দেশের রাজনীতির সঙ্গে অর্থনীতি জড়িয়ে গেলে কি হবে?

মোঃ সহিদুল ইসলাম সুমন

০১ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৪:৫০ পিএম


দেশের রাজনীতির সঙ্গে অর্থনীতি জড়িয়ে গেলে কি হবে?

যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের অন্যতম উন্নয়ন ও বানিজ্যিক সহযোগী দেশ এবং বাংলাদেশের বৃহত্তম রপ্তানি বাজার। স্বাধীনতার পর মূলত উন্নয়ন সহযোগিতার সম্পর্ক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের। বাণিজ্য, বিনিয়োগ থেকে শুরু করে প্রবাসী আয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখন বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সব মিলিয়ে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক এখন অনেক গভীর। দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ এখন প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৫৪ হাজার কোটি টাকা (প্রতি ডলারের দাম ১১০ টাকা হিসাবে)। ২০২১ সালে বাংলাদেশ ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ৪৬তম বাণিজ্যিক অংশীদার। কিন্তু বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের সাম্প্রতিক টানাপোড়েন নিয়ে উদ্বিগ্নতা দেখা দিয়েছে। এবং বলা যায়, সময়ের সাথে সাথে দুই দেশের টানাপোড়েন আরও গভীর হচ্ছে।অনেক সময় রাজনীতির সঙ্গে অর্থনীতি জড়িয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও যে এটা হবে না, এমনটা এখনও বলা যাচ্ছে না। সম্প্রতি এর সঙ্গে যোগ হয়েছে শ্রম ও মানবাধিকারের বিষয়গুলো।বাংলাদেশ ব্যাংকের সম্প্রতি বিভিন্ন প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায় বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বহুমুখী বৈদেশিক বাণিজ্য কমতে শুরু করেছে। ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি এবং বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি কমেছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে রেমিট্যান্স সংগ্রহও কমে শীর্ষ থেকে চতুর্থ অবস্থানে নেমেছে। কমে গেছে বৈদেশিক অনুদান আসার প্রবণতাও। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য হ্রাস পাওয়ার অনেক কারণের মধ্যে এই সব বিষয়ও জড়িত বলে মনে করছেন অনেক অর্থনীতিবিদ। একক দেশ হিসাবে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা আহরণের উৎস। দেশ থেকে সবচেয়ে বেশি পণ্য রপ্তানি হয় যুক্তরাষ্ট্রে। রেমিট্যান্স আহরণের শীর্ষ দেশ ছিল এক সময়। এছাড়া বাংলাদেশে বৈদেশিক বিনিয়োগে দেশটির অবস্থান শীর্ষ স্থানে রয়েছে। পাশাপাশি অনুদান থেকেও বৈদেশিক মুদ্রা আসে। বৈদেশিক ঋণের অন্যতম উৎস যুক্তরাষ্ট্র। এসব খাতে দেশটি থেকে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ কমে গেলে বাংলাদেশে ডলারের প্রবাহে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। হঠাৎ করে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের বিকল্প উৎস খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে। তখন ডলার সংকট আরও প্রকট হবে। দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে এর ভয়ানক নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।তাছাড়া মার্কিন যুক্ত্রাষ্ট্রের সাথে একই সুত্রেগাতা ইউরোপের দেশ গুলো, কানাডা ও অষ্টেলিয়া।  এ প্রসঙ্গে আমার শিক্ষক, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি ও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. মইনুল ইসলাম বলেন, “একতরফা নির্বাচন বিদেশিরা মেনে নেবে না। নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক না হলে শুধু অর্থনৈতিক বিষয়ই নয়, অন্যান্য ক্ষেত্রে নানা ধরনের বাধা এবং জটিলতা তৈরি হতে পারে। বড় কোনো দেশ থেকে এ ধরনের বাধা এলে অর্থনীতির ক্ষতি হবে। দেশের ইমেজ নষ্ট হবে।

