খাগড়াছড়ি বাজার: তিক্ততা নয়, সংহতিমূলক বাজার ব্যবস্থাই কাম্য
০৪ জুলাই ২০২৬, ০৫:৪১ এএম
খাগড়াছড়ি শহরের কেন্দ্রীয় বাজার শুধুমাত্র একটি সাধারণ বাণিজ্যকেন্দ্র নয়। এটি পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক জীবনের স্পন্দন, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের অন্যতম মিলনস্থল এবং পাহাড়ি-বাঙালি জনগোষ্ঠীর পারস্পরিক নির্ভরশীলতার জীবন্ত প্রতীক। প্রতিদিন ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এই বাজারে চলে এক অসাধারণ কর্মযজ্ঞ। আগে কেবলমাত্র বৃহস্পতিবারে পূর্ণ বাজার আর সোমবারে হাফ বাজার হিসেবে বাজারটি সচল থোকলেও এখন প্রতিদিনই পূর্ণ বাজারের মতো হয়ে উঠেছে খাগড়াছড়ি বাজারের চেহারা। পাহাড়ের ঢাল থেকে নেমে আসা নারীরা ঝুড়ি মাথায় নিয়ে আনেন তাজা শাকসবজি, জুমের ফসল, বিভিন্ন ধরনের ফলমূল, মসলা, বনজ ঔষধি এবং অন্যান্য স্থানীয় উৎপাদিত দ্রব্য। অনেকে আবার এক বাজার থেকে বা গ্রাম থেকে পণ্য কিনে এনে বিক্রি করছেন খাগড়াছড়ি বাজারে। এই ক্ষুদ্র ব্যবসার ওপর নির্ভর করে চলে শত শত পাহাড়ি পরিবারের দৈনন্দিন জীবিকা। অন্যদিকে স্থায়ী দোকানদাররা তাঁদের দোকান ঘরে বসে বিক্রি করেন মুদি, কাপড়, কসমেটিকস, ডিজিটাল সামগ্রী, মাছ-মাংস, ঔষধ, হার্ডওয়্যারসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। তাঁরা নিয়মিত ভাড়া, কর, কর্মচারীর বেতন ও অন্যান্য খরচ বহন করে বাজারের অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখেন।
এই দুই পক্ষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় খাগড়াছড়ি বাজার প্রতিদিন হাজার হাজার ক্রেতা-বিক্রেতার মিলনকেন্দ্র হয়ে ওঠে। কিন্তু দীর্ঘদিনের একটি কাঠামোগত সমস্যা এই সুন্দর সম্পর্ককে বারবার ক্ষতবিক্ষত করছে। বাজারের সীমিত জায়গায় ফুটপাতে বসা অস্থায়ী বিক্রেতাদের অনেককে স্থায়ী দোকানের সামনের অংশ দখল করে বসতে হয়। ফলে ক্রেতাদের চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়, গাড়ি চলাচলে সৃষ্টি হয় চরম দুর্ভোগ, দোকানে প্রবেশ-নির্গমন কষ্টকর হয়ে পড়ে। পাহাড়ি নারী বিক্রেতাদেরও বিকল্প উপযুক্ত জায়গার অভাবে এই অসুবিধা মেনে নিতে হয়। এই সংকট প্রায়ই মৌখিক তর্ক-বিতর্ক, অপমান এবং কখনো কখনো হাতাহাতিতে রূপ নেয়।
৩ জুলাই ২০২৬ তারিখে খাগড়াছড়ি বাজারে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক ঘটনাটি এই দীর্ঘদিনের সংকটেরই একটি বহিঃপ্রকাশ। ঘটনার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উভয় পক্ষের অনেকে উত্তেজনাপূর্ণ, বিদ্বেষমূলক এবং আংশিক তথ্যভিত্তিক মন্তব্য করতে শুরু করেন, যা দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায়। যাচাইবিহীন গুজব ও আবেগপ্রবণ পোস্টগুলো পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে। এমন মুহূর্তে সংযম, সত্যতা যাচাই এবং দায়িত্বশীল আচরণ অত্যন্ত জরুরি। সামাজিক মাধ্যমে ঘৃণা ছড়িয়ে কোনো পক্ষই দীর্ঘমেয়াদে লাভবান হয় না। বরং তা পারস্পরিক অবিশ্বাস বাড়ায় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মনে বিভাজনের বীজ বপন করে।
এই ঘটনাকে শুধুমাত্র দুই গোষ্ঠীর স্বার্থগত বিরোধ হিসেবে দেখলে বাস্তবতা থেকে বিচ্যুত হওয়া হবে। এটি মূলত বাজার ব্যবস্থাপনার একটি দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত কাঠামোগত সমস্যা। যখন সীমিত সম্পদের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে, তখন সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে। তাই সমাধানের লক্ষ্য হওয়া উচিত ব্যক্তি বা জাতি বা গোষ্ঠী নয়, বরং সমস্যার মূল কারণগুলো চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া।
