জাতীয় বাজেট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম

অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন প্রতিশ্রুতির সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নে


অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন প্রতিশ্রুতির সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নে

 

বাংলাদেশের জাতীয় বাজেট কেবল রাষ্ট্রের আয়-ব্যয়ের বার্ষিক হিসাব নয়; এটি দেশের উন্নয়ন-অভিযাত্রার দিকনির্দেশনা, নীতি-অগ্রাধিকার এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির প্রতিফলন। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটও সেই ধারাবাহিকতায় একটি উন্নয়নমুখী ও ভবিষ্যত-প্রত্যাশী রূপরেখা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দক্ষতা উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং পরিবেশ সংরক্ষণকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার মাধ্যমে সরকার একটি আরও সমতাভিত্তিক, টেকসই ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনের প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে।

এই জাতীয় অগ্রাধিকারের আলোকে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলও নতুন সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। ভৌগোলিক বৈচিত্র্য, সাংস্কৃতিক বহুত্ব এবং প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ এ অঞ্চলের জনগণের জীবনমান উন্নয়ন, মাতৃভাষাভিত্তিক বহুভাষিক শিক্ষা, ভূমি অধিকার সুরক্ষা, জলবায়ু সহনশীল উন্নয়ন উদ্যোগ ও অবকাঠামো নির্মাণ এবং টেকসই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রসারে বাজেট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়ন-অগ্রাধিকার কতটা প্রতিফলিত হয়েছে এবং বিদ্যমান বরাদ্দ ও নীতিমালা কীভাবে এ অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নকে আরও শক্তিশালী করতে পারে, তা পর্যালোচনা করা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের একটি অনন্য ভৌগোলিক, সাংস্কৃতিক ও পরিবেশগত অঞ্চল, যার উন্নয়ন বাস্তবতা দেশের সমতল অঞ্চলের তুলনায় অনেকাংশে ভিন্ন। পাহাড়, বন, নদী ও বিচ্ছিন্ন বসতির সমন্বয়ে গঠিত এ অঞ্চলে উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন তুলনামূলকভাবে বেশি ব্যয়বহুল এবং জটিল। দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থা, সীমিত অবকাঠামো, মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার অপ্রতুলতা, নিরাপদ পানির সংকট, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং দীর্ঘদিনের ভূমি-সংক্রান্ত জটিলতা এখানকার মানুষের জীবনমান ও অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে সরাসরি প্রভাবিত করে।

যদিও জাতীয় পর্যায়ে দারিদ্র্য হ্রাস, শিক্ষা বিস্তার, স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে, পার্বত্য চট্টগ্রামের অনেক জনগোষ্ঠী এখনো এসব সুফল সমানভাবে ভোগ করতে পারছে না। বিশেষ করে প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারী জনগণের জন্য সরকারি সেবার প্রাপ্যতা ও প্রবেশাধিকার এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। পাশাপাশি মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষা, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য সংরক্ষণ, টেকসই জীবিকা উন্নয়ন এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার মতো বিষয়গুলোও উন্নয়ন পরিকল্পনায় বিশেষ গুরুত্ব দাবি করে।

