সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর ঐতিহাসিক ‘বায়তুল মুকাদ্দাস’ বিজয়

মো. জিল্লুর রহমান

১০ অক্টোবর ২০২৩, ০৪:০৬ পিএম


সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর ঐতিহাসিক ‘বায়তুল মুকাদ্দাস’ বিজয়

মো. জিল্লুর রহমান

 

সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবী ইতিহাস বিখ্যাত একজন বীর এবং তিনি ১১৮৭ সালে (৫৮৩ হিজরি) ঐতিহাসিক ‘বায়তুল মুকাদ্দাস’ জয় করেন। তাঁর যোগ্য নেতৃত্বেই খ্রিস্টান ক্রুসেডারদের হাত থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস মুক্ত হয়েছিল। বায়তুল মুকাদ্দাস মুসলমানদের প্রথম কেবলা এবং অসংখ্য নবি-রাসুলের স্মৃতি বিজড়িত ঐতিহাসিক স্থান ও মর্যাদাপূর্ণ ইবাদতের জায়গা। রাসুলুল্লাহ (সা.) ঐতিহাসিক মেরাজের রাতে মসজিদুল হারাম তথা কাবা শরিফ থেকে মসজিদুল আকসা তথা এ বায়তুল মুকাদ্দাসেই প্রথম সফর করেন। কুরআনুল কারিমে এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, "পরম পবিত্র ও মহিমাময় সত্তা তিনি, যিনি স্বীয় বান্দাকে (মুহাম্মাদ সা.) রাতের বেলায় মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যান্ত ভ্রমণ করিয়েছিলেন। যার চার দিকে আমি পর্যাপ্ত বরকত দান করেছি যাতে আমি তাঁকে কুদরতের কিছু নিদর্শন দেখিয়ে দেই। নিশ্চয়ই তিনি পরম শ্রবণকারী ও দর্শনশীল।’ (সুরা বনি ইসরাঈল: আয়াত ১)।

 

আমাদের প্রিয় নবি রাসুলুল্লাহ (সা.) মেরাজ গমনের সময় এই মসজিদে সব নবি–রাসুলের ইমামতি করে নামাজ আদায় করেন। এ কারণেই তিনি ‘ইমামুল আম্বিয়া’ সব নবীদের ইমাম ও ‘সায়্যিদুল মুরসালিন’ সব রাসুলদের নেতা হিসেবে স্বীকৃত হন। এই মসজিদে আকসা বহুকাল ধরেই ইসলামের প্রাণকেন্দ্র এবং ইসলামি সংস্কৃতির চারণভূমি ছিল। খলিফাতুল মুসলিমিন হজরত ওমর (রা.) খেলাফেতের সময় ৬৩৮ সালে বায়তুল মুকাদ্দাস, জেরুজালেমসহ পুরো ফিলিস্তিন পুরোপুরি মুসলমানদের অধিকারে আসে।

 

কিন্তু কালের পরিক্রমায় ১০৯৯ সালের ৭ জুন খ্রিষ্টান ক্রুসেডাররা বায়তুল মুকাদ্দাস অবরোধ করে এবং ১০৯৯ সালের ১৫ জুলাই কিছু তথাকথিত মুসলিম শাসকদের সহায়তায় সমগ্র সিরিয়া, ফিলিস্তিন ও জেরুজালেম দখল করে এবং বায়তুল মুকাদ্দাসে প্রবেশ করে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও পরিবর্তন করে একে গির্জায় পরিণত করে। সেদিন মুসলমানদের রক্তে প্লাবিত হয়েছিল পবিত্র আল কুদসের ভেতর ও বাহির। এভাবেই জেরুজালেমের ৪৬২ বছরের মুসলিম শাসনের পতন ঘটে। এভাবেই অব্যাহত থাকে জেরুজালেম ফিলিস্তিন ও মসজিদে আকসার দখল। তখন থেকেই ফিলিস্তিনের মুসলিমরা একজন যোগ্য নেতার অপেক্ষায় দিন অতিবাহিত করছিল। যে নেতার নেতৃত্বে মুসলিমরা তাদের হারানো গৌরব ফিরে পাবে। মসজিদে আকসায় আবারও ধ্বনিতে হবে ইসলামের সুমহান আজান। সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবী তেমনই একজন বীর সেনাপতি যিনি তাদের মনের আশা পূরণ করেছিলেন এবং পবিত্র বায়তুল মুকাদ্দাস জয় করে ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছেন।