খাগড়াছড়ি জেলা পার্বত্য চট্টগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ইউনিট। এখানে বসবাসকারী বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী- চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, বাঙালিসহ অন্যান্য জাতিগোষ্ঠী বহু শতাব্দী ধরে পাশাপাশি বসবাস করে আসছে। বাজার ব্যবস্থা এই সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন। পাহাড়ি নারীরা যে কৃষিপণ্য নিয়ে আসেন, তা শুধু স্থানীয় চাহিদা মেটায় না, বরং শহরের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করে। একইভাবে স্থায়ী দোকানদাররা যে পণ্য সরবরাহ করেন, তা পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর দৈনন্দিন প্রয়োজন পূরণ করে। এই পারস্পরিক নির্ভরশীলতা অর্থনৈতিক সম্পর্ককে শক্তিশালী করেছে।
কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়ণ এবং বাজারের অবকাঠামোগত উন্নয়নের অভাব এই সম্পর্ককে চাপের মুখে ফেলেছে। ফুটপাত দখল, অপর্যাপ্ত ছাউনি, অপরিকল্পিত স্টল বরাদ্দ, অপ্রশস্ত রাস্তা ও ফুটপাথ এবং ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা সমস্যাকে জটিল করেছে। এই সমস্যা শুধু খাগড়াছড়িতে সীমাবদ্ধ নয়; অনেক পার্বত্য ও গ্রামীণ বাজারে একই ধরনের চ্যালেঞ্জ দেখা যায়। তবে খাগড়াছড়ির ক্ষেত্রে জাতিগত বৈচিত্র্যের কারণে এটি সহজেই সাম্প্রদায়িক রূপ নিতে পারে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
সমস্যাটির স্থায়ী সমাধানের জন্য নানামুখি উদ্যোগ গ্রহণ অতীব জরুরি। প্রথমত, ঘটনার একটি নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত অপরিহার্য। সামাজিক মাধ্যমের বিচারের পরিবর্তে জেলা পরিষদ, বাজার ফান্ড, পৌর কর্তৃপক্ষ, বাজার কমিটি, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, অস্থায়ী বিক্রেতাদের প্রতিনিধি এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করতে হবে। দোষী যেই হোক, তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে, কিন্তু কোনো জনগোষ্ঠীকে দায়ী করা সমীচীন হবে না। দ্বিতীয়ত, সংলাপের মাধ্যমে সমাধানের পথ খোঁজা। পাহাড়ি নারী বিক্রেতা, স্থায়ী দোকানদার, বাজার কমিটি, জেলা প্রশাসন, পৌরসভা, সুশীল সমাজ এবং নারী সংগঠনের প্রতিনিধিদের নিয়ে একাধিক সভা আয়োজন করা উচিত। এই সংলাপে প্রত্যেকের সমস্যা, চাহিদা এবং প্রস্তাব শোনা এবং সমাধানের রোডম্যাপ তৈরি করা যেতে পারে। তৃতীয়ত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সকলের দায়িত্বশীল আচরণ করা উচিত। সবাইকে ঘৃণা, উসকানি ও জাতিগত বিদ্বেষ ছড়ানো থেকে বিরত থাকতে হবে। একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে জাতিগত সংঘাতে রূপান্তরিত করা কারো জন্যই কল্যাণকর নয়।
এছাড়া অস্থায়ী বিক্রেতাদের জন্যও যুগোপযোগী ও চাহিদাভিত্তিক নানা কর্মসূচি গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। পাহাড়ি নারীদের জীবিকা নিরাপদ ও সম্মানজনক করার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
পাহাড়ি নারীদের জন্য পৃথক কৃষিপণ্য কর্নার বা গ্রাসরুটস প্রজিউমার্স মার্কেট গড়ে তোলা। বাজারের ভেতরে বা সংলগ্ন এলাকায় এটি স্থাপন করলে কোন স্থায়ী দোকানদারকে বাধাগ্রস্ত না করে নারীরা স্বাচ্ছন্দ্যে তাঁদের পণ্য বিক্রি করতে পারবেন।
ফুটপাতের পরিবর্তে অস্থায়ী বিক্রেতাদের ছাউনিযুক্ত, আলোকিত ও নিরাপদ বিপণন কেন্দ্র নির্ধারণ করা। প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা পণ্য বিক্রেতা বিশেষ করে নারীদের জন্য বিশুদ্ধ পানি, শৌচাগার, বিশ্রামাগার তথা ব্রেস্টফিডিং কর্নার বা শিশু যত্ন কেন্দ্রের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা। এ ক্ষেত্রে স্থায়ী দোকানদারদের ব্যবসায়িক অধিকারের কথাও সমানভাবে ভাবতে হবে কর্তৃপক্ষকে।