এ কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নকে কেবল জাতীয় গড়ের আলোকে মূল্যায়ন করলে বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণভাবে প্রতিফলিত হয় না। বরং অঞ্চলটির বিশেষ বৈশিষ্ট্য, প্রয়োজন ও সম্ভাবনাকে বিবেচনায় নিয়ে বৈষম্য-সংবেদনশীল, অংশগ্রহণমূলক এবং অঞ্চলভিত্তিক বাজেট ও উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নই টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের অন্যতম পূর্বশর্ত।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ৩ লক্ষ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে, যেখানে অবকাঠামো উন্নয়নকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ, তথ্যপ্রযুক্তি ও যোগাযোগ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ দেশের সার্বিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্যও নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থা ও সীমিত অবকাঠামোগত সুবিধা পার্বত্য অঞ্চলের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করেছে। উন্নত সড়ক ও সেতু নির্মাণ, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, ইন্টারনেট ও ডিজিটাল সংযোগ সম্প্রসারণ এবং বাজার ও সেবাকেন্দ্রের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার প্রাপ্যতা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় অর্থনীতিকে গতিশীল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে পার্বত্য অঞ্চলে অবকাঠামো উন্নয়নকে কেবল নির্মাণকাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন সম্ভব নয়। উন্নয়ন কার্যক্রম অবশ্যই স্থানীয় জনগণের চাহিদা, মতামত ও অংশগ্রহণের ভিত্তিতে পরিকল্পিত হতে হবে। পাহাড় কেটে সড়ক নির্মাণ, অপরিকল্পিত পর্যটন সম্প্রসারণ বা পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট করে পরিচালিত উন্নয়ন প্রকল্প স্বল্পমেয়াদে সুবিধা দিলেও দীর্ঘমেয়াদে ভূমিধস, জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি, জলাধার ধ্বংস এবং সামাজিক অস্থিরতার মতো গুরুতর সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। এ কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামে অবকাঠামো উন্নয়নকে পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন, জলবায়ু সহনশীলতা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সক্রিয় অংশগ্রহণের সঙ্গে সমন্বিত করতে হবে। টেকসই, পরিবেশবান্ধব এবং জনগণকেন্দ্রিক অবকাঠামোই পার্বত্য অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতির ভিত্তি হিসেবে কাজ করতে পারে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে দক্ষতাভিত্তিক ও কর্মমুখী শিক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে, যা দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ কর্মবাজারের চাহিদা পূরণে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং দেশের অন্যান্য আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলের বাস্তবতায় শিক্ষা খাতের চ্যালেঞ্জ ও প্রয়োজনীয়তা কিছুটা ভিন্ন। এখানে শিক্ষা উন্নয়নকে কেবল বিদ্যালয় নির্মাণ, শ্রেণিকক্ষ বৃদ্ধি বা পাঠ্যপুস্তক সরবরাহের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জন সম্ভব হবে না। বরং ভাষাগত, সাংস্কৃতিক এবং ভৌগোলিক বৈচিত্র্যকে বিবেচনায় নিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রাসঙ্গিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।

এই প্রেক্ষাপটে মাতৃভাষাভিত্তিক বহুভাষিক শিক্ষা (MTB-MLE) বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। শিশুরা তাদের নিজস্ব ভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পেলে শেখার আগ্রহ, বোধগম্যতা এবং বিদ্যালয়ে টিকে থাকার হার বৃদ্ধি পায়। সরকার ইতোমধ্যে পাঁচটি আদিবাসী ভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম চালু করেছে এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের মাতৃভাষায় পাঠদান বিষয়ক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছে, যা প্রশংসনীয় উদ্যোগ। এখন প্রয়োজন সরকারি প্রতিষ্ঠান, ভাষাভিত্তিক সম্প্রদায়, শিক্ষাবিদ এবং নাগরিক সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে এই কর্মসূচির পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। পাশাপাশি দেশের অন্যান্য আদিবাসী ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর জন্যও ধাপে ধাপে অনুরূপ শিক্ষা ব্যবস্থা চালুর লক্ষ্যে একটি সুনির্দিষ্ট জাতীয় রোডম্যাপ প্রণয়ন জরুরি।

একই সঙ্গে স্থানীয় শিক্ষক তৈরির উদ্যোগ, ডিজিটাল শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ, প্রাক-কারিগরি শিক্ষা এবং জীবনমুখী ও জীবনব্যাপী শিক্ষার ওপর গুরুত্ব বাড়াতে হবে। কারিগরি দক্ষতা, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি-উদ্ভাবন এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা উন্নয়নমূলক শিক্ষার মাধ্যমে পাহাড়ের তরুণদের কর্মসংস্থান এবং আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি করা সম্ভব। শিক্ষা খাতে এমন একটি সমন্বিত ও বাস্তবমুখী দৃষ্টিভঙ্গিই পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশের সকল ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক জনগোষ্ঠীর জন্য টেকসই উন্নয়ন এবং সমঅধিকারভিত্তিক অগ্রগতির পথ সুগম করতে পারে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলাকে অন্যতম অগ্রাধিকার খাত হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের জন্য বরাদ্দ অব্যাহত রাখা এবং জলবায়ু সহনশীল উন্নয়ন উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্নভাবে প্রতিফলিত হওয়ায় অঞ্চলভিত্তিক ঝুঁকি ও প্রয়োজনকে বিবেচনায় নিয়ে বাজেট বরাদ্দ ও কর্মসূচি প্রণয়ন করা জরুরি।

পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অন্যতম জলবায়ু-সংবেদনশীল অঞ্চল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন, অনিয়মিত আবহাওয়া, দীর্ঘস্থায়ী খরা, আকস্মিক বন্যা এবং ঘন ঘন পাহাড়ধসের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ধস মানুষের জীবন, বসতভিটা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সড়ক যোগাযোগ এবং কৃষিজমির জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। অন্যদিকে বন উজাড়, মাটির ক্ষয় এবং জলাধার ও ঝিরির অবক্ষয়ের ফলে জীববৈচিত্র্য হ্রাস পাচ্ছে, যা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যগত জীবিকা ও খাদ্যনিরাপত্তার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

