রাষ্ট্রায়াত্ত ব্যাংকে আওয়ামী দোসরদের সর্বোচ্চ পদ দখলের অভিযোগ
২৪ নভেম্বর ২০২৪, ১০:১০ পিএম
পর্ব-১
দেশের রাষ্ট্রায়াত্ত ব্যাংকগুলোর ‘সর্বোচ্চ পদে’ রূপালী ব্যাংক প্রিএলসি’র ১৯৯৮ সালে চাকরীতে নিয়োগ প্রাপ্তরাই কোন এক অদৃশ্য শক্তির কারণে বরাবরই সর্বোচ্চ পদে পদোন্নতি পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেক কর্মকতারা বলেছেন,‘পদোন্নতি প্রাপ্তরা ফ্যাসিবাদের সুবিধাভোগী এবং সহযোগী’। তারা ঘুরে-ফিরে কীভাবে এ ধরনের সর্বোচ্চ পদে পদোন্নতির সুযোগ পায় এ নিয়ে বিস্তর অভিযোগ উঠেছে খোদ রাজধানী মতিঝিলের ব্যাংক পাড়ায়।
বিভিন্ন তথ্যসূত্রে জানা যায়, রূপালী ব্যাংক ব্যতীত অন্যান্য রাষ্ট্রায়াত্ত ব্যাংকের ১৯৯৪, ১৯৯৫ ও ১৯৯৮ সালে নিয়োগ প্রাপ্ত কর্মকর্তারা ফ্যাসিবাদী সরকারের সময় বৈষম্যের স্বীকার হয়ে পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। পদোন্নতি থেকে বঞ্চিতরা প্রত্যাশা করেছিল বর্তমান বৈষম্য বিরোধী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পর যথাযোগ্য মর্যদা পাবেন। কিন্তু, এবারও অতীতের মতই পরিস্থিতির স্বীকার হলেন তারা। ভুক্তভোগীরা বলছে, অজানা কোন শক্তি প্রয়োগে তাদেরকে গোলা পানি খাইয়ে দুধের স্বাদ মেটানো হচ্ছে। এতে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সদ্য ডিজিএম-এ পদোন্নতির সুপারিশ প্রাপ্ত এবং পদবঞ্চিত কর্মকর্তারা।
গত বৃহস্পতিবার, ২১ নভেম্বর ২০২৪ইং তারিখ ‘সোনালী ব্যাংক পিএলসি’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক বরাবর মোঃ মামুনুর রসিদ, উপসচিব স্বাক্ষরিত অর্থ মন্ত্রণালয়ের পদোন্নতি প্রদানের একটি অবেদন পত্র প্রেরণ করে, যার স্বারক নং-৫৩.০০.০০০০.১১.০০১.২৩.৩০৭, তারিখ: ২১ নভেম্বর, ২০২৪ । সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে- ১৯৯৪, ১৯৯৫ ও১৯৯৮ সালে যোগদানকৃত/নিয়োগ প্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে ২৮জন বৈষমের স্বীকার পদোন্নতি বঞ্চিত এজিএম, সিনিয়র অফিসার ও অফিসার পদধারী কর্মকর্তাদের ভুতাপেক্ষ ডিজিএম পদে পদোন্নতি প্রদান করার জন্য বলা হয়। পদোন্নতির এমন পত্র পেয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক সমূহে কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে সন্তুষ্টির পরিবর্তে মর্মাহত হতে দেখা গেছে বলে জানিয়েছে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা।
এমনকি ডিজিএম পদে পদোন্নতি সুপারিশ প্রাপ্ত কর্মকর্তারাও এমন পদোন্নতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বলেও জানা গেছে। তাদের ভাষ্য, রূপালী ব্যাংক এর জুনিয়র ব্যাচের অর্থাৎ ১৯৯৮ সালে নিয়োগ প্রাপ্তরা যদি ব্যবস্থাপনা পরিচালক, উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মহাব্যবস্থাপক হিসাবে দায়িত্ব পালন করতে পারে; কিন্তু দীর্ঘদিন যাবৎ তাদেরকে পদ বঞ্চিত রাখার পরেও কেন ডিজেএম পদে পদোন্নতির জন্য সুপারিশ করা হলো?
