বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা ফিরছে পরিচালনা পর্ষদে, সৃষ্টি হতে পারে বিতর্ক

নয়ন তারা

১১ আগস্ট ২০২৬, ১০:০৯ এএম


শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা ফিরছে পরিচালনা পর্ষদে, সৃষ্টি হতে পারে বিতর্ক

 

মপিওভুক্ত বেসরকারি স্কুল ও কলেজে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় একটি বড় ধরনের পরিবর্তন আনার বিষয়টি বর্তমানে সরকারের পর্যালোচনায় রয়েছে। দীর্ঘ এক দশক ধরে কেন্দ্রীয়ভাবে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশ করা হলেও বিদ্যমান আইন অনুযায়ী এই ব্যবস্থা সংশোধন করে পুনরায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কমিটি বা গভর্নিং বডির হাতে নিয়োগের ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়ে নীতিগত দিকগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রস্তাবিত এ পরিবর্তন বাস্তবায়িত হলে ২০১৫ সাল থেকে চালু থাকা কেন্দ্রীয় সুপারিশ ভিত্তিক নিয়োগ পদ্ধতি স্থগিত হবে এবং এনটিআরসিএ মূলত ২০০৫ সালের মূল আইন অনুযায়ী কেবল নিবন্ধন পরীক্ষা গ্রহণ ও সনদ প্রদানের দায়িত্ব পালন করবে। অন্যদিকে, এনটিআরসিএ কর্তৃক সনদপ্রাপ্ত প্রার্থীদের মধ্য থেকে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ লিখিত, মৌখিক কিংবা নির্ধারিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ সম্পন্ন করার সুযোগ পাবে।

সম্প্রতি, গত ৩ আগস্ট (রবিবার) রাজধানীর সচিবালয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সম্মেলন কক্ষে এনটিআরসিএর সার্বিক কার্যক্রম পর্যালোচনা নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সভায় মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক এবং এনটিআরসিএর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আলিফ রুদাবাসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন। ওই বৈঠকের কার্যবিবরণী ও সূত্র থেকে জানা গেছে, প্রয়োজনীয় আইন ও বিধিমালা সংশোধন সাপেক্ষে পরিকল্পনা অনুযায়ী আসন্ন ১৯তম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা থেকেই এই নতুন ব্যবস্থা কার্যকর করা হতে পারে। এছাড়া ১৮তম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ৯ হাজার ৮৪২ জন সনদধারীকেও নিজ উদ্যোগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আবেদন করে পরিচালনা পর্ষদের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়ার সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। তবে সার্বিক বিষয়ে আলোড়ন সৃষ্টির পর মন্ত্রী তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, নিয়োগ ব্যবস্থা আরও স্বচ্ছ ও দক্ষ করার পর্যালোচনা চলছে এবং কমিটি কর্তৃক নিয়োগের কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও গৃহীত হয়নি।

গত দশকে কেন্দ্রীয়ভাবে এনটিআরসিএর মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক নিয়োগের ফলে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব, আর্থিক লেনদেন ও স্বজনপ্রীতি অনেকাংশে কমেছিল এবং এক লাখ ৭৭ হাজারেরও বেশি শিক্ষক স্বচ্ছভাবে সুপারিশ প্রাপ্ত হন। তবে বর্তমান ব্যবস্থায় দূরবর্তী জেলায় পদায়ন, শিক্ষকদের ঘন ঘন বদলির দাবি এবং শূন্য পদ পূরণে প্রশাসনিক জটিলতার সৃষ্টি হওয়ায় এনটিআরসিএকে তার আইনি সীমার (পরীক্ষা ও সনদ প্রদান) ভেতরে সীমাবদ্ধ রেখে স্থানীয়ভাবে নিয়োগের সুবিধা ও আইনি দিক পুনর্বিবেচনা করছে মন্ত্রণালয়। উল্লেখ্য, ইতোপূর্বে প্রজ্ঞাপন বাতিলের মাধ্যমে কর্মচারী নিয়োগের ক্ষমতাও পরিচালনা পর্ষদের হাতে ন্যস্ত করা হয়েছে।

শিক্ষক নিয়োগের ক্ষমতা পুনরায় স্থানীয় পরিচালনা পর্ষদের হাতে হস্তান্তরের সম্ভাবনা প্রকাশ পাওয়ার পর থেকেই শিক্ষাবিদ, বিভিন্ন শিক্ষক ও ছাত্র সংগঠন এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী, অভিভাবক ঐক্য ফোরামের সভাপতি জিয়াউল কবির দুলু এবং শিক্ষাবিদ অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদসহ সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নির্বাচিত কমিটি না থাকায় এবং অ্যাডহক কমিটি বিদ্যমান থাকায় সরাসরি কমিটি নিয়োগ দিলে স্বজনপ্রীতি, অর্থ লেনদেন ও দলীয় প্রভাবের পুরোনো সংস্কৃতি ফিরে আসার প্রবল ঝুঁকি রয়েছে। ইতোমধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু), জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও জামায়াতে ইসলামীসহ বেশ কিছু রাজনৈতিক ও ছাত্র সংগঠন এ উদ্যোগের প্রতিবাদ জানিয়ে স্বচ্ছ ও কেন্দ্রীয় মেধাভিত্তিক নিয়োগ বজায় রাখার ওপর জোর দিয়েছে। সরকারের চূড়ান্ত পদক্ষেপ গ্রহণের আগে আইনি কাঠামো ও প্রশাসনিক কাঠামোর সার্বিক পর্যালোচনা অব্যাহত রয়েছে।

 

Ads