পরিবেশ বিপর্যয়ে মানবীয় সংঘর্ষ

অমৃত চিছাম

০৬ নভেম্বর ২০২৩, ০৮:১৮ পিএম


পরিবেশ বিপর্যয়ে মানবীয় সংঘর্ষ

ছবি- প্রতিদিনেরচিত্র বিডি।


বিশ্বে বর্তমানে যে কয়েকটি বিষয় বিশ্ববাসীর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে তার মধ্যে অন্যতম একটি হল পরিবেশ। বিশ্বের প্রায় প্রতিটি সম্মেলনে পরিবেশ বিষয়টি বর্তমানে আলোচনার শীর্ষে অবস্থান করছে। যা বর্তমানে সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। সাধারণ অর্থে আমাদের চারপাশে যা কিছু আছে তা নিয়েই গঠিত হয় পরিবেশ। যা পৃথিবীর মধ্যে অবস্থিত সকল প্রাণীকূলের জন্য কতটা প্রয়োজনীয় তা সহজেই অনুমেয়। কারণ পরিবেশের বিপর্যয় ঘটিয়ে মানবজাতির অস্তিত্ব কল্পনা করা আর বোকার স্বর্গে বাস করা প্রায় একই কথা। 

 

বিশ্ব পরিবেশ বর্তমানে কঠিন সময় অতিবাহিত করছে। এর অন্যতম একটি প্রধান কারণ হলো যুদ্ধ। যুদ্ধের কথা চিন্তা করলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে শুধু ধ্বংসের চিত্র, হউক সেটা স্থাপনা কিংবা পরিবেশ। যুদ্ধ প্রায় প্রাচীনকাল থেকেই নিজেদের আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে চলে আসছে বিশ্বব্যাপী, আজকের দিনেও তার কোন ব্যতিক্রম নই। কিন্তু সবকিছুর উর্ধ্বে যার উপর এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পরিলক্ষিত হচ্ছে তা হলো আমাদের পরিবেশ। মাত্র কয়েক মিনিটের যুদ্ধ ধবংস করে দিতে পারে কয়েক প্রজন্মের সভ্যতা ও একইসাথে এটি সর্বদাই পরিবেশ ধ্বংসের জন্য একটি কার্যকরী নিয়ামক। মানব সৃষ্টির পর থেকে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে যুদ্ধ বিগ্রহ সংঘটিত হয়ে আসছে এবং এর ধারাবাহিকতা এখনো বিদ্যমান। যুদ্ধের ভয়াবহ তান্ডবে প্রাণ হারায় লক্ষ লক্ষ মানুষ, বিধ্বস্ত হয় অসংখ্য নগর ও জনপদ এবং ধ্বংস হয় আমাদের চারপাশে অবস্থিত পরিবেশ- প্রতিবেশ। আদিম কালে যুদ্ধে অস্ত্রের ব্যবহার ছিল অতি নগন্য। কিন্তু দিন দিন যুদ্ধে অস্ত্র ব্যবহারের পরিমাণ এত বেড়েছে যে, বর্তমানে যুদ্ধ মানেই যেন অস্ত্র প্রদর্শনীর মহড়া। প্রাচীনকালে যুদ্ধাস্ত্র বলতে তলোয়ার, বর্শা, তীর-ধনুক, বল্লম, মিনজানিক (ঈধঃধঢ়ঁষঃ) ইত্যাদিকে বুঝানো হতো। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যুদ্ধাস্ত্রেও ডিজিটাল, লেজার গাইডেড ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। যার ধ্বংসলীলার প্রভাব ব্যাপক ও দীর্ঘস্থায়ী। আধুনিক সামরিক অভিযানে যেসব বোমা ও গোলা-বারুদ ব্যবহৃত হয় তা পরিবেশের উপর ধ্বংসাত্মক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে এবং মানবজাতির অস্তিত্ব সঙ্কটে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। 

 

