ঋণের পাহাড়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি: সুদ পরিশোধই কি রাষ্ট্রের বড় বোঝা হয়ে উঠছে?
১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:২২ এএম
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়গুলোর একটি হলো সরকারের ঋণের দ্রুত বিস্তার। উন্নয়ন অর্থনীতিতে ঋণ নিজে কোনো সমস্যা নয়; বরং উৎপাদনশীল বিনিয়োগ, অবকাঠামো, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য সঠিকভাবে ব্যবহৃত ঋণ ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির ভিত্তি তৈরি করতে পারে। কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় তখনই, যখন পুরোনো ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধ করতে নতুন ঋণ নিতে হয় এবং সরকারের রাজস্ব আয় সেই ঋণের বোঝা বহনের জন্য যথেষ্ট না থাকে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এখন সেই ঝুঁকিই ক্রমশ দৃশ্যমান হচ্ছে।
সর্বশেষ ২০২৫–২৬ অর্থবছর শেষে সরকারের পুঞ্জীভূত অভ্যন্তরীণ ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১১ লাখ ৫৩ হাজার ৬৩৫ কোটি টাকা। এটিই প্রথমবারের মতো সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণ সাড়ে ১১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এক বছরে অভ্যন্তরীণ ঋণ বেড়েছে প্রায় ১ লাখ ৩২ হাজার কোটি টাকা। ২০২৪–২৫ অর্থবছরের শেষে যেখানে অভ্যন্তরীণ ঋণের স্থিতি ছিল প্রায় ১০ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা, মাত্র এক বছরের ব্যবধানে তা নতুন রেকর্ডে পৌঁছেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে ব্যাংকব্যবস্থা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য অভ্যন্তরীণ উৎস মিলিয়ে সরকার নিট ১ লাখ ৩১ হাজার ৯০৪ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। অথচ বাজেটে অভ্যন্তরীণ ঋণ গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও ৬ হাজার ৯০৪ কোটি টাকা বেশি ঋণ নিতে হয়েছে সরকারকে। এই অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ নিছক একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি সরকারের রাজস্ব ও ব্যয় ব্যবস্থাপনার ওপর বাড়তে থাকা চাপেরই প্রতিফলন।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অভ্যন্তরীণ ঋণের প্রধান উৎস হয়ে উঠেছে ব্যাংক খাত। গত অর্থবছরে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকার নিট ১ লাখ ৩১ হাজার ৭১৩ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। আগের অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ৭৭ হাজার ১০৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাত্র এক বছরে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে সরকারের নিট ঋণ বেড়েছে ৫৪ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা। অথচ বাজেটে ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ছিল ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা।
এর অর্থ দাঁড়ায়, সরকারের অভ্যন্তরীণ ঋণ সংগ্রহের ক্ষেত্রে ব্যাংক এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়স্থল। ট্রেজারি বিল ও সরকারি বন্ডের মাধ্যমে ব্যাংকগুলো থেকে এই অর্থ নেওয়া হচ্ছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—সরকার যখন ব্যাংক খাত থেকে এত বড় অঙ্কের অর্থ টেনে নিচ্ছে, তখন বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের সুযোগ কতটা থাকছে?
বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে হলে উদ্যোক্তাদের ঋণ প্রয়োজন। শিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা, রপ্তানি, প্রযুক্তি ও নতুন উদ্যোগে অর্থায়ন বাড়াতে না পারলে প্রবৃদ্ধির গতি ফিরে আসবে না। কিন্তু ব্যাংকের সীমিত তহবিলের বড় অংশ যদি সরকারই শুষে নেয়, তাহলে বেসরকারি খাতের জন্য অর্থায়নের জায়গা সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এতে একদিকে সরকারের ঋণ বাড়ে, অন্যদিকে বিনিয়োগ দুর্বল থাকার ঝুঁকি তৈরি হয়।
অভ্যন্তরীণ ঋণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস ছিল ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও সঞ্চয়পত্র। কিন্তু এই খাতগুলোও এখন আগের মতো সক্ষম নয়। গত অর্থবছরে ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাত থেকে সরকারের নিট ঋণ ছিল মাত্র ১৯২ কোটি টাকা, যেখানে আগের অর্থবছরে এ খাত থেকে সরকার ৪২ হাজার ২৫৯ কোটি টাকা নিট ঋণ নিয়েছিল। বাজেটে এ খাত থেকে ২১ হাজার কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্য থাকলেও বাস্তবে তা অর্জিত হয়নি।