বৈষম্য বিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে স্বৈরশাসক আওয়ামীলীগ সরকারের পতনের পর দেশ পুনর্গঠনের এ পর্যায়ে তাদের দোসর ও অর্থনৈতিক ধ্বংসের কারিগর অসৎ কর্মকর্তারা কীভাবে বার বার পুর্নবহল হয়! এমন প্রশ্ন রেখেছেন বিক্ষুব্ধ কর্মকর্তারা। তাদের পেছনের মূল কারিগর কারা অথবা কোন ঐশ্বরিক ক্ষমতার কারণে দোসরদের সর্বোচ্চ পদে আসীন রয়েছে সেটা উদঘাটন করতে সাংবাদিকদের আহ্বান জানিয়েছেন যোগ্য পদের বঞ্চিত কর্মকর্তারা।
কর্মকর্তারা আরো অভিযোগকরে বলেন, মতিঝিল ব্যাংক পাড়ায় একক আধিপত্য রূপালী ব্যাংকের সুবিধাভোগী কিছু অসাধু ব্যাক্তিরা তোষামোদ করে প্রতিবারই পদোন্নতি নিয়েছেন। অযোগ্য সুবিধাভোগীদের কারণেই নাকি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস হয়েছে। এসব চাতুকার কর্মকর্তারা আর্থিক প্রতিষ্ঠান শুধু ধ্বংস করে ক্ষান্ত হননি, তারা বহাল তবিয়তে ব্যাংকের সর্বোচ্চ নির্বাহী হয়ে পুনরায় ব্যাংক খাতকে নিশ্চিহ্ন করার পায়তারা করছে। এই দোসররা ব্যাংক ঋণ ও পুনঃতফসিল করনের মাধ্যমে সিন্ডিকেট সৃষ্টি করে পতিত সরকারের দোসরদেরও অবৈধ সুবিধা দিয়ে ব্যাংক খাতকে দেউলিয়ার দারপ্রান্তে দাঁড় করিয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন এজিএম বলেন, ফ্যাসিবাদী আওয়ামীলীগ সরকারের আর্শীবাদপুষ্ট ব্যাংকিং খাত ধ্বংসের মূল কারিগর হলেন ব্যাংক ও আর্থিক বিভাগের সাবেক সচিব শেখ মোহাম্মদ সলিমুল্লাহ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আব্দুর রউফ গং। তিনি বলেন, তারা এখনো ব্যাংক পাড়ায় আধিপত্য বিস্তার করছে। কিছু অসৎ কর্মকর্তারা তাদের প্রভাবে বর্তমানে বিভিন্ন ব্যাংকে নির্বাহী হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন।
আরো জানাগেছে, রূপালী ব্যাংক স্থানীয় কার্যালয় ধ্বংসের ক্রীনকের ভূমিকায় ১৯৯৮ সালে রুপালী ব্যাংক এ নিয়োগ প্রাপ্ত কর্মকর্তারা। ব্যাংক পাড়ার একক আধিপত্য রূপালী ব্যাংকের কিছু সুবিধাভোগী অসাধু কর্মকর্তাই সব সময় ফ্যাসিস্ট দালালদের তোষামোদি করে সুবিধা ও পদোন্নতি নিয়ে রূপালী ব্যাংক ধ্বংস করেছেন।
তথ্যমতে, বর্তমানে রূপালী ব্যাংকের মোট ঋণের প্রায় ২২ শতাংশই খারাপ ঋণ । ঋণ শ্রেনীকরনের সার্কুলার অনুযায়ী রির্পোট করা হলে পরিমান হবে ৩৫-৩৮% অধিক ।শুধু মাত্র ব্যাংকটির স্থানীয় কার্যালয়ের ঋণ শ্রেণীকরণ রিপোর্ট ঠিকমত না হওয়ার কারণে ব্যাংকটি চরম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। আর এসব হয়েছে সে সময়কার ব্যাংকিং বিভাগের দুনীর্তির মূল হোতা সাবেক সচিব শেখ সলিমুল্লাহ ও সাবেক বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর আব্দুর রউফের ছত্রছায়ায়।
বৈষম্য স্বীকার যোগ্য পদোবঞ্চিত বিভিন্ন ব্যাংক কর্মকর্তারা মনে করেন এখনই সুযোগ এদের হাত থেকে সকল রাষ্ট্রায়াত্ত ব্যাংক রক্ষা করার। তাদের ভাষ্য দোসরা সর্বত্র সজাগ রয়েছে তারা কীভাবে ব্যাংক ধ্বংস করা যায়! পাশাপশি দুনীর্তির মূলহোতাদের রক্ষা করা যায়।
দেশ প্রেমিক ব্যাংক কর্মকর্তারা অন্তর্বতীসরকারের কাছে উদাত্ত্ব আহ্বান জানিয়ে বলেন, যেভাবেই হোক রূপালী ব্যাংকের খারাপ ঋণ বিতরন ও খারাপ ঋণ পুনঃ তফসিল করনের সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত কর্মকর্তাদের হাত থেকে ব্যাংক সেক্টর রক্ষা করুণ। তা নাহলে দূর্নীতির রাঘববোয়লদের পতিতকার্যকলাপ ধামাচাপা দিতে তাদের অনুসারীদের প্রতিষ্ঠিত করতে বর্তমানে সোনালী ব্যাংকের দুনীর্তিবাজ অফিসার উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী মোঃ ওয়াহিদুল ইসলাম ও জনতা ব্যাংকের উপ- ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ গোলাম মর্তুজা গংদের রূপালী ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক করার পায়তারা করতেন না।