আমাদের অর্থনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের অবদান বলতে গেলে দেখা যায়, বাংলাদেশের রপ্তানির সবচেয়ে বড় একক বাজার যুক্তরাষ্ট্র। ২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মোট ৫ হাজার ২০৮ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছিল, যার মধ্যে ১ হাজার ৪২ কোটি ডলারের পণ্য গেছে যুক্তরাষ্ট্রে। পরের বছর অর্থাৎ ২০২২-২৩ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হয়েছে মোট ৯৭০ কোটি ডলারের পণ্য। গত অর্থবছরে রপ্তানি কিছুটা কমলেও দেশটি এখনো বাংলাদেশি পণ্যের সবচেয়ে বড় রপ্তানি বাজার।এবং যে রপ্তানিা আয় আসে তার প্রায় ৯০ ভাগই পোশাক খাতের।বাংলাদেশ যেসব দেশ থেকে পণ্য কিংবা সেবা আমদানি করে, সেই তালিকায় ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ছয় নম্বরে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বলছে, দেশের আমদানির সবচেয়ে বড় উৎস চীন। এরপরে রয়েছে ভারত, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া। গত বছর যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানির পরিমাণ ছিল ২৮৩ কোটি ডলারের।রপ্তানি আয়ের তুলনায় আমদানির এই চিত্র বলছে, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের ভারসাম্য বাংলাদেশের পক্ষে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানি অনেকটা একক পণ্যনির্ভর হয়ে থাকলেও সে দেশ থেকে আমদানি বেশ বৈচিত্র্যপূর্ণ। গত বছর যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশ যেসব পণ্য আমদানি করেছে, তার মধ্যে রয়েছে খনিজ জ্বালানি (৭৯ কোটি ডলার), লৌহ ও ইস্পাত (৭৩ কোটি ডলার), তেলবীজ ও ফল (৪৪ কোটি ডলার), তুলা (২৯ কোটি ডলার) এবং যন্ত্রপাতি (১৩ কোটি ডলার)। এর বাইরে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তি ও সেবা পণ্য।

বিনিয়োগের ক্ষেত্রে-বাংলাদেশের জন্য সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ বা এফডিআইয়ের প্রধান উৎস, এখনো যুক্তরাষ্ট্র। ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত প্রাপ্ত হিসাবে দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের স্থিতি ২ হাজার ২৪ কোটি ডলার। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ যুক্তরাষ্ট্রের ৩৫০ কোটি ডলার। যেসব খাত ও সেবায় এসব বিনিয়োগ রয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে গ্যাস ও পেট্রোলিয়াম, বস্ত্র শিল্প, ব্যাংকিং, বিদ্যুৎ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বিমা। বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের বড় বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে জ্বালানি খাতের শেভরন ও এক্সিলারেট এনার্জি, বিমা খাতের মেটলাইফ, ব্যাংক খাতে সিটি ব্যাংক এনএ।স্বাধীনতার পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন অংশীদার। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের তথ্যানুযায়ী, গত ৫০ বছরে দেশটি বাংলাদেশকে প্রায় ৮০০ কোটি ডলারের উন্নয়ন সহায়তা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশকে এখন সবচেয়ে বেশি অর্থ সহায়তা দেয়।  এখন দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের মূল ভিত্তি  বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ হলেও নানা ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে উন্নয়ন সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। কোভিড মহামারির সময় বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে অনুদান হিসেবে যত টিকা পেয়েছে, তার দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি এসেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। বাংলাদেশে পাঁচ বছর বা তার বেশি বয়সীদের করোনাভাইরাস থেকে সুরক্ষা দিতে যুক্তরাষ্ট্র সরকার প্রায় ১১ কোটি ৫০ লাখ ডোজ টিকা বিনা মূল্যে দিয়েছে।

অভিবাসনের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র একসময়ে ছিল উচ্চশিক্ষিত বাংলাদেশিদের পছন্দের গন্তব্য। তবে ডিভি লটারির কল্যাণে বিপুলসংখ্যক সাধারণ মানুষও যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনের সুযোগ পায়। পরে ফ্যামিলি ভিসার সুবাদে দেশটিতে বাংলাদেশিদের সংখ্যা অনেক বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র আদমশুমারি ব্যুরোর ২০১৮ সালের আমেরিকান কমিউনিটি জরিপের তথ্যানুসারে, সে সময় ২ লাখ ১৩ হাজার ৩৭২ বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মানুষ যুক্তরাষ্ট্রে বাস করতেন। সাম্প্রতিক সময়ে বাড়ছে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস জানিয়েছে, ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে রেকর্ডসংখ্যক শিক্ষার্থী বাংলাদেশ থেকে পড়াশোনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে গেছেন। এ সংখ্যা ছিল ১৩ হাজার ৫৬৩, যা আগের শিক্ষাবর্ষের তুলনায় ২৮ শতাংশ বেশি। এবং ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে যেসব দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী গেছেন, বাংলাদেশ তার মধ্যে অন্যতম। তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৩তম।তাঁদের অনেকে শিক্ষাজীবন শেষ করে ভালো চাকরি করছেন এবং দেশেও টাকা পাঠাচ্ছেন। চলতি অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে রেমিট্যান্স এসেছে ৫১ কোটি ১৭ লাখ ডলার। যা মোট রেমিট্যান্সের ১০ দশমিক ৪১ শতাংশ এবং মোট রেমিট্যান্স আসার মধ্যে অবস্থান চতুর্থ। গত অর্থবছরের একই সময়ে রেমিট্যান্স আহরণে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ছিল শীর্ষে। আলোচ্য সময়ে শীর্ষ অবস্থান থেকে নেমে গেছে চতুর্থ অবস্থানে। গত অর্থবছরের একই সময়ে দেশটি থেকে রেমিট্যান্স এসেছিল ৯৯ কোটি ৯৮ লাখ ডলার। ওই সময়ে যা মোট রেমিট্যান্সের ১৭ দশমিক ২ শতাংশ ছিল। ওই সময়ের ব্যবধানে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স আসা কমেছে ৪৮ দশমিক ৮৫ শতাংশ।

