প্রশাসনে আ.লীগের অদৃশ্য নেটওয়ার্ক
স্থানীয় সরকার নির্বাচন হতে পারে মাঠের রাজনীতিতে ফেরার ‘এন্ট্রি পয়েন্ট’
২২ জুন ২০২৬, ০৭:০৭ এএম
৫ আগস্ট পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে ব্যাপক ওলটপালট ঘটেছে। সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আইনি নিষেধাজ্ঞা ও নিবন্ধন স্থগিত থাকার কারণে দল হিসেবে অংশ নিতে পারেনি বিগত ১৫ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। তবে জাতীয় নির্বাচনের অধ্যায় পেরিয়ে যাওয়ার পর এবার দলটির তৃণমূল ও মধ্যম সারির নেতা-কর্মীরা নির্বাচনী রাজনীতিতে ফেরার ভিন্ন কৌশল ও পথ খুঁজছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ শুরু হতে যাওয়া আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোই (সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ) হতে পারে আওয়ামী লীগের মাঠের রাজনীতিতে পুনরুত্থানের প্রধান ‘এন্ট্রি পয়েন্ট’ বা প্রবেশদ্বার। তবে এই প্রত্যাবর্তনের ছকের পেছনে সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে প্রশাসন, পুলিশ ও অন্যান্য স্পর্শকাতর রাষ্ট্রীয় সংস্থায় দীর্ঘ দেড় দশকে শিকড় গেড়ে বসা আওয়ামী লীগপন্থী কট্টর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এক বিশাল এবং অদৃশ্য নেটওয়ার্ক।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গোয়েন্দা সূত্রগুলোর মতে, দল হিসেবে আওয়ামী লীগের প্রকাশ্য কার্যক্রম নিষিদ্ধ বা স্থগিত থাকলেও প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে একটি শক্তিশালী ‘ডিপ স্টেট’ (রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে সমান্তরাল গোপন শক্তি) এখনো সক্রিয় রয়েছে। বিগত সরকারের আমলে সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক আনুগত্য ও বিশেষ কোটার ভিত্তিতে নিয়োগ পাওয়া আমলারা এখন ভেতরে ভেতরে কলকাঠি নাড়ছেন। বাংলাদেশ সচিবালয়ের নীতি-নির্ধারণী পর্যায় থেকে শুরু করে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ও মাঠপ্রশাসনে আওয়ামী আমলে সুবিধাভোগী কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ কৌশলগত অবস্থান বজায় রেখেছে। অনেক জেলায় জেলা প্রশাসক (ডিসি) এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে থাকা কর্মকর্তারা নতুন সরকারের নীতিমালার সঙ্গে বাহ্যিক সামঞ্জস্য দেখালেও, ভেতরে ভেতরে সাবেক শাসকদলের স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন বলে বিভিন্ন মহলে গুঞ্জন রয়েছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সময় এই আমলাতান্ত্রিক সিন্ডিকেট দলীয় অনুসারী বা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য নির্বাচনী পরিবেশ অনুকূলে রাখার ক্ষেত্রে পর্দার আড়াল থেকে বড় ধরনের ‘গুটি’ চালতে পারে।
প্রশাসনের চেয়েও মাঠপর্যায়ে সবচেয়ে সংবেদনশীল ভূমিকা রাখতে পারে পুলিশ বাহিনী। বিগত সরকারের আমলে পুলিশ ক্যাডারে নিয়োগ পাওয়া বেশ কয়েকটি বিসিএস ব্যাচের কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। ব্যাপক রদবদল সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ে এখনো বহু বিতর্কিত ইনস্পেক্টর এবং ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কৌশলে গুরুত্বপূর্ণ থানাগুলোর দায়িত্ব ধরে রেখেছেন অথবা নতুন করে পদায়ন বাগিয়েছেন। গোয়েন্দা প্রতিবেদন ও রাজনৈতিক দলগুলোর অভিযোগ অনুযায়ী, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের এই পুলিশ কর্মকর্তারা স্থানীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের গোপনে আইনি সুরক্ষা দেওয়া, নির্বাচনী প্রচারণায় প্রশাসনিক সুবিধা দেওয়া এবং প্রতিপক্ষ দলের প্রার্থীদের ওপর প্রচ্ছন্ন মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টির কাজ করতে পারেন। পুলিশের এই অংশটি স্থানীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মাঠের নিয়ন্ত্রণ সাবেক দলটির অনুসারীদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য পেছনের দরজা (ব্যাকডোর) হিসেবে কাজ করছে।
