পুলিশের পদায়ন

স্বজনপ্রীতি ও জটিলতা নিরসনে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ, তৈরি হচ্ছে স্বচ্ছ ‘ফিটলিস্ট’

নয়ন তারা

১১ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৫৬ এএম


স্বজনপ্রীতি ও জটিলতা নিরসনে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ, তৈরি হচ্ছে স্বচ্ছ ‘ফিটলিস্ট’

 

পুলিশ বাহিনীর পদায়ন ও বদলিতে দীর্ঘদিনের বিশৃঙ্খলা, অনিয়ম ও ব্যক্তিগত পছন্দের প্রভাব দূর করে পেশাদারিত্ব ফিরিয়ে আনতে এক যুগান্তকারী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এখন থেকে মেধা, সততা ও দক্ষতার ভিত্তিতে কর্মকর্তা বাছাই করতে প্রণয়ন করা হচ্ছে একটি বিশেষ 'ফিটলিস্ট' বা যোগ্যতার তালিকা। পুলিশ সুপার (এসপি) থেকে তদূর্ধ্ব কর্মকর্তা এবং পরিদর্শক বা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) পদের পদায়নের জন্য ২০০ নম্বরের বিশেষ মানদণ্ড নির্ধারণ করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে অযোগ্য বা বিতর্কিত ব্যক্তিদের পদায়নের সুযোগ পুরোপুরি বন্ধ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

১১ আগস্ট ২০২৬, মঙ্গলবার, ঢাকা। পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, পুলিশ সংস্কার কমিশনের সুপারিশ এবং বাহিনীর অভ্যন্তরীণ একাধিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শেষে পদায়নের এই নতুন কাঠামো চূড়ান্ত রূপ পেয়েছে। স্বচ্ছতা ও পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে ইতোমধ্যে দুটি আলাদা কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হচ্ছে, যার দুটিরই নেতৃত্বে থাকবেন একজন অতিরিক্ত আইজিপি।

ছয় সদস্যের প্রথম কমিটিটি পুলিশ সুপার (এসপি) থেকে তদূর্ধ্ব পদের কর্মকর্তাদের যোগ্যতা ও ফিটলিস্ট যাচাই করবে। আর দ্বিতীয় কমিটিটি পরিদর্শক বা ওসি পদের কর্মকর্তাদের কাজের মান পরীক্ষা করে তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করবে। কর্মকর্তাদের বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন (এসিআর), পেশাগত দক্ষতা, সততা ও অতীত কর্মজীবনের ইতিবাচক রেকর্ড বিবেচনা করে ২০০ নম্বরের সূচকে নম্বর দেওয়া হবে। দুই ধাপে চূড়ান্ত হওয়া এই ফিটলিস্টে যাদের নাম থাকবে, কেবল তারাই পরবর্তীতে পদায়নের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবেন।

পূর্বে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা না থাকায় ব্যক্তিগত পছন্দ বা 'চুজ অ্যান্ড পিক' নীতিতে পদায়ন করা হতো। এছাড়া রাজনৈতিক বিবেচনা ও আঞ্চলিকতার প্রভাব ছিল অন্যতম বড় সমস্যা। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে লটারির মাধ্যমে জেলাকে এ, বি, সি ক্যাটেগরিতে ভাগ করে কর্মকর্তা পদায়নের চেষ্টা হলেও তা মাঠপর্যায়ে কার্যকর ফল দিতে ব্যর্থ হয়। যোগ্যতার যথার্থ মূল্যায়ন না হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে এবং পরবর্তীতে লটারি পদ্ধতি থেকে সরে আসা হয়। পরবর্তীতে বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও কয়েকটি জেলার এসপি পদে বিতর্কিত পদায়ন বাতিল করতে হয়। তাই বারবার সিদ্ধান্ত বদলের ক্ষতিকর প্রবণতা বন্ধ করতেই স্থায়ী ফিটলিস্টের পথ বেছে নেওয়া হয়েছে।

প্রশাসন ক্যাডারে যেভাবে উপসচিবদের মধ্য থেকে মৌখিক পরীক্ষা ও মূল্যায়নের মাধ্যমে জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদের ফিটলিস্ট তৈরি করা হয়, পুলিশের এই উদ্যোগটিও ঠিক একই আদলে সাজানো হচ্ছে। এই নতুন ব্যবস্থার ফলে বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে স্পষ্ট বার্তা যাবে যে, ভালো পদায়ন পেতে হলে সার্বিক শৃঙ্খলা ও নিয়মনীতি মেনে চলাই একমাত্র পথ। সাবেক ও বর্তমান পুলিশ কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই ফিটলিস্ট বাস্তবায়িত হলে সুবিধাবাদী চক্রের হস্তক্ষেপ বন্ধ হবে এবং পুলিশ বাহিনী স্বাধীনভাবে ও নিরপেক্ষ থেকে জনগণকে সেবা দিতে সক্ষম হবে।

 

Ads