শুধু তাই নয়- রূপালী ব্যাংক, চট্টগ্রাম বিভাগের জিএম কাজী মোঃ ওয়াহিদুল ইসলাম ও রূপালী ব্যাংক প্রধান কার্যালয়ের শিল্প ঋণ বিভাগের জিএম মোঃ গোলাম মর্তুজা এই দুজনও এস আলম গ্রুপের সকল ঋণ প্রদানের অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন বলে জানিয়েছে ঐ বিভাগের কর্মরত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংশ্লিষ্টরা। এছাড়া উপরোক্ত কর্মকর্তারা প্রধান কার্যালয়ের শিল্প ঋণ বিভাগে কর্মরত থাকাকালীণ সময়ে নারায়নগঞ্জ আওয়ামীলীগ নেতা শামীম ওসমান এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান ‘অবন্তি’-কেও অর্থনৈতিক সুবিধা দিতে শাখা ব্যবস্থাপককে চাপ দিয়েছিলেন বলে জানাগেছে, বর্তমানে যা শ্রেনীকৃত। দুর্নীতির মাস্টারমাইন্ড নামে খ্যাত গং দ্বয় ডিজিএম হিসাবে বিভিন্ন কর্পোরেট শাখায় দায়িত্ব পালনকালে আওয়ামীলীগ সুবিধাভোগীদের ঋণ দিয়েছেন যা বর্তমানে শ্রেনীকৃত ও আদায় অযোগ্য ব্যাংক তথ্যসূত্রে জানাগেছে।
উল্লেখ্য, গত ১৫ বছরে ব্যাংক খাতে ২ লক্ষ অধিক মন্দ ঋণ পরিলক্ষিত হয়। বর্তমান সরকার সঠিকভাবে ব্যাংকিং খাত সংস্কার করতে চাইলে মন্দ ঋণের পরিমান আরও বৃদ্ধি পেতে থাকে। এর পিছনে মূল কারণ হল মন্দ ঋণকে ভালো ঋণ হিসাব দেখানো। যে কারণে উক্ত কার্যক্রমকে স্বচ্ছতা ও ফ্যাসিবাদের দালাল মুক্ত ব্যাংক খাত সংস্কারের জন্য রাষ্ট্রয়ত্ব ৬ টি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগের চুক্তি বাতিল করেন।
চুক্তি বাতিল পূর্বক ব্যাংক পাড়ায় নতুন নিয়োগকৃত ৯টি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে চুক্তি ভিত্তিক ও নিয়মিত নিয়োগ দেওয়া হয়। নিয়োগ প্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক গন বঙ্গবন্ধু পরিষদের উপদেষ্টা ও ব্যাংকিং খাত ধ্বংসের মূল কারিগর সাবেক ব্যাংক ও আর্থিক বিভাগের সচিব শেখ মোহাম্মদ সলিমুল্লাহ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আব্দুর রউফ গংদের বর্তমানে রূপালী ব্যাংক এ তাদের আর্শিবাদ পুষ্ট ফ্যাসিবাদের সহযোগিদের নিয়োগ দেওয়ার পায়তারা চলছে ।
১। কাজী মোঃ ওয়াহিদুল ইসলাম, উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক, সোনালী ব্যাংক এবং দায়িত্ব পালন করছেন রূপালী ব্যাংক ইউনিট ‘বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদ’-এর সহ- সভাপতির।
২। মোঃ গোলাম মতুর্জা, উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক, জনতা ব্যাংক এবং রূপালী ব্যাংক ইউনিট ‘বঙ্গবন্ধু পরিষদ’ এর উপদেষ্টা।
৩। ওয়াহিদা বেগম, উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক, অগ্রণী ব্যাংক এবং রূপালী ব্যাংক ইউনিট ‘বঙ্গবন্ধু পরিষদ’ এর উপদেষ্টা।
৪। মো: আ: রহিম, উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক। তিনি একজন কবি, বঙ্গবন্ধু ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে কবিতা লেখতেন।
৫। শচীন নাথ সমাদ্দর, উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বিডিবিএল এবং রূপালী ব্যাংক ইউনিট ‘বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদ’ এর সভাপতি।
বৈষমের স্বীকার পদ বঞ্চিতা কর্মকর্তারা মনে করছে- রাষ্ট্রয়াত্ত ব্যাংক গুলো রক্ষা করতে হলে আওয়ামীলীগের দোসর, দুর্নীতিবাজ, সুযোগ-সুবিধাভোগী এবং অসৎ কর্মকর্তাদের পুনঃ বহাল করা যাবেনা। সংস্কারের ধারা অনুযায়ী তদন্ত সাপেক্ষে ওই দোসরদের শাস্তি আওতায় আনার জোড় দাবি করছে সকল রাষ্ট্রয়াত্ত ব্যাংকের চাকরীরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তারা ‘ছাত্র-জনতার আত্মাহুতির মাধ্যমে অর্জিত নতুন স্বাধীনতাকে অগ্রগামী দেখতে চান।
























