পার্বত্য চট্টগ্রামে অফ-গ্রিড সৌরবিদ্যুৎ হতে পারে দুর্গম এলাকায় বিদ্যুতায়নের টেকসই সমাধান
৩০ আগস্ট ২০২৬, ০৩:৩৫ পিএম
জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা কমানো, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সুবিধা নিশ্চিত করতে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন বক্তারা। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগোলিক বাস্তবতায় জাতীয় গ্রিড সম্প্রসারণের পাশাপাশি অফ-গ্রিড ও ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
রোববার (৩০ আগস্ট ২০২৬) দুপুরে খাগড়াছড়িতে ‘ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের সুফল: জনগণের জ্ঞান, ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যৎ করণীয়’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন খাগড়াছড়ির অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ও খাগড়াছড়ি পৌরসভার প্রশাসক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) রুমানা আক্তার।
এফইডি (FED) খাগড়াছড়ির সদস্য প্রিয় কুমার চাকমার সভাপতিত্বে সভায় বক্তব্য দেন পেরাছড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান তপন বিকাশ ত্রিপুরা, ভাইবোনছড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সুজন চাকমা, কমলছড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সুনীল চাকমা, খাগড়াছড়ি আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অংপ্রু মারমা, সাংবাদিক আবু তাহের মাহমুদ ও নারী অধিকারকর্মী নমিতা চাকমা।
জাবারাং কল্যাণ সমিতির প্রোগ্রাম অফিসার বিদ্যুৎ জ্যোতি চাকমার সঞ্চালনায় সভায় স্বাগত বক্তব্য ও পাওয়ার পয়েন্ট উপস্থাপন করেন জাবারাং কল্যাণ সমিতির প্রকল্প সমন্বয়কারী দয়ানন্দ ত্রিপুরা।
পাওয়ার পয়েন্ট উপস্থাপনায় দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের আমদানিনির্ভরতা এবং এর অর্থনৈতিক প্রভাব তুলে ধরা হয়। উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত প্রায় ৬৫ শতাংশ আমদানিনির্ভর। প্রতিবছর জ্বালানি আমদানিতে প্রায় ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় হয় বলেও এতে উল্লেখ করা হয়।
উপস্থাপনায় আরও বলা হয়, গত সাত বছরে দেশে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি বার্ষিক গড়ে ২৫ দশমিক ৭ শতাংশ এবং কয়লা আমদানি ৪০ দশমিক ৫ শতাংশ হারে বেড়েছে। ২০০৭-০৮ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিউবো) মোট ক্ষতির পরিমাণ ২ লাখ ৬৭ হাজার ৭৮৪ কোটি টাকা বলে উপস্থাপনায় উল্লেখ করা হয়।
ফার্নেস তেলনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় নিয়েও আলোচনা করা হয়। উপস্থাপিত হিসাবে, বিউবো গড়ে প্রতি লিটার ফার্নেস তেল ৮৫ টাকা দরে কিনেছে এবং এতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় হয়েছে ২৭ দশমিক ৩৬ টাকা। গত পাঁচ বছরে ফার্নেস তেল আমদানিতে ১১ হাজার ২৫৭ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে এবং এর সঙ্গে উল্লেখযোগ্য কার্বন নিঃসরণের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়।
সভায় দেশের আবাসিক, শিল্প-বাণিজ্যিক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অব্যবহৃত ছাদকে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
উপস্থাপনায় বলা হয়, দেশের প্রায় ৪ কোটি ২ লাখ পরিবারের ৪১ শতাংশ বাসস্থানে অন্তত ১ কিলোওয়াট ক্ষমতার সৌর প্যানেল স্থাপনের সম্ভাবনা রয়েছে। এভাবে প্রায় ১৬ হাজার ৩৬১ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানানো হয়।
এ ছাড়া শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের অব্যবহৃত ছাদ ব্যবহার করে ১২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরা হয়। দেশের ১২ হাজার ৮৪৬টি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাদেও সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের সুযোগ রয়েছে বলে উপস্থাপনায় উল্লেখ করা হয়।