 

ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১০৯৯ সালের কোনো এক সময়ের ঘটনা এবং তখন বায়তুল মুকাদ্দাস খ্রিস্টান ক্রুসেডারদের দখলে। সে সময় বাগদাদ শহরের এক কাঠমিস্ত্রি বসবাস করতেন। এ কাঠমিস্ত্রি মনের ভালোবাসা দিয়ে কারুকার্যমণ্ডিত একটি মিম্বার তৈরি করেন। মিম্বারটি সৌন্দর্যের কথা লোক মুখে চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকে আর তা দেখতে মানুষ দলে দলে কাঠমিস্ত্রির বাড়িতে আসতে শুরু করে। অনেকেই মিম্বারটি কিনতে চায় কিন্তু কাঠমিস্ত্রি তা বিক্রি করতে রাজি হয়নি। তার সাফ জবাব, ‘এ মিম্বার বিক্রির জন্য নয়; বরং এটি বানিয়েছি মসজিদে আল আকসার জন্য‘ কাঠ মিস্ত্রির কথা শুনে সবাই হাসতো। অনেকে তাকে পাগল বলে সম্বোধন করতো। কিন্তু কাঠমিস্ত্রি তার সিদ্ধান্তে অটল ও অবিচল ছিলেন। অনেকদিন পর কোন একদিন এক ছোট্ট ছেলে তার বাবার হাত ধরে মিম্বারটি দেখতে এসেছিল। কাঠমিস্ত্রির কাছে তার স্বপ্নে কথাও জেনেছিল। সেদিনই ওই ছোট্ট ছেলেটি প্রতিজ্ঞা করেছিল- সে কাঠমিস্ত্রির স্বপ্ন পূরণ করবে। সেই ছেলেটি আর কেউ নন; তিনি হলেন- বীর সেনাপতি সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবী। আর তিনি বায়তুল মুকাদ্দাস বিজয়ের পর সেই মিম্বারটি এ মসজিদে স্থাপন করেছিলেন।

 

সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর জন্ম ১১৩৮ সালে (৫৩২ হিজরি) বর্তমান ইরাকের টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদী দুটির মধ্যবর্তী অঞ্চলে গড়ে উঠা মেসোপটেমিয়ার তিকরিতে। তাঁর পুরোনাম সালাহউদ্দীন ইউসুফ ইবনে আইয়ুব। তাঁর আসল নাম ইউসুফ, সালাহউদ্দিন হল উপাধি যার অর্থ ‘বিশ্বাসের ন্যায়পরায়ণ’। তিনি ছিলেন মিশর ও সিরিয়ার প্রথম সুলতান এবং আইয়ুবীয় রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা। ক্ষমতার সর্বোচ্চ শিখরে তার কর্তৃত্ব মিশর, সিরিয়া, মেসোপটেমিয়া, হেজাজ, ইয়েমেন এবং উত্তর আফ্রিকার অন্যান্য অংশ অন্তর্ভুক্ত ছিল। তিনি ছিলেন মুসলিম, আরব, তুর্কি ও কুর্দি সংস্কৃতিতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব।

 