১ম বিশ্বযুদ্ধে (১৯১৪-১৯১৮) ১,২৫,০০০ টন রাসায়নিক বোমা নিক্ষেপ করা হয় । ১ম বিশ্বযুদ্ধে ৯০ লাখ সেনা সদস্য ও ৭০ লাখ বেসামরিক নাগরিক মারা যায়। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাপানে পারমাণবিক বোমার বিষ্ফোরণ ঘটায়। এতে ১লাখ ৪০ হাজার মানুষ প্রাণ হারায়। পারমানবিক বোমাটি বিস্ফোরিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাপমাত্রা বেড়ে দাঁড়ায় ৫০ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস। মুহূর্তের মধ্যেই মানুষ, পশু-পাখি, জীব-জন্তু ও বন-বৃক্ষ পুড়ে ভস্ম হয়ে যায়, ৫১,৭৮৫টি ঘর-বাড়িতে আগুনের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়ে। যুদ্ধের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে,যুদ্ধে ব্যবহার করা পারমাণবিক বোমার ক্ষতিকর বিকিরণের ফলে চোখ, ত্বক আর ফুসফুসের ক্যান্সার নিয়ে বেঁচে আছে অসংখ্য নিরীহ মানুষ। পরবর্তীতে নাগাসাকি ও হিরোশিমায় জন্ম নেয়া প্রায় অধিকাংশই শিশুই ছিল বিকলাঙ্গ। বোমা হামলার প্রায় ৭৮ বছর পেরিয়ে গেলেও জাপানের আকাশে-বাতাসে এখনো পারমাণবিক তেজষ্ক্রিয়তার প্রভাব বিদ্যমান। আজও দেশে দেশে যুদ্ধাস্ত্রের বিভীষিকা মানুষকে তাড়া করে বেড়ায়। জাতিসংঘ সর্বপ্রথম যুদ্ধের ভয়াবহতা এর পরিবেশগত বিষয়গুলো বিবেচনায় আনে। তারা দেখিয়েছেন যে,যুদ্ধের ফলে কীভাবে দূষিত হয়েছে পানি সরবরাহ, সামরিক সুবিধার নামে কতশত ফসলি জমি পুড়িয়ে বা ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে, গাছপালা কেটে বনভূমি ধ্বংস করা হয়েছে, ফলে সৃিষ্ট হয়েছে ব্যাপক হারে মাটি দূষণ। যার ভয়াবহতা সরাসরি প্রভাব ফেলেছে নিরীহ জীবজন্তুর উপর। বিশ্বে অনুষ্ঠিত হওয়া যুদ্ধ গুলোর মধ্যে অন্যতম পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণ হিসাবে ধরা হয় ভিয়েতনামের যুদ্ধকে। উক্ত যুদ্ধের প্রভাবে প্রায় ৪.৯ মিলিয়ন হেক্টর বা ১৯,০০০ বর্গ মাইল বনভূমি ধ্বংস করা হয়,যা কিনা স্কটল্যান্ড এর সম্পূর্ণ আয়তনের দুই-তৃতীয়াংশের সমান বলে ধারণা করা হয়। এ যুদ্ধে মার্কিন সেনা বাহিনী ২ কোটি গ্যালন হারবিসাইডস স্প্রে করে বন-জঙ্গল পরিস্কার করার জন্য। বলে রাখা ভাল এই যে, ১৯ বছর ৫ মাসের যুদ্ধে ১৬ মিলিয়ন টন যুদ্ধ সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়, যার ফলে সে সময় প্রায় ৩০ মিলিয়নের বেশি খাদ সৃষ্টি করে। আর এই খাদগুলো তখন সেখানকার মাটির উপরের স্তর সরিয়ে ফেলে যার ফলে সেইসব স্থানের নিষ্কাশন ব্যবস্থা বিকল হয়ে যায় ও বদ্ধ পানিতে বিভিন্ন ধরনের রোগ বহনকারী ব্যাকটেরিয়া জন্মাতে থাকে। যা বন্যপ্রাণীদের অতুলনীয় ক্ষতি সাধন করে। যুদ্ধে শত্রুকে লক্ষ করে যে সব ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয় তাতে যে, শুধুমাত্র শত্রæই নিহত হয় তেমনতি নই, এছাড়াও লক্ষ লক্ষ নিরীহ বন্যপ্রাণীর জীবন নাশ হয়ে থাকে। মানবিক বিবেচনার কথা বাদ দিয়ে দূরে থাকা যায় কিন্তু পরিবেশগত বিপর্যয় এর দায় কী এড়ানো যায়। যুদ্ধের ভয়াবহতায় বহু প্রাণী ও উদ্ভিদের প্রজাতি ব্যাপক হারে হ্রাস পায়, কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রজাতি সমূহ চিরদিনের জন্য পৃথিবী থেকেই বিলুপ্ত হয়ে যায়। 

 

