার পুরোটাই শেষ পর্যন্ত সাধারণ কর্মীদের পকেট থেকে আদায় করা হবে। এবারের তালিকায় সরাসরি কোনো শীর্ষ রাজনীতিবিদের নাম না থাকলেও তাদের আত্মীয়-স্বজন ও অনুগতদের ‘ডামি’ প্রতিষ্ঠান জায়গা পেয়েছে। যেমন— যুবদল নেতার স্ত্রীর মালিকানাধীন ‘ম্যানগ্রোভ ক্যারিয়ার’, প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের এক কর্মকর্তার আত্মীয়র ‘আত-তাকওয়া’, এবং বিগত সরকারের নিষিদ্ধ সংগঠনের নেতার স্ত্রীর ‘ইউনাইটেড গালফ সার্ভিস’।

মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগে সিন্ডিকেটের মূল কারিগর হিসেবে পরিচিত দাতো আমিনুল ইসলাম বিন আবদুর নূরের প্রতিষ্ঠান ‘বেস্টিনেট’ নিয়ন্ত্রিত প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমেই এই তালিকা এসেছে। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এই ব্যবসায়ী ২০২২ সালে অনিয়মের অভিযোগে গ্রেপ্তার হলেও বর্তমানে আবারও কলকাঠি নাড়ছেন। এছাড়া, গত বছর ঢাকায় সিন্ডিকেটবিরোধী সংবাদ সম্মেলনে হামলাকারী তিন ব্যক্তির মালিকানাধীন এজেন্সি (মাদারল্যান্ড ওভারসিজ, চাঁদপুর ইন্টারন্যাশনাল ও আর্থ স্মার্ট বাংলাদেশ) কীভাবে এই তালিকায় স্থান পেল, তা নিয়ে জনশক্তি ব্যবসায়ীদের সংগঠন বায়রার সাবেক নেতারা তীব্র বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।

মালয়েশিয়ার এমন একচেটিয়া নীতির বিরুদ্ধে এরই মধ্যে কঠোর অবস্থান নিয়েছে নেপাল। ১০টি এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী পাঠানোর মালয়েশিয়ান প্রস্তাবকে ‘সিন্ডিকেট’ আখ্যা দিয়ে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে নেপাল সরকার। তারা সব বৈধ এজেন্সির জন্য বাজার উন্মুক্ত রাখার দাবি জানিয়েছে। অথচ বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ার বেঁধে দেওয়া কঠিন শর্ত পূরণে সক্ষম ৪২৩টি এজেন্সির তালিকা করা হলেও (যার মধ্যে ৪৯টি বিতর্কিত এজেন্সি বাদে ৩৭৪টি বৈধ), সেখান থেকে মাত্র ২৫টিকে বেছে নেওয়া হয়েছে, যা স্পষ্টতই বৈষম্যমূলক ও অন্যায্য।

উল্লেখ্য, ২০২২ সালের আগস্ট থেকে ২০২৪ সালের মে মাস পর্যন্ত সিন্ডিকেটের কারণে বিপুল ব্যয়ে প্রায় ৪ লাখ ৭৬ হাজার কর্মী মালয়েশিয়ায় গিয়েছিলেন। সরকার নির্ধারিত ৭৮ হাজার টাকার বদলে জনপ্রতি গড় ব্যয় হয়েছিল ৫ লাখ ৪৪ হাজার টাকা। অনেকেই সেখানে গিয়ে প্রতিশ্রুত কাজ পাননি এবং প্রায় ১৭ হাজার কর্মী সব প্রক্রিয়া শেষ করেও মালয়েশিয়ায় যেতে পারেননি। বর্তমান পরিস্থিতিতে ‘প্রতিদিনের চিত্র’ পত্রিকার সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, পুরনো সমঝোতা স্মারকের আওতায় সেই মাইগ্রাম অ্যাপ ও ই-ওয়ালেটের মাধ্যমে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের ফাঁদ আবারও তৈরি হচ্ছে। তাই সাধারণ কর্মীদের সুরক্ষা ও শ্রমবাজারের দীর্ঘমেয়াদী স্বার্থে, বাংলাদেশ সরকারকে অনতিবিলম্বে মালয়েশিয়ার সাথে কঠোর আলোচনার মাধ্যমে একটি সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, জবাবদিহিতামূলক এবং সিন্ডিকেটমুক্ত নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে।

Ads