প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর
তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও ভূরাজনীতির সমীকরণে নতুন প্রত্যাশা
২৪ জুন ২০২৬, ০৮:০৭ এএম
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চলমান চীন সফরে তিস্তা মহাপরিকল্পনা প্রকল্পের বিষয়টি আনুষ্ঠানিক কার্যসূচিতে রাখা হয়নি। তবে কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে, চীনের রাষ্ট্রপতি শি জিনপিং ও প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে ইস্যুটি গুরুত্বের সাথে আলোচনায় আসতে পারে। সূত্রমতে, কৌশলগত কারণে ভারত এই প্রকল্প চীনের মাধ্যমে বাস্তবায়ন হোক তা চাচ্ছে না। কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় তিস্তা প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। এ কারণে বাংলাদেশ আগেই জানিয়ে রেখেছে, প্রয়োজনে নিজস্ব অর্থায়নে এই প্রকল্প সম্পন্ন করা হবে। এমন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরে তিস্তা নিয়ে শেষ পর্যন্ত কী বার্তা আসে, সেদিকেই এখন নজর কূটনৈতিক মহল, ভারত এবং বাংলাদেশের সচেতন জনগোষ্ঠীর।
সফরের প্রথম দিন মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের আন্তর্জাতিক আয়োজনে অংশ নিয়েছেন। চারদিনের এই রাষ্ট্রীয় সফরে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে উন্নয়ন সহযোগিতা, দ্বিতীয় মোংলা বন্দর সম্প্রসারণ ও আধুনিকীকরণ, মুক্তবাণিজ্য, জ্বালানি সহযোগিতা এবং বাংলাদেশ থেকে চীনে উচ্চমানের পণ্য রপ্তানিসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা রয়েছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তিস্তা প্রকল্প নিয়ে চীনের আগ্রহ দীর্ঘদিনের হলেও ভারত শুরু থেকেই একে নেতিবাচক চোখে দেখছে। ভারতের সংবেদনশীল ‘চিকেন নেক’ করিডোরের কাছাকাছি তিস্তার অবস্থান হওয়ায় সেখানে চীনের উপস্থিতি ভবিষ্যতে দিল্লির জন্য নিরাপত্তাজনিত হুমকি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তবে বাংলাদেশের বাস্তবতা হলো, ভারত থেকে প্রবাহিত তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশ পায়নি।
রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তিস্তা মহাপরিকল্পনা এখন আর কেবল বাংলাদেশের পানির ন্যায্য দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তিস্তার ওপারে যেমন ভারত রয়েছে, তেমনি এই নদীর উজানের অংশ নিয়ন্ত্রণ করে চীন এবং সেখানেও বেইজিংয়ের নিজস্ব প্রকল্প পরিকল্পনা আছে। ধারণা করা হয়, চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (বিআরআই) প্রকল্পের অংশ হিসেবেই তিস্তায় তাদের এই বিপুল আগ্রহ, যার লক্ষ্য এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকাকে এক সুতায় গাঁথা। ফলে তিস্তা প্রকল্পকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা ভূরাজনৈতিক হিসাবনিকাশ।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান এই প্রকল্পের বিষয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছেন। প্রথমত, নদীশাসন বিশেষজ্ঞদের অনেকে এখনও নিশ্চিত নন তিস্তা অববাহিকায় ঠিক কেমন প্রকল্প করলে বাংলাদেশের প্রকৃত উপকার হবে, তাই আমাদের আরও নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, বিদেশী অর্থায়নে এই মহাপরিকল্পনা হলে তা ঋণ হিসেবে আসবে; প্রকল্প থেকে সরাসরি আয় না হলে এই ঋণ বৈদেশিক রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তৃতীয়ত, প্রাকৃতিক প্রবাহে কৃত্রিম পরিবর্তন আনার কারণে পরিবেশের ওপর কী প্রভাব পড়বে তা খতিয়ে দেখা দরকার এবং চতুর্থত, এটি রক্ষণাবেক্ষণের কারিগরি সক্ষমতা আমাদের আছে কি না তা ভাবা উচিত।
সাবেক রাষ্ট্রদূত আরও উল্লেখ করেন, তিস্তার পানিপ্রবাহের সাথে ভারত ও চীনসহ একাধিক দেশের নদীপ্রবাহ জড়িত। আমরা ঠিক কতটুকু পানি পাব তা নিশ্চিত না হয়ে প্রকল্প করলে জটিলতা বাড়বে। তাই ভারতের সাথে চুক্তি হওয়া জরুরি। আবার চীনের নিয়ন্ত্রণে উজানের অংশ থাকায় ভারতও পর্যাপ্ত পানি পাচ্ছে কি না তাও নিশ্চিত হওয়া দরকার। এই পরিস্থিতিতে পুরো বিষয়টি নিয়ে বহুপাক্ষিকভাবে আলোচনা করাই হবে সবচেয়ে উত্তম সমাধান।