আমাদের সহযোগী ও বন্ধু প্রতিম অন্যান্য দেশ, যাদের বাংলাদেশের রাজনীতি ও অর্থনীতির ব্যাপারে ব্যাপক আগ্রহ রয়েছে যেমন ভারত, চীন ও রাশিয়ার সাথে আমাদের যে অর্থনৈতিক ও বানিজ্য সম্পর্ক রয়েছে তা বিশ্লেষন করলে দেখা যায়। বাংলাদেশের পণ্য আমদানির সর্বোচ্চ ৪৩ শতাংশ ভারত ও চীন থেকে আসে। সেই তুলনায় দেশ দুটিতে রপ্তানি খুবই নগণ্য, মাত্র ৫ শতাংশ। ফলে ভারত ও চীনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে বেশ পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ।বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, গত ২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশ ৭ হাজার ৫৬০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ অথবা ১ হাজার ৯৩৫ কোটি ডলারের পণ্যই আমদানি হয়েছে চীন থেকে। তারপরই ভারতের অবস্থান। দেশটি থেকে আমদানি হয়েছে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১ হাজার ৩৬৯ কোটি ডলারের পণ্য, যা মোট আমদানির ১৮ দশমিক ১১ শতাংশ।রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যানুযায়ী, গত অর্থবছর বাংলাদেশ থেকে ৫ হাজার ২০৮ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়। তার মধ্যে ভারতে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ১৯৯ কোটি এবং চীনে ৬৮ কোটি ডলার। এদিকে চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে ৪ হাজার ৫৬৮ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে। তার মধ্যে ভারতে ১৮৩ কোটি এবং চীনে ৫৩ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে।সাউথ এশিয়ান ফ্রি ট্রেড এরিয়া (সাফটা) চুক্তির আওতায় ভারতে ২৫টি পণ্য ছাড়া সব পণ্যে শুল্কমুক্ত রপ্তানি সুবিধা পায় বাংলাদেশ। এ ছাড়া চীনের বাজারে ৯৯ শতাংশ পণ্যেই শুল্কমুক্ত সুবিধা আছে। তার পরও দেশ দুটিতে যে রপ্তানি হচ্ছে, তা মোট পণ্য রপ্তানির মাত্র ৫ শতাংশের কাছাকাছি। চীন ও ভারত থেকে প্রবাসী আয় উল্লেখযোগ্য কিছু নয়। প্রবাসী আয় আসা শীর্ষ ৩০ দেশের মধ্যে দেশ দুটির নাম নেই। এ ছাড়া বাংলাদেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগে (এফডিআই) শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে চীন ও ভারত থাকলেও উভয় দেশের মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ২০৩ কোটি ডলার।বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে ২ হাজার ১১৬ কোটি ডলারের এফডিআই এসেছে। তার মধ্যে চীনের বিনিয়োগ ১৩৫ কোটি ডলার। আর ভারতের বিনিয়োগের পরিমাণ ৬৯ কোটি ডলার।

