যানজট এর কারন ও নিরসনে পদক্ষেপ

মো: এনামুল হক

০৭ জুলাই ২০২৪, ১১:১১ এএম


যানজট এর কারন ও নিরসনে পদক্ষেপ

মো: এনামুল হক।

 

রাজধানী ঢাকায় যানজট সমস্যা প্রতিদিন তীব্র হচ্ছে। দেশের অগ্রগতিকে থামিয়ে দিচ্ছে ভয়ংকর এই যানজট। যানজটের কারনে যে সময়ের অপচয় হচ্ছে, অর্থনীতির ক্ষেত্রে তার ক্ষয়ক্ষতি ভয়াবহ। এই সমস্যা কর্মজীবি মানুষের কর্মঘন্টার ক্ষতির মাধ্যমে উৎপাদনশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্থ করছে। যে সব কারনে বাংলাদেশে বিদেশী বিনিয়োগ বিঘ্নিত হচ্ছে, তার মধ্যে যানজট একটি এবং অন্যতম। প্রায় সোয়া কোটি জনসংখ্যা অধ্যুষিত ৩০০ কিলোমিটার আয়তনের ঢাকা মহানগরী ইতোমধ্যে বিশ্বের অন্যতম মেগাসিটি এবং বায়ুদুষনকারী হিসেবে আত্বপ্রকাশ করেছে। যানজটসহ নানা সমস্যায় ঢাকা মহানগরী বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় সমস্যাবহুল নগরী হিসেবে চিহিৃত হয়েছে। ঢাকায় একই রাস্তায় ধীরগতি সম্পন্ন এবং দ্রুতগতি সম্পন্ন উভয় যানই চলাচল করে, অর্থাৎ  রিকশা, ঠেলাগাড়ি, টমটম গাড়ি, ভ্যান, ব্যাটারি রিকসা ইত্যাদি। পৃথিবীর কোথাও এই ব্যবস্থ নাই।  এই সকল কারনে সৃষ্ট ভয়াবহ যানজট নগরবাসীর নিত্যসঙ্গী। 