ইতিহাসে মুসলিম ও ক্রুসেডারদের মধ্যকার হিত্তিনের যুদ্ধকে এক চুড়ান্ত যুদ্ধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই যুদ্ধে ইসলামের বিরুদ্ধে জড়ো হওয়া ক্রুসেডিয় শক্তিকে পরাজিত করে সুলতান সালাহউদ্দীন আইয়ুবী ইসলামী বিশ্বের এক বিজয়ী নেতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিলেন। হিত্তিনের যুদ্ধের পর ক্রুসেড বাহিনী বায়তুল মুকাদ্দাসে শক্তি প্রদর্শনের সক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। সালাহউদ্দীন আইয়ুবী বায়তুল মুকাদ্দাস শহরে চূড়ান্ত আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেন। ইসলামি বাহিনী ক্রুসেডারদের দূর্গ রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি প্রবলভাবে মিনজানিকের গোলা বর্ষণ এবং মুষলধারে তীর বর্ষণ করতে থাকে। যাতে করে প্রতিরোধকারীরা তাদের অবস্থান থেকে সরে যায়। গোলাবর্ষণের সাথে সাথে একদল ঝানু মুজাহিদ সীমানা প্রাচীরের কাছে পৌঁছাতে সক্ষম হয়। ১১৮৭ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর সবচেয়ে বড় বাধা অতিক্রম করে নগর প্রাচীরের উপর ইসলামি বাহিনী চড়তে সক্ষম হয়। নগর প্রাচীরে উঠেই মুজাহিদগণ ইসলামি পতাকা উড্ডয়ন করেন। কালিমার পতাকা উড়তে দেখে নগর রক্ষাকারী বাহিনী এ কথা বিশ্বাস করে নেয় যে, আর মুসলিম বাহিনীকে প্রতিরোধ করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। আসলে তারা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে। তবে তারা তাদের একগুঁয়েমি চালিয়ে গেল এবং গীর্জায় জমা হয়ে প্রার্থনা করতে লাগলো। নিজেদের পাপের কথা স্বীকার করে, নিজেদেরকে পাথর দিয়ে আঘাত করতে থাকে। তারা আল্লাহর কাছে রহমতের আশা করতে থাকে। মুসলিমদের হাতে বন্দী হওয়া থেকে বাঁচতে পুরুষদেরকে উত্তেজিত করার লক্ষ্যে মহিলারা তাদের মেয়েদের মাথার চুল পর্যন্ত কর্তন করে দেয়।

 

২৭ রজব ৫৮৩ হিজরী জুমাবারে বিজয়ী বেশে সালাহউদ্দীন আইয়ুবী মাসজিদুল আকসায় প্রবেশ করেন। তিনি ক্রুসেডারদের অস্ত্র সমর্পণের পরেই বায়তুল মুকাদ্দাসে প্রবেশ করেছিলেন। এটি ইসলামের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় ও ঐতিহাসিক দিন ছিল। এদিন নগর প্রাচীরের উপর কালিমার পতাকা পতপত করে উড়তে দেখা যায়। তিনি ১২দিন জেরুজালেম অবরোধ করে ছিলেন। তিনি শহর ছেড়ে যাওয়া ক্রুসেডারদের কাছ থেকে ফিদিয়া আদায় করা এবং গণনা করার জন্য শহরের প্রতিটি ফটকে সেনাবাহিনীর একজন করে আমির বসানো হয়। দেখা যায় সেদিন শহরে নারী শিশু বাদ দিয়ে ষাট হাজার মানুষ (খৃষ্টান) উপস্থিত ছিল।

 

এ বিজয়ের দিন আসকালান, গাজা, দারুম, রামাল্লা থেকে এত পরিমাণ লোক এসেছিলো যে রাস্তা-ঘাট, বাজার, গীর্জা সব জায়গায় লোকে লোকারণ্য হয়ে গিয়েছিল। তিল ধারণের ঠাইটুকু ছিলো না। জেরুজালেমের স্থিতিশীলতা ফিরে আসার পর সালাহউদ্দীন ঘোষণা করেন, যারা ক্রুসেডারদের দখলদারিত্বের পূর্বে এই শহরে বসবাস করতো তারা যেন ফিরে আসে। ক্রুসেডাররা এ পবিত্র নগরী দখল করার পর মসজিদগুলিকে নাইটক্লাব, ঘোড়ার আস্তাবল ইত্যাদিতে পরিণত করে। সালাহউদ্দীন এই নগরীকে বিজয় করার পর মসজিদগুলোকে পাক পবিত্র করার আদেশ দেন। পুনরায় নামাজের উপযুক্ত করে তোলেন। তিনি মসজিদুল আকসার জন্য ইমাম নিযুক্ত করেন এবং তাতে একটি মিম্বার স্থাপন করেন। মসজিদে খৃষ্টানরা যে সমস্ত চিত্রাংকন করেছিলেন তা তিনি মুছে দিয়েছিলেন।
 