তিস্তা প্রকল্প নিয়ে গত এক দশকে দেশের রাজনীতিতে বহু প্রতিশ্রুতি দেখা গেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে চীনের অর্থায়নে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের আলোচনা শুরু হয় এবং ২০১৬ সালে চীনা প্রতিষ্ঠান ‘পাওয়ার চায়না প্রাইভেট লিমিটেড’-এর সাথে সমঝোতা স্মারক সই হয়। দুই বছর সমীক্ষার পর ২০১৮ সালে চীনা কোম্পানি একটি প্রাথমিক ধারণাপত্র দেয়, যা কোনো পূর্ণাঙ্গ স্টাডি ছিল না। তৎকালীন ডলারের দর অনুযায়ী এর ব্যয় ধরা হয়েছিল ৮ হাজার কোটি ২৪০ টাকা। তবে শতকরা ৩ ভাগ সুদের বিপরীতে এই উচ্চাভিলাষী ঋণের বিষয়ে সে সময় সরকারের কারিগরি টিম আপত্তি জানায়। চীনের আগ্রহ থাকলেও ভারতের আপত্তির কারণে পরবর্তী সময়ে এই উদ্যোগে ভাটা পড়ে।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক পানিসম্পদ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েনকে সাথে নিয়ে তিস্তা অববাহিকা পরিদর্শন করেন। পরবর্তীতে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাথে এক সাক্ষাৎকারে চীনের রাষ্ট্রদূত স্পষ্ট জানান যে, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে বেইজিং সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।
গত ১৯ জুন তিস্তা ব্রিজসংলগ্ন কাউনিয়া পয়েন্টে পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি ঘোষণা দেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বেই এবার তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হবে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, ১৯৭৮ সালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তিস্তা মহাপরিকল্পনার চিন্তা গ্রহণ করেছিলেন এবং ১৯৭৯ সালে তিস্তায় সর্বপ্রথম ব্যারেজ নির্মাণের উদ্যোগ নেন। মন্ত্রী জানান, বর্তমানে তিস্তায় ড্রেজিং, পানি সংরক্ষণ ও নদী ব্যবস্থাপনার কারিগরি সমীক্ষা চলছে এবং প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় গঠিত ৯ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি প্রকল্পের বিভিন্ন কারিগরি ও বাস্তবায়নযোগ্য দিক পর্যালোচনা করছে।
যদিও সম্প্রতি সরকারের পক্ষ থেকে নিজস্ব অর্থায়নে তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে, তবুও চীনের অর্থায়নের বিষয়টি এখনও আলোচনার টেবিলে রয়েছে। চীন-বাংলাদেশ বৈদেশিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ আব্দুর রহিম জানান, চীন অনেক আগেই নাব্যবিষয়ক স্টাডি সম্পন্ন করে অর্থায়নের ব্যাপক আগ্রহ দেখিয়েছে। তবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এখনও আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চলমান চীন সফরে বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য নিশ্চিত কোনো চুক্তির প্রস্তাব বা তাগিদ আসতে পারে। আব্দুর রহিম আরও বলেন, চিকেন নেকের কাছে চীন রাজনৈতিক প্রভাব বা ঘাঁটি গড়তে পারে—এমন নিরাপত্তা শঙ্কায় ভারত এই প্রকল্পের বিরোধিতা করছে, যা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির ক্ষেত্রেও বাধা হতে পারে।
এদিকে তিস্তা প্রকল্প সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে করার পক্ষে মত দিয়েছেন নদী বিশেষজ্ঞ ও গবেষক অধ্যাপক তুহিন ওয়াদুদ। তার মতে, ভারত বা চীনের নিজস্ব স্বার্থ থাকার কারণেই তাদের এত আগ্রহ। তাই এই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য তাদের দ্বারস্থ না হয়ে বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থায়নেই তা করা উচিত।
উল্লেখ্য, দীর্ঘ আলোচনার পর ২০১১ সালে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে তিস্তার পানি চুক্তির একটি খসড়া চূড়ান্ত হয়েছিল। সেই চুক্তি অনুযায়ী শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার পানির ৩৭.৫% বাংলাদেশ এবং ৪২.৫% ভারতের পাওয়ার কথা ছিল, আর বাকি ২০% নদীর স্বাভাবিক প্রবাহের জন্য রাখার সিদ্ধান্ত হয়। ২০১১ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরে এটি সই হওয়ার কথা থাকলেও পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকারের বিরোধিতায় তা আটকে যায়। পরবর্তীতে নরেন্দ্র মোদির সরকারও বারবার প্রতিশ্রুতি দিলেও তা বাস্তবায়ন করেনি। ফলশ্রুতিতে, শুষ্ক মৌসুমে পানি আটকে রাখায় তিস্তা মরুভূমিতে পরিণত হয়, আর বর্ষাকালে ভারতের অতিরিক্ত পানি ছাড়ার কারণে বাংলাদেশের দুই কূলের মানুষ বন্যা ও নদীভাঙনে মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয়।



