আর রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যাংকিং লেনদেন চালু করতে পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে আলোচনা চললেও দৃশ্যত কোনো অগ্রগতি হয়নি। ফলে দেশটির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য করতে হচ্ছে জার্মানি, পোল্যান্ড, তুরস্ক—এসব তৃতীয় দেশের মাধ্যমে।তা সত্ত্বেও রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য রয়েছে। একই সঙ্গে রাশিয়া ও বাংলাদেশের মধ্যে জ্বালানি খাতে বড় ধরনের সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। রাশিয়ার অর্থ বিনিয়োগ হয়েছে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে।২০২০-২০২১ সালে রাশিয়াতে মোট রপ্তানি হয়েছিল ৬৬.৫৩ কোটি ডলার, আমদানি ছিল ৪৮.১৯ কোটি ডলার এবং বানিজ্য ব্যবধান ছিল-১৮.৩৪ কোটি ডলার। ২০২১-২০২২ সালে রপ্তানির পরিমান ছিল ৬৩.৮৩ কোটি ডলার, আমদানির পরিমান ছিল ৪৭.৪২ কোটি ডলার এবং বানিজ্য ব্যবধান ছিল ১৬.৪১ কোটি ডলার।বাংলাদেশ ব্যাংক, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) ও সোনালী ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, রাশিয়ায় বাংলাদেশের রপ্তানি যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে দেশটি থেকে বাংলাদেশের আমদানিও।তবে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশের রপ্তানি কমে গেছে ২০ কোটি ডলারের মতো।বর্তমানে রাশিয়ার অর্থায়নে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার দুটি আলাদা বিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ চলছে। এতে রাশিয়ার অর্থায়নের পরিমাণ ১ হাজার ২৬৫ কোটি ডলার, যার ৯০ শতাংশই ঋণ। ঋণের সুদও উচ্চ, ৪ শতাংশ। ইউক্রেনে হামলার পর পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার ওপর বিভিন্ন ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ফলে এই প্রকল্পের ঋণের কিস্তি পরিশোধে তৈরি হয়েছে জটিলতা।তবে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে রাশিয়ার সঙ্গে নতুন করে যে সম্পর্কের উন্নয়ন হয়েছে, তা কাজে লাগিয়ে দেশটির আরও বিনিয়োগ বাংলাদেশ আশা করতে পারে। এই মুহুর্তে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণভাবে  চাপে রয়েছে রাশিয়া। যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার অর্থনীতিতে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে। দেশটির রাজনীতিতে পট পরিবর্তন হলে এই ক্ষত কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়, সেই ঝুঁকিও মাথায় রাখতে হবে বাংলাদেশকে।

বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারে দ্বন্দ্বাত্মক সম্পর্ক বিরাজমান। এই ধরনের দ্বন্দ্বের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে একটা বড় জায়গা গণতন্ত্র ও মানবাধিকার। এই দ্বন্দ্বাত্মক সম্পর্ক যদি রাজনৈতিক থেকে অর্থনৈতিক সম্পর্কে রুপ নেয়, তবে তার জন্য হয় তো বাংলাদেশকে অনেক বড় মাশুল দিতে হতে পারে। বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র নানাভাবে চাপ সৃষ্টি করে যাচ্ছে। মানবাধিকার ও নির্বাচন ইস্যুতে ইতোমধ্যে ভিসানীতি আরোপ করেছে। এর পাশাপাশি শ্রমিক অধিকার হরণ করলে বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হবে বলে হুমকি দিয়েছে। আমাদের জন্য ক্ষতিকর কিছু হোক তা আমরা চাই না। এমন পরিস্থিতি আমাদের এড়িয়ে যেতে হবে।একটি দেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থা যখন চরম অস্থিতিশীল থাকে এবং জাতি দ্বিধা বিভক্ত থাকে তখন অনেক পক্ষ ই তার সুযোগ নিতে চায়। বাংলাদেশে এই মুহুর্তে ঠিক এই অবতস্থায় ই বিরাজমান। তাই এই মুহুর্তে প্রত্যেক টি দেশ প্রেমিক নাগরিক ও সরকারকে সঠিক পক্ষ বেছে নিতে হবে। আর সরকার যদি এই ব্যাপারে ভুল সিদ্বান্ত গ্রহন করে তাহলে জাতিকে অনেক বড় মাশুল দিতে হবে।  সম্প্রতি শ্রমিক অধিকার–সম্পর্কিত যে নীতি যুক্তরাষ্ট্র নিয়েছে, সেটি বাংলাদেশকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। শ্রমিক অধিকারের কোনো বিষয় থাকলে তা সমাধান করা প্রয়োজন। আমাদের অনুধাবন করতে হবে যে,রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে মার্কিন উদ্বেগের পরপরই শ্রমিক অধিকারের বিষয়টি এসেছে। আমরা বিশ্বাস করি বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও উঁচুতে উঠতে পারে, যদি সম্ভাবনাগুলোকে কাজে লাগানো যায়। তবে দ্বিপক্ষীয় ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক আরও গভীর করা সম্ভব। প্রযুক্তি এবং তথ্যপ্রযুক্তি, জ্বালানি, বিশেষ করে গভীর সমুদ্রে গ্যাস-তেল অনুসন্ধান এবং উৎপাদনের মতো খাতে মার্কিন বিনিয়োগ ও বাণিজ্য আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। 
 

লেখক : মোঃ সহিদুল ইসলাম সুমন, অর্থনৈতিক বিশ্লেষক।

 

 

বি:দ্র: উক্ত কলামের সম্পূর্ণ মতামত লেখকের, তথ্য উপাত্ত দায়দায়িত্ব সম্পূর্ণ তাঁর। 

Ads