জুলাই গণঅভ্যুত্থান
নিউটনের আপেল ছিল না, পাকাতে হয়েছে’: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ
০৮ আগস্ট ২০২৬, ০৩:৪৬ পিএম
জুলাই গণঅভ্যুত্থান কোনো হঠাৎ ঘটে যাওয়া বা আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং বিগত ১৭ বছরের দীর্ঘ ও ধারাবাহিক রাজনৈতিক সংগ্রামের চূড়ান্ত ফসল বলে মন্তব্য করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি রূপক অর্থে উল্লেখ করেন যে, এই গণঅভ্যুত্থান কোনো ‘নিউটনের আপেল’ ছিল না যা নিজে থেকেই ঝরে পড়েছে; বরং দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে একে পরিপক্ব করতে হয়েছে। সরকারের পতন কোনো স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়ায় হয়নি, বরং জনগণের অদম্য ত্যাগের মাধ্যমেই তা অর্জিত হয়েছে।
গত শনিবার (৮ আগস্ট) রাজধানী ঢাকার ঐতিহাসিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে আয়োজিত এক বিশেষ আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থান ২০২৪-এর দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে এবং তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকার পতনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সাহসী ভূমিকা স্মরণ করে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয়তাবাদী শিক্ষকদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন 'সাদা দল' এবং বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের সংগঠন 'ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ' (ইউট্যাব) যৌথভাবে এই আলোচনা সভার আয়োজন করে।
আলোচনা সভায় বক্তব্য প্রদানকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও ইতিহাসের সত্যতাকে উপলব্ধি করার ওপর জোর দেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, কেবল ৩৬ দিনের সাম্প্রতিক উত্তাল আন্দোলনকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে চলবে না; এর পেছনে যে ১৭ বছরের দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী ও ধারাবাহিক সংগ্রামের ইতিহাস রয়েছে, তা অস্বীকার করা রাজনৈতিক অপরিপক্বতার শামিল। দীর্ঘদিনের এই ধারাবাহিক লড়াইয়ের ফলেই জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সূচনা হয়েছিল।
নতুন রাজনৈতিক ধারা ও উদীয়মান শক্তির প্রতি ইঙ্গিত করে সালাহউদ্দিন আহমদ বাস্তবসম্মত রাজনীতির চর্চা করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, অনেকে নতুন বন্দোবস্ত ও নতুন রাজনীতির স্বপ্ন দেখলেও বাস্তবে তারা পুরোনো পথেই হাঁটছেন। রাজনীতির পথ অত্যন্ত কঠিন, বন্ধুর ও কণ্টকাকীর্ণ—যা কেবল আবেগে বা মুখে বলে অতিক্রম করা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, বাংলাদেশে ‘চেতনা বিক্রির রাজনীতি’র দিন চিরতরে শেষ হয়ে গেছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ত্যাগের কৃতিত্ব এককভাবে ছিনিয়ে নিয়ে তা থেকে কোনো নতুন রাজনৈতিক ফায়দা লোটার চেষ্টা সফল হবে না।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও মনে করিয়ে দেন যে, বিগত দিনের স্বৈরাচারবিরোধী এই দীর্ঘ পথচলায় বহু রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তি প্রকাশ্যে কিংবা আড়ালে থেকে গণতান্ত্রিক লড়াই টিকিয়ে রেখেছেন। তিনি জাতীয় সংসদ ও রাজপথে গণতান্ত্রিক চর্চা অব্যাহত রাখার তাগিদ দিয়ে বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ কোনো পদক্ষেপে যেন এমন ফাঁক না থাকে, যা ফ্যাসিবাদের পুনরায় ফেরার পথ সুগম করে দেয়। শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, ৭১-এর চেতনা বিক্রির রাজনীতি চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়েছে এবং অতিরিক্ত চেতনার রাজনীতি করতে করতেই আজ শেখ হাসিনাকে দিল্লিতে আশ্রয় নিতে হয়েছে।
একই সভায় ঢাবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. এবিএম ওবায়দুল ইসলাম বিগত সরকারের সমর্থনে শিক্ষকদের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি তথ্য প্রকাশ করে জানান, দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৪০৪ জন শিক্ষক এখনও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার দাবিতে তৎপরতা চালিয়েছেন। তিনি নিশ্চিত করেন যে, এই শিক্ষকদের ওপর কড়া নজরদারি রাখা হয়েছে এবং তাদের রাষ্ট্রদ্রোহী ও অন্যায্য কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। উপাচার্য স্পষ্ট করেন, এটি কোনো রাজনৈতিক প্রতিহিংসা নয়, বরং ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার তাগিদেই এ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
বিগত স্বৈরাচারী শাসনামলে বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তচিন্তার ওপর যে নির্মম দমনপীড়ন চালানো হয়েছিল, সে কথা স্মরণ করে ঢাবি উপাচার্য বলেন, একসময় সাদা দলের মতো মুক্তমনাদের সাধারণ সভাতেও গোয়েন্দা ও আওয়ামীপন্থি শিক্ষকদের কড়া নজরদারি ছিল। শিক্ষকরা স্বাধীনভাবে তাদের মতামত ব্যক্ত করতে পারতেন না এবং প্রতিনিয়ত নির্যাতনের শিকার হতেন। তবে সেই দুঃসময়েও শিক্ষক সমাজ কেবল শিক্ষা ও গবেষণায় সীমাবদ্ধ না থেকে দেশের সংকটকালে বীরদর্পে রাজপথে নেমে এসেছিলেন।
পরিশেষে, দিনব্যাপী আয়োজিত এই তাৎপর্যপূর্ণ আলোচনা সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবীণ ও নবীন শিক্ষকবৃন্দ এবং বিশিষ্ট নাগরিকরা উপস্থিত থেকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের অবদানকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন। সভা থেকে গণতান্ত্রিক পরিবেশ টিকিয়ে রাখা, শিক্ষাঙ্গনে স্বৈরাচারের অবশিষ্টাংশ নির্মূল করা এবং নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে শিক্ষকদের রূপরেখা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।

























