ফেসবুকে সস্তায় চাঁদপুরের ইলিশ বিক্রির ফাঁদ

মূলহোতাসহ নড়াইল থেকে চক্রের মোট ১১ সদস্য গ্রেপ্তার

নিজস্ব প্রতিবেদক

০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৩৬ পিএম


মূলহোতাসহ নড়াইল থেকে চক্রের মোট ১১ সদস্য গ্রেপ্তার

 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লোভনীয় বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে কম দামে চাঁদপুরের তাজা ইলিশ বিক্রির নামে অভিনব প্রতারণা চালিয়ে আসছিল একটি সংঘবদ্ধ চক্র। ফেসবুকে ভুয়া পেজ খুলে ও চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে সাধারণ ক্রেতাদের আকৃষ্ট করে তারা হাতিয়ে নিচ্ছিল হাজার হাজার টাকা। বিকাশ বা নগদ নম্বরে অগ্রিম টাকা নেওয়ার পর নানা অজুহাতে আরও অর্থ দাবি করে এবং টাকা পাওয়ার পর ক্রেতার নম্বর ব্লক করে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিত এই প্রতারকরা। অনলাইনে ইলিশ কেনার এই ফাঁদে পড়ে ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের সাধারণ মানুষ ও সংবাদকর্মীরাও সর্বস্বান্ত হয়েছেন।

গত রোববার নড়াইল জেলার কালিয়া উপজেলায় যৌথ অভিযান চালিয়ে এই প্রতারক চক্রের চার সদস্যকে গ্রেপ্তার করে চাঁদপুর জেলা ও গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন—ফুরকান শেখ (২৫), চান মিয়া (২৫), রাতুল হোসেন (২৫) এবং শহিদুল শেখ (২৩)। পরবর্তীতে আইনি প্রক্রিয়া শেষে আজ মঙ্গলবার তাঁদের চাঁদপুরের আদালতে পাঠানো হয়েছে। এ সময় তাঁদের কাছ থেকে প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত ১০টি মোবাইল ফোন, ৪৬টি সিম কার্ড (যার মধ্যে ২টি ভারতীয়) এবং নগদ ৭৫ হাজার টাকা জব্দ করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এর আগে একই অভিযোগে গত ২০ আগস্ট দুজনকে এবং ২৬ আগস্ট পৃথক অভিযানে আরও পাঁচজনকে নড়াইল থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।

প্রতারণার অভিনব কৌশল:
চক্রটি ফেসবুকে ‘চাঁদপুর ইলিশ বাজার’ কিংবা ‘চাঁদপুর মাছওয়ালা’র মতো আকর্ষণীয় নামের পেজ খুলে এডিটেড ছবি-ভিডিও ও ভুয়া গ্রাহক রিভিউ ব্যবহার করে বিজ্ঞাপন বুস্ট করত। ক্রেতাদের বিশ্বাস অর্জনে তারা অন্যের নামে নিবন্ধিত সিম, ভুয়া এনআইডি এবং চাঁদপুরের মৎস্যঘাটের ভুয়া ট্রেড লাইসেন্স ব্যবহার করত। অর্ডার কনফার্ম করার নাম করে প্রথমে বিকাশ বা নগদে অগ্রিম টাকা নেওয়া হতো। এরপর ডেলিভারি কোড, ওটিপি বা সার্ভার সমস্যার কথা বলে আরও টাকা হাতিয়ে নিয়ে নম্বরে ব্লক করে দেওয়া হতো এই প্রতারকরা।

অনলাইন এই প্রতারণার মূল শিকড় নড়াইলে রয়েছে বলে জানিয়েছেন চাঁদপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার নাদিরা নুর। তিনি জানান, অনলাইনে চাঁদপুরের ইলিশের ভুয়া বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রতারণার বহু অভিযোগ পাওয়ার পর তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তদন্ত চালিয়ে এই চক্রের সন্ধান পাওয়া যায়। পুরো চক্রটিকে সম্পূর্ণ নির্মূল করতে জেলা পুলিশ ও ডিবির অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

এই চক্রের খপ্পরে পড়ে সম্প্রতি চট্টগ্রামের সংবাদকর্মী মীর মোহাম্মদ আসলাম এতিমখানার শিশুদের খাওয়ানোর জন্য প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ দিয়ে অনলাইনে আট কেজি ইলিশ অর্ডার করে প্রতারণার শিকার হন। ওটিপি ও সার্ভার সমস্যার কথা বলে ধাপে ধাপে তাঁর কাছ থেকে ১৫ হাজার ৯৮০ টাকা হাতিয়ে নেয় চক্রটি। একইভাবে কুমিল্লার বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. বসিরূল আলম ভূঁইয়া ‘চাঁদপুর মাছওয়ালা’ পেজের মাধ্যমে চার হাজার টাকা হারিয়েছেন। এসব ঘটনায় চাঁদপুর পুলিশ সুপার বরাবর লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে।

অনলাইন প্রতারণা রোধে চাঁদপুর জেলা প্রশাসন বিক্রেতাদের নিবন্ধনের উদ্যোগ নিলেও প্রতারণা পুরোপুরি থামছে না। চাঁদপুর জেলা মৎস্য বণিক সমিতির সভাপতি আবদুল বারি জমাদার সাধারণ মানুষকে অনলাইন কেনাকাটা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, অনলাইনে ইলিশ কিনতে গেলেই প্রতারিত হওয়ার বড় ঝুঁকি থাকে। খাঁটি ও তাজা ইলিশ পেতে হলে ক্রেতাদের সরাসরি নদী বন্দর বা ঘাটে এসে কেনাকাটা করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

Ads