তিনি জেরুজালেমের অধিবাসী, যারা শহর ছেড়ে চলে গিয়েছিল তাদেরকে ফিরিয়ে এনেছিলেন।

 

তিনি যে দয়া দেখিয়েছিলাম তা ছিল বিস্ময়কর এবং ইতিহাসে বিরল। সালাহউদ্দীন তাঁর ওয়াদা পূরণ করেছিলেন। যারা শহর ছেড়ে চলে যেতে চেয়েছিল তাদেরকে যেতে দিয়েছিলেন। তিনি শহরের প্রতিটি ফটকে একজন করে আমির বসিয়েছিলেন, যারা বের হয়ে যেতে চায় তাদের কাছ থেকে ফিদিয়া আদায় করার জন্য। যে ফিদিয়া দিবে সে বের হতে পারবে। সালাহউদ্দীন প্রতিটি খৃষ্টানকেই নিরাপত্তা দিয়েছিলেন।
 

দেখা গেছে অধিকাংশ লোকই ফিদিয়া দিতে পারেনি। এভাবে চল্লিশ দিন অতিবাহিত হয়ে গেছে কিন্তু কোন ধনী খৃষ্টান দরিদ্র খৃষ্টান বন্দীর মুক্তি পণ আদায়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করেনি। অথচ পাদ্রী হিরাক্লিয়াস বায়তুল মুকাদ্দাসের কোষাগার চুরি করে সবার অগোচরে শহর ছেড়ে পালিয়ে যায়। ১১৮৭ সালে মুসলিম বীর সিপাহসালার সুলতান সালাহুদ্দিন আইয়ুবীর হাত ধরেই পুনরায় জেরুজালেম শহর মুসলমানদের অধিকারে আসে।

 

অবৈধভাবে গড়ে ওঠা বর্তমান রাষ্ট্র ইসরায়েল ও দখলদার বাহিনী ১৯৬৭ সালে ‘মসজিদে আকসা’ জোরপূর্বক দখল করে নেয়। এরপর থেকে সেখানকার মুসলিম জনগণ মুক্তি ও স্বাধীনতার জন্য তাদের সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু জায়ানবাদী ইসরায়েল একের পর এক মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা জোরপূর্বক দখল করে ইয়াহুদি বসতি সম্প্রসারণ অব্যাহত রাখে এবং হত্যা-গুম চালিয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে মসজিদে আকসা ও জেরুজালেম নগরী দখলদার ইসরায়েলিদের নিয়ন্ত্রণে। সেখানে মুসলিমরা নির্যাতিত হচ্ছে। প্রতিনিয়ত তারা ফিলিস্তিনের ভূখন্ড দখল করে নিচ্ছে। শত শত বছর পর আজও শুধু ফিলিস্তিন নয় পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের মুসলিম মানবাত্মা একজন সালাহউদ্দীন আইয়ুবীর জন্য কাঁদছে। অপেক্ষার প্রহর গুনছে। জেরুজালেম, ফিলিস্তিনে বসবাসরত মুক্তিকামী মুসলিম জনতা একজন সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর অপেক্ষায় দিন অতিবাহিত করছে। কবে আসবে তাদের মুক্তি? কে হবে এ যুগের সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবী? হামাস কি পারবে সালাহউদ্দীন আইয়ুবীর পথ অনুসরণ করে ফিলিস্তিন মুক্ত করতে? এ ক্রুসেড বিজয়ী মহান বীর ১১৯৩ সনের ৪ মার্চ দামেস্কে ইন্তিকাল করেন। আল্লাহ তাআলা বর্তমান মুসলিম উম্মাহকে তাঁর মতো একজন বীর দান করুন। মহান আল্লাহ তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউস নসিব করুন। আমিন।


ব্যাংকার ও কলাম লেখক,
সতিশ সরকার রোড, গেন্ডারিয়া, ঢাকা।

Ads