সর্বনাশা যানজট দেড় কোটির বেশি মানুষের এই নগরীকে অচল বা বসবাস অযোগ্য নগরীতে পরিণত করেছে। ঢাকার মোট রাস্তার পরিমান আয়তনের তুলনায় মাত্র ৮ শতাংশ। অথচ একটি শহরের রাস্তার পরিমান হওয়া উচিত ২৫ শতাংশ। যানজট জাতীয় অগ্রগতির পথে প্রতিবন্ধক হয়ে দাড়িয়েছে। উৎপাদনের জন্য যে সময় আমাদের ব্যয় হওয়ার কথা অথচ সেই সময় নষ্ট করছে এই যানজট। বুয়েটের বেশ কয়েকজন অধ্যাপকের এবং বিশ্বব্যাংকের গবেষণায় দেখা গেছে, গাড়ির সংখ্যা দিনদিন বৃদ্বি পাওয়ায় যানজটের কারনে রাজধানীর গাড়ির গড় গতি গত ১২ বছরে ২১ কিলোমিটার থেকে নেমে এসেছে ৫ কিলোমিটারে। যেন হেঁটে চলার মতো অবস্থা। অতিরিক্ত গাড়ির চাপে রাজধানীর ট্রাফিক ব্যবস্তাই অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ঢাকার বিভিন্ন জায়গার যানজট নিরসনে ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরাই ঘেমে অস্থির। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান মতে, বাংলাদেশে ২০১০ সাল পর্যন্ত নিবন্ধিত গাড়ির সংখ্যা ১৪ লক্ষ ২৭ হাজার ৩৬৮টি, ২০১১ সালে নিবন্ধিত গাড়ির সংখ্যা ১ লক্ষ ৮৮ হাজার ৩৬টি, ২০১২ সালে নিবন্ধিত গাড়ির সংখ্যা ১ লক্ষ ৬১ হাজার ৭৬১টি, ২০১৩ সালে নিবন্ধিত গাড়ির সংখ্যা ১ লক্ষ ৩৬ হাজার ২১৩টি, ২০১৪ সালে নিবন্ধিত গাড়ির সংখ্যা ১ লক্ষ ৫৯ হাজার ৯৮৮টি, ২০১৫ সালে নিবন্ধিত গাড়ির সংখ্যা ৩ লক্ষ ৭ হাজার ৯৪১টি, ২০১৬ সালে নিবন্ধিত গাড়ির সংখ্যা ৩ লক্ষ ৯৭ হাজার ৯৬৪টি, ২০১৭ সালে নিবন্ধিত গাড়ির সংখ্যা ৪ লক্ষ ১৯ হাজার ৩৩৩টি, ২০১৮ সালে নিবন্ধিত গাড়ির সংখ্যা ৪ লক্ষ ৯৫ হাজার ১৮২টি, ২০১৯সালে নিবন্ধিত গাড়ির সংখ্যা ৪ লক্ষ ৯৭ হাজার ৪৩২টি, ২০২০ সালে নিবন্ধিত গাড়ির সংখ্যা ৩ লক্ষ ৭৭ হাজার ৬৬০টি, ২০২১ সালে নিবন্ধিত গাড়ির সংখ্যা ৪ লক্ষ ৪৫ হাজার ৩০টি, ২০২২ সালে নিবন্ধিত গাড়ির সংখ্যা ৫ লক্ষ ৭৮ হাজার ১৫১টি, ২০২৩ সালে নিবন্ধিত গাড়ির সংখ্যা ৩ লক্ষ ৬০ হাজার ৮৬১টি, জুন-২০২৪ পর্যন্ত নিবন্ধিত গাড়ির সংখ্যা ১ লক্ষ ৬০ হাজার ৫৩৩টি। বর্তমানে বাংলাদেশে নিবন্ধিত গাড়ি রয়েছে ৬১ লাখ ১৩ হাজার ৪৫৩টি।  ঢাকা সবচেয়ে বেশি গাড়ির নিবন্ধন হয়েছে ২০১৮ সালে। দৈনিক গড়ে ৪৬৯টি। গত বছরের হিসাবে রাজধানীতে প্রতিদিন ৩৭১টি নতুন গাড়ি নেমেছে। বর্তমানে তা আরও বেড়েছে। বিআরটিএ পরিসংখ্যান মতে ২০১২ ও ২০১৩ সাল ছাড়া প্রতিবছরই বেড়েছে গাড়ির নিবন্ধন। রাজধানীতে ২০১০ সাল পর্যন্ত নিবন্ধিত গাড়ি ৫ লাখ ৯৩ হজার ৭৭টি। পরে ২০১১ সালে নিবন্ধন হয়েছে ৭২ হাজার ৯৪৭টি গাড়ি। ২০১২ সালে ৫৯ হাজার ৫৭৩টি, ২০১৩ সালে ৫৪ হাজার ৪৯২টি, ২০১৪ সালে ৭৩ হাজার ৫১টি, ২০১৫ সালে ৯৫ হাজার ৭৪৩টিটি, ২০১৬ সালে ১ লাখ ১০ হাজার ৫২০টি, ২০১৭ সালে ১ লাখ ৩৯ হাজার ৭৪৮টি এবং ২০১৮ সালে ১ লাখ ৭১ হাজার ৩৪৯টি গাড়ির নিবন্ধন হয়। বর্তমানে রাজধানীতে নিবন্ধিত গাড়ি রয়েছে ১৩ লাখ ৭০ হাজার ৫০০টি। গত ৮ বছরে রাজধানীতে গাড়ি  নিবন্ধন বেড়ে প্রায় দ্বিগুন হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানদন্ড অনুযায়ী রাজধানীতে ২ লাখ ১৬ হাজার গাড়ি চলাচল করার কথা অথচ সেখানে নিবন্ধন রয়েছে সাতগুন বেশি গাড়ি। 

রাজধানীর যানজট কমাতে সরকারের পক্ষ থেকে যেসব উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে, কোনোটাই কাজে লাগছে না। যানজট নিরসনে প্রয়োজন বাস্তবসম্মত সমন্বিত পদক্ষেপ। বিচ্ছিন্নভাবে একক পদক্ষেপ নিয়ে এই সর্বগ্রাসী সমস্যার সমাধান পুরোপুরি সম্ভব নয়। রাজধানীর ২১০০ কিলোমিটার রাস্তার মধ্যে মোটরযান চলোচল করে মাত্র ২৮০ কিলোমিটার রাস্তায়। এর একটি বড় অংশ হকার এবং অবৈধ পাকিংয়ের কারনে ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়েছে।  বেসরকারী একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষনার প্রতিবেদনে দেখা যায়, ঢাকার যানজটের কারনে প্রতিমাসে আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে ২২৭ কোটি টাকা। ঢাকার ভয়াবহ যানজট ব্যয়বহুল কোনো প্রকল্প ছাড়াই কামিয় আনা সম্ভব বলেও উল্লেখ করা হয়েছে এই প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে ঢাকার যানজটের জন্য বিশেষত তিনটি কারন চিহিৃত করেছেন। সেগুলো হলো-(১). যত্রতত্র গাড়ি পাকিং করা (২). প্রাইভেটকার দিয়ে সড়কের জায়গা দখল (৩). ট্রাফিক আইন লঙ্গন। প্রতিবেদন অনুযায়ী ঢাকার ৯৮ দশমিক ৩ ভাগ গণ পরিবহণ এবং ৬৮ ভাগ প্রাইভেটকার ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করেন।  