এছাড়াও বিশ্বে অনুষ্ঠিত যুদ্ধের ফলে সৃষ্টি হওয়া পরিবেশ বিপর্যয়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো, আফগানিস্তানে, যুগোশ্লোভিয়ায় এবং উপসাগরীয় যুদ্ধে গণবিধ্বংসী অস্ত্রের ব্যবহার পরিবেশের ওপর এক ভয়ানক ও সুদূরপ্রসারী ক্ষতচিহ্ন এঁকে দিয়েছিল। তাছাড়াও ১৯৯০-৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধকে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ সামুদ্রিক দূষণের উপলক্ষ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে, বিপুল পরিমাণ বোমাবর্ষণ করার ফলে মেসোপটেমিয়া অঞ্চলের প্রায় ১৫০০০ কিলোমিটার জলাভূমির জীববৈচিত্রকে নিশ্চিহ্ন হিসেবে ধারণা করা হয়েছে। সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের দেয়া তথ্যমতে, ২০০ কোটি মানুষ কেবলমাত্র নিরাপদ পানির অভাবে মৃত্যুর প্রহর গুনছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ক্রমাগত আফ্রিকা এবং আরবভূমিতে যুদ্ধের ফলে সেইসব অঞ্চলে সমস্ত উৎসের অতুলনীয় ক্ষতিসাধন হয়েছে, এর প্রভাবে বেড়েছে মাটি ও পানির দূষণ। বিশ্ব যুদ্ধের ভয়াবহতা কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই সারা বিশ্বব্যাপী আবারো রাশিয়া- ইউক্রেন যুদ্ধ পরিবেশের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে মাটি, বায়ু,ও পানির দূষণ। যার ভয়াবহ চিহ্নের দেখা মিলবে ইউক্রেন-পোল্যান্ড-হাঙ্গেরি-রোমানিয়া-বুলগেরিয়া-পর্তুগাল সহ নিকটবর্তী সোভিয়েত রাশিয়ার এক বড় অংশে। আরও উদ্বেগের বিষয় এই যে, পরবর্তীতে বিশ্ব পরিবেশ বিপর্যয়ের আরও  নতুন নতুন অনেক মাত্রা যোগ হতে থাকবে। পরিবেশ বিপর্যয়কে চূড়ান্ত মাত্রায় পৌঁছাতে নতুন করে যোগ হয়েছে ফিলিস্তিন-ইসরায়েল যুদ্ধ। পরিবেশে উক্ত যুদ্ধের ভয়াবহতা কিরূপ হতে পারে তা অতীতের সকল যুদ্ধের দিকে তাকালে অতি সহজে অনুমান করা যায়। পরমাণু বিদ্যৎকেন্দ্রে বিস্ফোরণ (১৯৮৬) গভীর ক্ষত রেখে গেছে পুরো চেরনোবিলের সমগ্র অঞ্চলেই। ইউক্রেনে বিভিন্ন অংশ জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এক ডজনের বেশি পরমাণবিক চুল্লির ওপর যদি বোমা বর্ষণ করা হয় তাহলে তেজস্ক্রিয় বিকিরণের লম্বা হাত কতদূর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে তা ভেবেই শিউরে উঠছেন বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানী ও পরিবেশবিদরা। রাশিয়া-ইউক্রেন চলমান যুদ্ধে ইউক্রেনে পেট্রোলিয়াম কারখানায় বোমা হামলায় বায়ু দূষণের মাত্রা নিঃসন্দেহে কয়েকগুন বাড়িয়ে দেবে এবং তা কি পরিমাণ ধ্বংসাতœক হতে পারে তা আমাদের সবার কল্পনাতীত। বলে রাখা ভাল এই যে, শিল্প-সমৃদ্ধ ইউক্রেনের প্রাকৃতিক পরিবেশ যুদ্ধের আগে থেকেই বিপর্যস্ত কারখানা-নিষ্কৃত দূষণ সংগঠিত হওয়ার ফলে। এক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখ্য, ডনবাস শহর সবচেয়ে দূষণযুক্ত অঞ্চল হিসেবে আগে থেকেই সুনাম অর্জন করেছে তার কয়লাখনি, ধাতু-শিল্পের কারখানা ও কয়েকশ রাসায়নিক কারখানার জন্য।  শিল্পোন্নত শহরে বোমা-গ্রানাইড-মিসাইল বর্ষণ মানে কি পরিমাণ দূষণ ও ভয়াবহ হতে পারে তা খুব সহজে অনুমেয়। যদি একটু কল্পনা করার চেষ্টা করি, পেট্রোলিয়ামপূর্ণ কারখানা বা অন্যান্য দাহ্যবস্তুতে পূর্ণ কারখানায় একটি বোমা ফেলা হয় তাহলে সেখানে পরিবেশের তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘস্থায়ী কি পরিমাণ ক্ষতি হতে পারে একবার চিন্তা করলেই ঘাঁ শিউরে ওঠার উপক্রম। আর এই ঘটনা যদি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে ঘটে তাহলে তা বিস্ফোরণে উড়ে গিয়ে বাঁধের নিম্নঅববাহিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল ভেসে যাবে এর ফলে দেখা দিবে প্রবল বন্যা। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর মত অনুযায়ী যুদ্ধেরও একটি নীতি রয়েছে। আর তা হল এই যে,রণক্ষেত্রে প্রতিক্ষের অশীতিপর বৃদ্ধ, নারী, শিশু ও ধর্মীয় উপসনালয়ে অবস্থানরত পুরোহিতদের হত্যা করা যাবে না। অকারণে বৃক্ষ নিধন করা যাবে না। ক্ষেতের ফসল নষ্ট করা যাবে না। যে কোন ধরনের স্থাপনা ধ্বংস করা যাবে না। সর্বোপরি তিনি পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রধান নিয়ামক গুলোর ওপরই জোর দিয়েছেন। পৃথিবীর সকল শান্তিকামী মানুষ যুদ্ধ পরিহার করে শান্তির পথে পথ চলুক এতাই সবার প্রত্যাশা। অন্যথায় পৃথিবী নামক এ গ্রহে মনুষ্য জাতির অস্তিত্ব সঙ্কট হয়ে পড়বে। 

 

শিক্ষার্থী, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়
ত্রিশাল, ময়মনসিংহ
 

Ads