যদিও জাতীয় পর্যায়ে জলবায়ু অভিযোজন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করা হচ্ছে, বাস্তবে জলবায়ু অর্থায়নের একটি বড় অংশ এখনো উপকূলীয় অঞ্চলের ঝুঁকি মোকাবিলায় কেন্দ্রীভূত। ফলে পার্বত্য অঞ্চলের বিশেষ চাহিদা অনেক ক্ষেত্রেই পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায় না। অথচ পাহাড়ি এলাকার ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য ও পরিবেশগত ঝুঁকি বিবেচনায় পৃথক পরিকল্পনা গ্রহণ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।

এ কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য বিশেষ জলবায়ু অভিযোজন কর্মসূচি, পাহাড়ধস প্রতিরোধে বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থা, জলাধার ও প্রাকৃতিক ঝিরি সংরক্ষণ, বন পুনরুদ্ধার এবং সম্প্রদায়ভিত্তিক দুর্যোগ প্রস্তুতি কার্যক্রমে অধিক বিনিয়োগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যগত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে জলবায়ু নীতির সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে। পাহাড়ের পরিবেশ ও মানুষের নিরাপত্তাকে কেন্দ্র করে গৃহীত দীর্ঘমেয়াদি ও পর্যাপ্ত বাজেটভিত্তিক উদ্যোগই পার্বত্য চট্টগ্রামকে আরও জলবায়ু-সহনশীল, পরিবেশগতভাবে টেকসই এবং নিরাপদ অঞ্চলে পরিণত করতে সক্ষম হবে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে কর ও শুল্ক ছাড়সহ বেশ কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে অর্জনের লক্ষ্য পুনর্ব্যক্ত করেছে। ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি এবং টেকসই উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তার প্রেক্ষাপটে এই উদ্যোগগুলো বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় অঞ্চল। পর্যাপ্ত সৌর বিকিরণ, পাহাড়ি ঝিরি ও জলধারার প্রবাহ, জৈবসম্পদের প্রাপ্যতা এবং বিচ্ছিন্ন জনবসতির বাস্তবতা এ অঞ্চলে সৌরশক্তি, ক্ষুদ্র জলবিদ্যুৎ, বায়োমাস এবং কমিউনিটি-ভিত্তিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবস্থার বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে দুর্গম ও অফ-গ্রিড এলাকাগুলোতে বিকেন্দ্রীভূত জ্বালানি ব্যবস্থা মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার প্রসার এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে গতিশীল করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে বাস্তবতা হলো, দেশের জ্বালানি খাতে বরাদ্দের বড় অংশ এখনও জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় হচ্ছে, যেখানে নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য বিনিয়োগ তুলনামূলকভাবে সীমিত। ফলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও অনেক অঞ্চলে এর বিস্তার কাঙ্ক্ষিত গতিতে অগ্রসর হতে পারছে না।

এই প্রেক্ষাপটে পার্বত্য চট্টগ্রামে ক্ষুদ্র ও বিকেন্দ্রীভূত নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের জন্য বিশেষ বাজেট বরাদ্দ, সহজ অর্থায়ন এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণভিত্তিক উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। এমন বিনিয়োগ একদিকে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে, অন্যদিকে পরিবেশ সংরক্ষণ, কার্বন নিঃসরণ হ্রাস এবং টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং জীবনযাত্রার সঙ্গে জুমচাষের সম্পর্ক বহু শতাব্দীর। এটি কেবল একটি কৃষি পদ্ধতি নয়; বরং পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যগত জ্ঞান, জীবিকা এবং খাদ্যনিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। তা সত্ত্বেও জাতীয় কৃষি নীতিমালা ও কৃষি উন্নয়ন কর্মসূচিতে জুমচাষ এখনো পূর্ণাঙ্গ স্বীকৃতি লাভ করেনি। এর ফলে বহু পাহাড়ি কৃষক কৃষি প্রণোদনা, ভর্তুকি, সহজ ঋণ, বীজ সহায়তা এবং প্রযুক্তিগত সেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন।