ঢাকার যানজট নিরসনে কিছু পরামর্শ বা ব্যক্তিগত সুপারিশ-
(১). যথাযথ নগর পরিকল্পনা ব্যবস্থার মাধ্যমে রাজউক, ডেসা, ডেসকো, ওয়াসা ইত্যাদির রাস্তা খনন কাজগুলি যথাযথ সমন্বয় করা দরকার। অলাদাভাবে বিভিন্ন বিভাগ গড়ে উঠায় এবং সমন্বয়হীনভাবে রাস্তাগাটের উন্নয়ন ও মেরামত কাজ করায় সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে।
(২). ঢাকার প্রতি একরে প্রায় ৫০০জন লোক বাস করে। নিউইয়র্কে যেখানে ২৫-৩০ জন বসবাস করেন। ঢাকার জনসংখ্যার ঘনত্ব কমিয়ে আনা দরকার।
(৩). ঢাকা শহর পুরোপুরি অর্থনীতি নির্ভর শহর হয়ে গেছে। রাজধানীতে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ আসে বিভিন্ন কাজের খোজে এবং বিভিন্ন প্রয়োজনে।  উক্ত সমস্যা নিরসনে প্রশাসনিক  বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। 
(৪). যে শহরে লোকসংখ্যা বেশি, সেখানে তিন ধরনের পরিবহন ব্যবস্থা দরকার-(১). সারফেস (২). এলিভেটর (৩). আন্ডারগ্রাউন্ড। আমাদের দেশে শুধু সারফেস ও কিছু নিদিৃষ্ট এলাকায় আসার জন্য এলিভেটর ও মেট্রোরেল স্থাপিত হয়েছে। যানজট নিরসনে পাতাল রেলের কথাও ভাবতে হবে। তবে সবকিছু করতে হবে দীর্ঘ মেয়াদী চিন্তা ভবনা ও যথাযথ সম্ভাব্যতা যাচাই করে। 
(৫). মুল সড়ক থেকে রিকসা, ভ্য্যন সম্পূর্ণ তুলে দিতে হবে। ট্রাক ও ঠেলাগাড়ি কেবল রাত ১০টা হতে ভোর ৫টা পর্যন্ত চলাচলের অনুমতি দিতে হবে (সরকার কর্তৃক বাস্তবায়িত হয়েছে)। 
(৬). বর্ধিত ঢাকার সঙ্গে মুল ঢাকার চলাচলের জন্য অধিক সংখ্যক বাইপাস সড়ক নির্মাণ করতে হবে। 
(৭). রাস্তাগুলো সম্পূর্ণ দখলমুক্ত করতে হবে। ঢাকার রাজপথ অপদখল পুরোপুরি বন্ধ করতে হবে। রাজধানীর সকল রাজপথ দখলমুক্ত হলে যানজট সহনীয় মাত্রায় আসবে। সরকার, রাষ্টযন্ত্র, বিরোধীদল, নগর পরিকল্পনাবিদ, পরিবেশবিদ সবাই একসঙ্গে বসে সিদ্বান্ত নিতে হবে। 
(৮). যানজট নিরসনে রাজধানীর রাস্তাগুলো প্রশস্তকরণ, ব্যপক হারে ফ্লাইওভার নির্মাণ, রাজপথ থেকে হকার উচ্ছেদ এবং অবৈধ পার্কিংয়ের অবসান ঘটাতে হবে। ট্রাফিক আইন মেনে চলার ক্ষেত্রে কঠিন সিদ্বান্ত আরোপ করতে হবে। 
(৯). বাংলাদেশের পার্কিং ব্যবস্থার উন্নতি করতে হবে। মুল সড়কের পাশে প্রতিটি ভবন, মার্কেট, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সহ সকল স্থাপনার বেজমেন্ট এবং গ্রাউন্ডফ্লোর কার পার্কিং এর সুবিধায় আনতে হবে।  
(১০). মেইন রোডে গাড়ি থামিয়ে কাগজপত্র চেক করা যাবেনা। প্রয়োজনে রাস্তার পার্শ্বে ফাকা জায়গায় গাড়ি থামিয়ে কাগজপত্র চেক করা যেতে পারে। 
(১১). ঢাকা শহরের সকল বাস সার্ভিসগুলি সরকারের সুবিধা অনুযায়ী লিমিটেড কোম্পানির আওতায় এনে পরিচালনা করতে হবে। ড্রাইভার এবং হেলপার বেতনভুক্ত হতে হবে।

 

সহকারী প্রকৌশলী (ই/এম)
গণপূর্ত ই/এম সার্কেল-১,
গণপূর্ত অধিদপ্তর, ঢাকা ।                                                                                                  

 

লেখাটি লেখকের সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত মতামত।

 

Ads