সিভিল প্রশাসন ও পুলিশের পাশাপাশি প্রতিরক্ষা বা সশস্ত্র বাহিনীর একটি অংশকে নিয়েও রাজনৈতিক মহলে গভীর চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে। বিগত দেড় দশকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে সামরিক বাহিনীতে পেশাদারিত্বের চেয়ে রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বকে গুরুত্ব দিয়ে বহু অফিসারকে গুরুত্বপূর্ণ কমান্ড ও গোয়েন্দা সংস্থায় পদায়ন দেওয়া হয়েছিল। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন পরবর্তী সরকারের সময় সামরিক বাহিনীতে শুদ্ধি অভিযান ও বড় ধরনের সংস্কার কার্যক্রম চালানো হলেও, এখনো এমন অনেক কর্মকর্তা দায়িত্বশীল পদে রয়েছেন যারা বিগত সরকারের আমলে ব্যাপক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেছেন। এদের মধ্যে অনেক অফিসার বর্তমানে সিভিল প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্তরে প্রেষণে (ডেপুটেশনে) কর্মরত আছেন অথবা মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলার তদারকিতে সম্পৃক্ত। বিশ্লেষকদের ধারণা, স্থানীয় নির্বাচনের সময় এই অদৃশ্য সামরিক বা আধা-সামরিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা স্থানীয় সামাজিক ও রাজনৈতিক সমীকরণ নিজেদের পক্ষে নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সাম্প্রতিক বক্তব্য অনুযায়ী, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলো দলীয় প্রতীক ছাড়া সম্পূর্ণ নির্দলীয় বা স্বতন্ত্রভাবে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাসউদ ইতিমধ্যে সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ‘আইন অনুযায়ী প্রার্থীর যোগ্যতা থাকলেই যে কেউ ভোটে দাঁড়াতে পারবে, সেখানে কে কোন দলের তা বিবেচনার সুযোগ ইসির নেই।’ এই আইনি সুযোগটিকে আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতারা একটি বড় রাজনৈতিক ‘লাইফলাইন’ হিসেবে দেখছেন। দীর্ঘদিন আত্মগোপনে বা নিষ্ক্রিয় থাকা অনেক সাবেক এমপি, উপজেলা চেয়ারম্যান ও ইউপি চেয়ারম্যানরা এখন প্রচ্ছন্ন বা নাগরিক কমিটির ব্যানারে ভোটের মাঠে নামার জোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
তবে এই ‘এন্ট্রি পয়েন্ট’ ব্যবহার করে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী রাজনীতিতে ফেরার পথ কতটা মসৃণ হবে, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ। তিনি উল্লেখ করেন,
"স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা হয়তো ব্যক্তিগতভাবে ভোটে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবেন এবং প্রশাসনের একটি অংশ তাদের প্রচ্ছন্ন সুবিধা দিতে পারে। কিন্তু দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব এখনো পলাতক এবং বিগত আমলের কর্মকাণ্ডের কোনো সুনির্দিষ্ট অনুশোচনা বা রাজনৈতিক পর্যালোচনা ছাড়া কেবল প্রশাসনিক জোরে দলটির জাতীয়ভাবে রাজনৈতিক পুনরুত্থান সম্ভব কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।"
নাগরিকদের প্রশাসনিক ভোগান্তি দূর করতে অন্তর্বর্তীকালীন পরবর্তী নতুন নির্বাচিত সরকার ও নির্বাচন কমিশন ধাপে ধাপে স্থানীয় নির্বাচনের রোডম্যাপ চূড়ান্ত করছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, এই স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীরা যদি স্বতন্ত্র হিসেবে অংশ নেন, তবে মাঠপর্যায়ে বিজয়ী দল বিএনপি, জামায়াত এবং ছাত্র-জনতার রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে তাদের একটি নতুন মনস্তাত্ত্বিক ও সাংগঠনিক লড়াই শুরু হবে। দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো এবং সাধারণ ভোটাররা আওয়ামী লীগের এই সুপ্ত প্রশাসনিক নেটওয়ার্ক ও প্রচ্ছন্ন অংশগ্রহণকে কীভাবে মোকাবেলা করে এবং নতুন নির্বাচন কমিশন মাঠের অদৃশ্য প্রভাব রুখতে কতটা নিরপেক্ষ ভূমিকা রাখতে পারে—তার ওপরই নির্ভর করছে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির গতিপথ।
