দীর্ঘদিন ধরে জুমচাষকে অনেক ক্ষেত্রে অনুৎপাদনশীল বা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও সাম্প্রতিক কৃষি ও পরিবেশবিষয়ক গবেষণাগুলো ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। গবেষণায় দেখা গেছে, পরিকল্পিত ও নিয়ন্ত্রিত জুমচাষ স্থানীয় পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে এবং বহুবিধ ফসল উৎপাদনের মাধ্যমে খাদ্য বৈচিত্র্য ও কৃষি-প্রতিবেশ সংরক্ষণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে পাহাড়ি অঞ্চলের ভৌগোলিক বাস্তবতায় এটি অনেক ক্ষেত্রে একটি উপযোগী ও টেকসই কৃষি ব্যবস্থা হিসেবে বিবেচিত।

এই প্রেক্ষাপটে জাতীয় বাজেট ও কৃষি নীতিতে জুমচাষকে কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থার একটি স্বীকৃত অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি জুমপণ্যের বাজার সম্প্রসারণ, মূল্য সংযোজন, সংরক্ষণ ও বিপণন ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং পাহাড়ি কৃষকদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা ও প্রযুক্তিগত সহায়তা চালু করা জরুরি। এ ধরনের উদ্যোগ পার্বত্য অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি স্থানীয় জনগণের জীবনমান উন্নয়ন এবং টেকসই খাদ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়, পার্বত্য জেলা পরিষদসমূহ এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো, কৃষি এবং সামাজিক উন্নয়নসহ বিভিন্ন খাতে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। তবে বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা যায় যে, পরিকল্পনা প্রণয়ন, প্রকল্প সমন্বয়, প্রশাসনিক সক্ষমতা, তথ্য ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে জটিলতা ও বিলম্ব সৃষ্টি হয়। ফলে বরাদ্দকৃত সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার এবং কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জন সবসময় সম্ভব হয় না।

এ প্রেক্ষাপটে জাতীয় বাজেটে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন, আধুনিক তথ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা, গবেষণা ও তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং প্রকল্প পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন ব্যবস্থার উন্নয়ন স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও কার্যকর করে তুলতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগণ, জনপ্রতিনিধি, নারী, যুবসমাজ এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করলে তা বাস্তব প্রয়োজনের সঙ্গে অধিকতর সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।
তাই, পার্বত্য চট্টগ্রামের টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নিশ্চিত করতে জাতীয় বাজেট থেকে স্থানীয় সরকার ও আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধি, বিকেন্দ্রীকৃত পরিকল্পনা এবং অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অধিক বিনিয়োগ করা প্রয়োজন। এর মাধ্যমে উন্নয়ন কার্যক্রমের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও কার্যকারিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়নকে কেবল অবকাঠামো নির্মাণ, প্রকল্প বাস্তবায়ন বা বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধির মাধ্যমে মূল্যায়ন করলে এর সামগ্রিক বাস্তবতা ও প্রয়োজনীয়তা পুরোপুরি প্রতিফলিত হয় না। এ অঞ্চলের টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন একটি মানবকেন্দ্রিক ও অধিকারভিত্তিক উন্নয়ন দর্শন, যেখানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি ভূমি অধিকার, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের সুরক্ষা, পরিবেশ সংরক্ষণ, মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষা এবং স্থানীয় অর্থনীতির বিকাশকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। উন্নয়নের লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের জীবনমান, মর্যাদা এবং অংশগ্রহণের সুযোগ বৃদ্ধি করা।

একটি জাতীয় বাজেট তখনই প্রকৃত অর্থে অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়ে ওঠে, যখন দেশের প্রত্যন্ত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী নিজেদের উন্নয়ন প্রক্রিয়ার সক্রিয় অংশীদার হিসেবে অনুভব করে। পার্বত্য চট্টগ্রামের বিশেষ ভৌগোলিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে পৃথক দৃষ্টিভঙ্গি ও লক্ষ্যভিত্তিক বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে এ অঞ্চল কেবল উন্নয়ন সহায়তার গ্রহীতা হিসেবেই নয়, বরং দেশের টেকসই উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃষি বৈচিত্র্য এবং সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।

অতএব, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তব সাফল্যে রূপান্তর করতে হলে প্রয়োজন অধিকতর লক্ষ্যভিত্তিক বরাদ্দ, কার্যকর স্থানীয় অংশগ্রহণ, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ন্যায়ভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনা। এ ধরনের উদ্যোগই পার্বত্য চট্টগ্রামকে একটি আরও সমৃদ্ধ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিতে পারে।

লেখক পরিচিতি: 
মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা জাতীয় পদক ২০২১ ভূষিত লেখক ও গবেষক এবং নির্বাহী পরিচালক, জাবারাং কল্যাণ সমিতি। mathura.tripura@gmail.com
 

Ads