পরিবার পর্যায়ে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের অর্থনৈতিক সুবিধার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়। উপস্থাপনায় বলা হয়, একটি সাধারণ পরিবারের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে ৩ কিলোওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা ব্যবহার করা যেতে পারে। এর প্রাথমিক স্থাপন ব্যয় আনুমানিক ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা এবং প্রায় পাঁচ বছরে বিনিয়োগের অর্থ উঠে আসতে পারে বলে আয়োজকদের হিসাবে উল্লেখ করা হয়।
একটি সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার সম্ভাব্য আয়ুষ্কাল প্রায় ২৫ বছর ধরে হিসাব করলে বিনিয়োগের অর্থ উঠে যাওয়ার পর দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ বিল সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলেও সভায় জানানো হয়।
সভায় পার্বত্য চট্টগ্রামের ভৌগোলিক বাস্তবতা বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়। রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির দুর্গম পাহাড়, ঘন বন, বিচ্ছিন্ন বসতি এবং দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থার কারণে অনেক এলাকায় প্রচলিত বিদ্যুৎ গ্রিড সম্প্রসারণে বাড়তি ব্যয় ও কারিগরি জটিলতা রয়েছে বলে বক্তারা উল্লেখ করেন।
ঝড়-বৃষ্টি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে পাহাড়ি এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় আসে। এ অবস্থায় দুর্গম ও বিচ্ছিন্ন বসতিতে স্থানীয়ভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ তৈরি করতে অফ-গ্রিড সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বক্তারা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের সব এলাকায় একই ধরনের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা কার্যকর নাও হতে পারে। যেখানে জাতীয় গ্রিড সম্প্রসারণ সম্ভব ও অর্থনৈতিকভাবে যুক্তিসংগত, সেখানে গ্রিডভিত্তিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি দুর্গম এলাকায় প্রয়োজন অনুযায়ী সৌরবিদ্যুৎ ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থার সমন্বিত ব্যবহার করা যেতে পারে।
সভায় সৌরবিদ্যুৎ খাতকে শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যম হিসেবে না দেখে নতুন কর্মসংস্থান ও স্থানীয় অর্থনীতির সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে বিবেচনার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। সৌর প্যানেল স্থাপন, রক্ষণাবেক্ষণ, কারিগরি সেবা ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায় স্থানীয় তরুণদের প্রশিক্ষণ দিয়ে যুক্ত করার সুযোগ রয়েছে বলে বক্তারা মত দেন।
আয়োজকদের উপস্থাপনায় ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়িত হলে আবাসিক ও বাণিজ্যিক খাতে ৩ লাখ ৬৬ হাজারের বেশি কর্মসংস্থানের সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরা হয়।
বক্তারা বলেন, জীবাশ্ম জ্বালানির আমদানিনির্ভরতা কমাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন বাড়ানো প্রয়োজন। এতে একদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিকল্প উৎস বাড়বে, অন্যদিকে জ্বালানি নিরাপত্তা ও পরিবেশ সুরক্ষায় ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
প্রয়োজন নীতি সহায়তা ও জনসম্পৃক্ততা
সভায় ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের প্রসারে সাধারণ মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সহজ অর্থায়ন, কারিগরি সহায়তা, মানসম্মত যন্ত্রপাতি, রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা এবং কার্যকর নীতিগত সহায়তার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়।
বিশেষ করে সরকারি ভবন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং দুর্গম পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বসতিতে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতে সমন্বিত পরিকল্পনা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় ও পরিবেশ সুরক্ষার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য অর্জনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি। আর পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে ভৌগোলিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে গ্রিড ও অফ-গ্রিড—দুই ধরনের ব্যবস্থাকে সমন্বয় করেই টেকসই বিদ্যুতায়নের পথ তৈরি করতে হবে।




















