রাশিয়ার গম ও ভোলার গ্যাসকূপ দুর্নীতি

দুদকের জালে ‘মূল কারিগর’ মিয়া সাত্তার, শিগগিরই মামলা

নিজস্ব প্রতিবেদক

০৭ আগস্ট ২০২৬, ০৬:৫৩ পিএম


দুদকের জালে ‘মূল কারিগর’ মিয়া সাত্তার, শিগগিরই মামলা


ক্ষমতার রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও যাঁর দাপট কমেনি, সেই বিতর্কিত ব্যবসায়ী মিয়া সাত্তারকে অবশেষে অভিযুক্তদের তালিকায় আনছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। কেলেঙ্কারির ঘটনায় সাবেক খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার কারাগারে এবং সাবেক খাদ্যসচিব ইসমাইল হোসেন বাধ্যবাধকতামূলক অবসরে গেলেও ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলেন মূল কারিগর- ন্যাশনাল ইলেকট্রিক কোম্পানির চেয়ারম্যান মিয়া সাত্তার। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে দাপিয়ে বেড়ানো প্রভাবশালী এই ব্যবসায়ী অবশেষে দুদকের জালে যাচ্ছেন আটকে।

দুদকের তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সাবেক খাদ্যমন্ত্রী ও তাঁর সিন্ডিকেট একটি অখ্যাত মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে রাশিয়ার কাছ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারদরের চেয়ে চড়া দামে নিম্নমানের গম কেনে। অনুসন্ধান দলের সদস্য ও দুদকের সহকারী পরিচালক আফনান জান্নাত কেয়া জানান, অনুসন্ধানের স্বার্থে সব তথ্য এখনি প্রকাশ করা না হলেও, আমদানির নামে শত শত কোটি টাকা লোপাটে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের মতো পর্যাপ্ত ও নিরেট দালিলিক প্রমাণ উদ্ধার করা হয়েছে।

তিনি আরও জানান, প্রাপ্ত নথিপত্র যাচাই-বাছাইয়ের কাজ শেষ। যেকোনো মুহূর্তে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের সুপারিশসহ চূড়ান্ত প্রতিবেদন কমিশন বরোদে জমা দেওয়া হবে।

জিটুজি চুক্তি উপেক্ষা ও গম আমদানিতে হাজার কোটি টাকার জালিয়াতি
দুদকের অনুসন্ধান ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ের নথিসূত্রে জানা যায়, ২০২২ সাল থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকার জিটুজি (সরকার টু সরকার) পদ্ধতিতে রাশিয়া থেকে গম আমদানির চুক্তি করে। তবে তৎকালীন রুশ কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপে জিটুজি শর্ত উপেক্ষা করে মিয়া সাত্তারের মালিকানাধীন ন্যাশনাল ইলেকট্রিক গ্রুপকে মধ্যস্থতার দায়িত্ব দেওয়া হয়। এই সুবিধার সুযোগ নিয়ে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ১১ লাখ টন গম আমদানি করে গ্রুপটি। সমসাময়িক আন্তর্জাতিক বাজারদরের চেয়ে টনপ্রতি ৫০ থেকে ৬০ ডলার অতিরিক্ত দর ধরে নিম্নমানের এবং ইউক্রেন থেকে আনা বিতর্কিত গমের চালান সরবরাহ করে হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় চক্রটি।

লোকচক্ষু ও সমালোচনা এড়াতে মিয়া সাত্তারের ভাই আমিরুজ্জামান সোহেল 'আর ডি গ্লোবাল' নামে আরেকটি ভুয়া প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন এবং সেই কোম্পানির মাধ্যমেই মূলত চালানের সিংহভাগ খালাস করা হয়। এর আগে ২০১৫ সালে ব্রাজিল থেকে সাড়ে ১১ শতাংশ প্রোটিনের নিম্নমানের গম আমদানি করে সরকার সমালোচনার মুখে পড়লে মান সংশোধন করে সাড়ে ১২ শতাংশ করা হয়েছিল। কিন্তু সাধন চন্দ্র মজুমদার খাদ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর সেই মান পুনরায় কমিয়ে সাড়ে ১১ শতাংশে নামিয়ে আনেন এবং বিশেষজ্ঞ মহলের চরম আপত্তি সত্ত্বেও ওই মানের গম আমদানির পথ সুগম করেন।

