গবেষণায় জালিয়াতি ও অসদুপায়
বৈশ্বিক জার্নালে বাংলাদেশি ৩২৫ গবেষণাপত্র প্রত্যাহার
০১ আগস্ট ২০২৬, ০১:০৯ পিএম
আন্তর্জাতিক একাডেমিক জগতে বাংলাদেশের নাম ও ভাবমূর্তি নিয়ে এক নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশ্বের সুপরিচিত জার্নাল বা সাময়িকীগুলো থেকে একের পর এক বাংলাদেশি গবেষকদের গবেষণাপত্র প্রত্যাহারের (রিট্রাকশন) ঘটনা উন্মোচিত হচ্ছে। মূলত ভুয়া বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন (পিয়ার রিভিউ), তথ্যের অসংগতি, তথ্য ও ফলাফল জালিয়াতি, একই তথ্যের বারবার পুনর্ব্যবহার, অপ্রাসঙ্গিক উদ্ধৃতি এবং সরাসরি চৌর্যবৃত্তির (প্লেজিয়ারিজম) অভিযোগে আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থাগুলো এসব কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে। গবেষণায় জালিয়াতি ও অসদুপায় অবলম্বনের এমন ঘটনা দেশের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা ব্যবস্থার প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং তদারকির অভাবকে স্পষ্ট করে তুলছে।
'প্রতিদিনের চিত্র'-এর অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০১৯ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সময়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জার্নাল থেকে বাংলাদেশি গবেষকদের সম্পৃক্ততা থাকা অন্তত ৩২৫টি গবেষণাপত্রের খোঁজ পাওয়া গেছে। বিশ্বজুড়ে প্রত্যাহার হওয়া গবেষণার সার্বিক হিসাব রাখা ওয়েবসাইট ‘রিট্রাকশন ওয়াচ’-এর সহায়তা এবং সরাসরি অনুসন্ধানের মাধ্যমে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। তবে গবেষকদের মতে, এই ৩২৫টিই শেষ কথা নয়; প্রকৃত সংখ্যাটি আরও বেশি হতে পারে। আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থা যেমন—এলসেভিয়ার, স্প্রিঞ্জার নেচার, উইলি, হিন্দাউই এবং আইইইইর মতো স্বনামধন্য সাময়িকীগুলোতেই এই রিট্রাকশনের ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটেছে।
সাধারণত বৈশ্বিক প্রকাশনা সংস্থাগুলো আন্তর্জাতিক নীতি প্রণয়নকারী সংস্থা 'কমিটি অন পাবলিকেশন এথিকস' (কোপ)-এর নির্দেশিকা অনুসরণ করে অভিযোগ তদন্ত করে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বাংলাদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গবেষণাপত্র প্রত্যাহার হয়েছে বেসরকারি ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (৪৪টি)। এর পরপরই রয়েছে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি (৪২টি), জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (৩২টি), ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনির্ভাসিটি (২১টি) এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (২০টি)। এ ছাড়া চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ১১টি করে এবং নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি ও বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটির ১০টি করে গবেষণাপত্র বাতিল হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক বিশ্লেষণে ব্যক্তি গবেষকদের অনিয়মের ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসিই বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান খানের ২৬টি গবেষণা প্রত্যাহার করেছে কয়েকটি আন্তর্জাতিক জার্নাল। ২০২১ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে সৌদি আরবের বিভিন্ন গবেষকদের সাথে সমন্বয়ে বিপুল সংখ্যক পেপার প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক তদন্তে জালিয়াতি ধরা পড়ে। একইভাবে ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের প্রভাষক মমিনুর রহমানের ৭টি, বিআইডিএসের গবেষক মুনতাসির মোরশেদের ৮টি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. মোস্তাফিজুর রহমানের ১০টি এবং ইউআইইউর অধ্যাপক মো. কামরুজ্জামানের ১১টি গবেষণা জালিয়াতির দায়ে বাতিল হয়েছে।
বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার মান নিয়ন্ত্রণ না করে কেবল প্রকাশনার সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে আর্থিক প্রণোদনা ও পদোন্নতি দেওয়ার নীতি এই জালিয়াতিকে আরও উসকে দিয়েছে। ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটিতে প্রতি গবেষণার জন্য ২০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত প্রণোদনা ও বেস্ট রিসার্চার অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হতো। অন্যদিকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্বপন চন্দ্র মজুমদার জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে পদোন্নতি বাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে। এমনকি অনেক গবেষক নৈতিকতার তোয়াক্কা না করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ‘অতিথি গবেষক’ সেজে বা জাস্ট ভালোবাসা থেকে প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে পেপার মিল চক্রের সাথে জড়িয়ে পড়েছেন।
গবেষণাপত্র প্রত্যাহারের এই মহামারি বাংলাদেশের সার্বিক শিক্ষা ও গবেষণা খাতের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিকে মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলছে। ঢাবির ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক কাজী মতিন উদ্দিন আহমেদ ‘প্রতিদিনের চিত্র’-কে জানান, প্রতিটি গবেষণাপত্র প্রত্যাহারের ঘটনা ফুটবল মাঠের একেকটি লাল কার্ডের মতো, যা নতুন সৎ গবেষকদের কাজের পথ কঠিন করে দেয়। এই পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ ‘প্রতিদিনের চিত্র’-কে জানিয়েছেন, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রথমত সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব; তারা ব্যর্থ হলে ইউজিসি নিজ থেকে তদন্ত করে সরাসরি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। আকস্মিক পদোন্নতি বা প্রণোদনা পাওয়ার লোভে এই জালিয়াতির লাগাম টানতে এখন কঠোর নীতি ও প্রয়োগ আবশ্যক হয়ে পড়েছে।
