দোকানের প্রবেশপথ সবসময় খোলা রাখার জন্য নির্দিষ্ট দূরত্ব নীতি ঘোষণা করা যেতে পারে। তাৎক্ষণিক সমাধান হিসেবে চলাচলের পথ স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করে দেওয়া যেতে পারে, যাতে গাড়ি চলাচল, অস্থায়ী ব্যবসায়ীদের বসার স্থান ইত্যাদি চিহ্নিত করা থাকবে।
বাজার কমিটির বাজার মনিটরিং জোরদার করা জরুরি এবং যাঁরা এই মনিটরিং কাজে থাকবেন তাঁদেরকে সকল সম্প্রদায়ের প্রতি সংবেদনশীল আচরণ করতে হবে বা পক্ষপাতমূলক আচরণ পরিহার করতে হবে।
পথচারী হিসেবে আমাদেরকে নানা সময়ে বিশেষ করে গ্রাম থেকে আসা অক্ষরজ্ঞানহীন মানুষদের নানাভাবে ঠকানোর ঘটনা শুনতে হয়। সেটি সমাধানের জন্য কর্তৃপক্ষের সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া থাকা জরুরি।
জেলা পরিষদ, জেলা প্রশাসন, পৌরসভা ও বাজার ফান্ড কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে একটি ‘সমন্বিত বাজার উন্নয়ন মাস্টার প্ল্যান’ প্রণয়ন করা জরুরি। এতে থাকতে পারে:
- বাজার উন্নয়ন, সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন।
- আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণ (মাল্টি-স্টোরি মার্কেট, পার্কিং সুবিধা ইত্যাদিসহ)।
- সুনির্দিষ্ট বাজার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা প্রণয়ন।
- অভিযোগ বাক্স ও দ্রুত নিষ্পত্তি ব্যবস্থা।
- নিয়মিত সচেতনতা সভা ও প্রশিক্ষণ।
- পরিবেশবান্ধব বাজার (বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সবুজায়নসহ)।
- প্রান্তিক অঞ্চল থেকে আসা নারী ও প্রতিবন্ধী বিক্রেতাদের জন্য বিশেষ সুবিধা ব্যবস্থা করা।
খাগড়াছড়িতে পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক শতাব্দী প্রাচীন। একে অপরের ওপর নির্ভরশীলতা অস্বীকার করার উপায় নেই। একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনাকে কেন্দ্র করে পাহাড়ি কিংবা বাঙ্গালি পুরো জাতিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো বা প্রতিশোধস্পৃহা জাগানো সমাজের জন্য ক্ষতিকর। সাময়িক আবেগের বশে ছড়ানো বিদ্বেষ দীর্ঘমেয়াদে শান্তি ও উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে।
আমাদের উচিত হবে এই ঘটনাকে সংস্কারের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা। যদি আমরা সমন্বিত, ন্যায়ভিত্তিক ও অংশগ্রহণমূলক বাজার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারি, তাহলে খাগড়াছড়ি সারা বাংলাদেশের জন্য একটি ইতিবাচক উদাহরণ হয়ে উঠবে।
খাগড়াছড়ি বাজারের সংকটের সমাধান শক্তি প্রয়োগে নয়, বরং পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা, অর্থপূর্ণ সংলাপ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও টেকসই উন্নয়নের মাধ্যমেই সম্ভব। পাহাড়ি নারী কৃষক-উদ্যোক্তাদের সম্মানজনক জীবিকার অধিকার যেমন নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি স্থায়ী ব্যবসায়ীদের বৈধ অধিকারও রক্ষা করতে হবে।
৩ জুলাই ২০২৬-এর ঘটনা আমাদের জন্য সতর্কবার্তা। এটিকে যদি আমরা ভুলে যাই, তাহলে একই সমস্যা বারবার ফিরে আসবে। কিন্তু যদি এটিকে পরিবর্তনের অনুঘটক হিসেবে ব্যবহার করি, তাহলে খাগড়াছড়ি বাজার হবে শান্তি, সম্প্রীতি ও সমৃদ্ধির প্রতীক।
পুনশ্চ: আজ ৩ জুলাই ২০২৬ খাগড়াছড়ি বাজারের একটি স্থায়ী দোকানের সামনে অস্থায়ী বিক্রেতাদের বসাকে কেন্দ্র করে উভয় পক্ষের মধ্যে বাকবিতণ্ডা হয়, শেষে হাতাহাতি ও দলাদলির ঘটনায় পরিণত হয়। পরে স্থানীয় প্রশাসনের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে এবং কিছু অভিযুক্তকে আইনের আওতায় নেওয়া হয়। তারপরেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পাহাড়ি-বাঙ্গালি উভয় জনগোষ্ঠীর পক্ষ থেকে কিছু মানুষ ফেসবুকে পরস্পরের বিরুদ্ধ দোষারোপ করে উস্কানিমূলক তথ্য ছড়াতে থাকেন।



