ভোলার গ্যাসকূপ খননে ১২ মিলিয়ন ডলারের বাড়তি ব্যয়
খাদ্য খাতের পাশাপাশি জ্বালানি খাতেও মিয়া সাত্তারের প্রভাব ও দুর্নীতির বড় প্রমাণ মিলেছে পেট্রোবাংলা ও বাপেক্সের অনুসন্ধানে। ২০১৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে ভোলার তিনটি গ্যাসকূপ খননের জন্য রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গ্যাজপ্রমের সঙ্গে বাপেক্সের দর-কষাকষি চলছিল, যার প্রাথমিক দরপ্রস্তাব ছিল প্রায় ৫২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। আলোচনার মাঝামাঝি সময়ে হঠাৎ গ্যাজপ্রম দর-কষাকষি স্থগিত করে ৬৪ মিলিয়ন ডলারের নতুন প্রস্তাব দেয়। এ সময় গ্যাজপ্রমের স্থানীয় প্রতিনিধিদল বদলে গিয়ে নতুন দল আসে, যার নেতৃত্বে ছিলেন মিয়া সাত্তার।

রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাপেক্স এই আকাশচুম্বী দর নিয়ে কাজ করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করলেও সরকারের উচ্চপর্যায়ের সরাসরি চাপে কয়েকদিনের মধ্যে ৬৪ মিলিয়ন ডলারের প্রস্তাবই অনুমোদন করতে বাধ্য হয়। ফলে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে অতিরিক্ত প্রায় ১২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার খসে পড়ে। অথচ বাপেক্স নিজস্ব সক্ষমতায় মাত্র ১০ থেকে ১২ মিলিয়ন ডলার খরচে এই তিনটি কূপ খনন করতে পারত। পরবর্তীতে দেখা যায়, গ্যাজপ্রম উচ্চমূল্যে কাজ বাগিয়ে নিয়ে উজবেকিস্তানের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান 'এরিয়ল'কে দিয়ে নামমাত্র মূল্যে কূপগুলো খনন করায়।

বাপেক্সের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ আলী ঘটনাটি নিশ্চিত করে জানান, দরপ্রস্তাব চলাকালীন হঠাৎ প্রতিনিধিদল বদলে ন্যাশনাল ইলেকট্রিক গ্রুপের লোকজন আলোচনায় চলে আসে এবং একটি আলোচনার মধ্যেই দ্বিতীয় দরপ্রস্তাব পেশ করে। বাপেক্স দর কমানোর চেষ্টা করলেও তৎকালীন সরকারের নির্দেশে তাদের মেনে নিতে হয়।

মিয়া সাত্তারের দুর্নীতির ইতিহাস বেশ পুরোনো। সাবেক রাষ্ট্রপতি হোসেইন মোহাম্মদ এরশাদের আমলে রাশিয়ার কাছ থেকে মিগ-২৯ যুদ্ধবিমান কেনাকাটার দুর্নীতিতে প্রথম তাঁর নাম উঠে আসে। পরবর্তী সময়ে রাশিয়ায় বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত সাইফুল ইসলামের ঘনিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন, গম সরবরাহ ও জ্বালানি খাতের মতো বড় বড় মেগা প্রকল্পে অনুপ্রবেশ ঘটে তাঁর। একাধিক দেশের পাসপোর্ট ব্যবহারকারী এই ব্যবসায়ী সরকার পরিবর্তনের পর নিজে প্রকাশ্যে না এলেও অন্য দেশের পাসপোর্ট ব্যবহার করে একাধিকবার দেশে এসেছেন এবং নতুন সরকারের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব ও প্রভাবশালী মন্ত্রীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে পুনরায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালাচ্ছেন।

মিয়া সাত্তারের পারিবারিক সিন্ডিকেটের মধ্যে তাঁর সহোদর ভাই আমিরুজ্জামান সোহেল ন্যাশনাল ইলেকট্রিক গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং অপর ভাই রায়হান গফুর সিরাজগঞ্জের সলঙ্গা থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

সুনির্দিষ্ট অভিযোগের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে মিয়া সাত্তারের সাথে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করা হলে তিনি সাংবাদিক পরিচয় পেয়েই কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান এবং সংযোগ কেটে দেন। অন্যদিকে তাঁর ভাই আমিরুজ্জামান সোহেল যাবতীয় দায় এড়িয়ে বলেন, গম আমদানির সব চুক্তি খাদ্য মন্ত্রণালয় ও রাশিয়ার মধ্যে জিটুজি পদ্ধতিতে হয়েছে, তাই এ বিষয়ে যা জানার খাদ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের কাছ থেকেই জানতে হবে।

 

Ads