এর পেছনে রয়েছে আর্থিক খাতের দীর্ঘদিনের দুর্বলতা। অনিয়ম, দুর্নীতি, খেলাপি ঋণ ও তারল্যসংকটে দেশের অনেক ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান কার্যত দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে সরকার চাইলেও সেখান থেকে আগের মতো ঋণ নিতে পারছে না। অন্যদিকে সঞ্চয়পত্রের মুনাফা কাঠামো ও মানুষের বিনিয়োগ আচরণে পরিবর্তনের কারণে এ খাত থেকেও সরকারের কাঙ্ক্ষিত অর্থ সংগ্রহ কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে শেষ পর্যন্ত ব্যাংক খাতের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।
এদিকে অভ্যন্তরীণ ঋণের পাশাপাশি সরকারের বৈদেশিক ঋণের চাপও কম নয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের মার্চ ২০২৬-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ছিল ১১০.৯৩ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে সরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণ প্রায় ৯০.৯১ বিলিয়ন ডলার। ডলারের বিনিময়মূল্য ১২৫ টাকা ধরে সরকারি বৈদেশিক ঋণকে টাকায় হিসাব করলে এর পরিমাণ দাঁড়ায় ১১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি।
অর্থাৎ শুধু মার্চ পর্যন্ত হিসাব বিবেচনা করলেও সরকারের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের সম্মিলিত বোঝা ২২ লাখ কোটি টাকার বেশি। জুনের বৈদেশিক ঋণের পূর্ণাঙ্গ সরকারি হিসাব প্রকাশিত হলে প্রকৃত চিত্র আরও পরিষ্কার হবে। এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—দেশের মোট বৈদেশিক ঋণ এবং সরকারের বৈদেশিক ঋণ এক বিষয় নয়। তাই দুই ধরনের ঋণের হিসাব আলাদা করে দেখা দরকার। কিন্তু উভয় ক্ষেত্রেই মূল উদ্বেগ হলো ঋণের সেবা ব্যয় ক্রমশ বাড়ছে।
চলতি ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে ঋণের সুদ পরিশোধের জন্য ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। অর্থাৎ সরকারের ব্যয়ের একটি বিশাল অংশ এমন একটি খাতে যাচ্ছে, যা সরাসরি নতুন অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য কিংবা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে না। ঋণের অর্থ যদি উৎপাদনশীল সম্পদ তৈরি করে, তাহলে ভবিষ্যতের আয় দিয়ে সেই ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা তৈরি হয়। কিন্তু ঋণ যদি রাজস্ব ঘাটতি, পরিচালন ব্যয় কিংবা আগের ঋণের দায় মেটাতে ব্যবহৃত হয়, তাহলে পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে ওঠে।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমানের সতর্কতা তাই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তাঁর মতে, দেশি-বিদেশি ঋণের বোঝা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সুদ পরিশোধের চাপও বাড়ছে এবং এমন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে যেখানে ঋণ পরিশোধের জন্য নতুন ঋণ করতে হচ্ছে। বড় কিছু বৈদেশিক ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হয়ে যাওয়ায় ভবিষ্যতে এই চাপ আরও বাড়তে পারে।
এখানেই বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—আমরা কি ঋণ নিয়ে সম্পদ তৈরি করছি, নাকি ঋণ নিয়ে ঋণের বোঝা সামলাচ্ছি?
সরকারের ঋণ নেওয়ার প্রয়োজন অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু ঋণের গুণগত ব্যবহার নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এমন প্রকল্পে ঋণ নিতে হবে যেখান থেকে ভবিষ্যতে রাজস্ব, রপ্তানি, উৎপাদন, কর্মসংস্থান কিংবা বৈদেশিক মুদ্রা আয় বাড়বে। একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় বৃদ্ধি, সময়ক্ষেপণ, দুর্নীতি ও অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পের লাগাম টানতে হবে।
এর পাশাপাশি সবচেয়ে জরুরি হলো রাজস্ব আয় বাড়ানো। বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনও অত্যন্ত নিম্ন। অর্থনীতির আকার বাড়লেও রাজস্ব আহরণ সেই অনুপাতে না বাড়লে সরকারের ব্যয়ের অর্থ জোগাতে ক্রমাগত ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়বে। তাই কর প্রশাসনের সংস্কার, করের আওতা সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি বন্ধ এবং ডিজিটাল কর ব্যবস্থাপনা এখন আর ঐচ্ছিক বিষয় নয়।
ব্যাংক খাতের ক্ষেত্রেও সরকারকে সতর্ক হতে হবে। একদিকে খেলাপি ঋণ ও দুর্বল ব্যাংকের সমস্যা সমাধান করতে হবে, অন্যদিকে ব্যাংক থেকে সরকারের অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণের ফলে যেন বেসরকারি বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি ঋণ গ্রহণের একটি স্বচ্ছ ও মধ্যমেয়াদি সীমা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
সবচেয়ে বড় কথা, ঋণ ব্যবস্থাপনায় এখন স্বল্পমেয়াদি বাজেট ভারসাম্যের বদলে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ-স্থিতিশীলতা বিবেচনায় নিতে হবে। সরকারের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ, সুদ পরিশোধ, ঋণের মেয়াদ, বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি এবং রাজস্ব আয়ের সক্ষমতা—সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনা করে একটি সমন্বিত Debt Management Strategy প্রয়োজন।
ঋণ কোনো অভিশাপ নয়। কিন্তু উৎপাদনশীলতা ও রাজস্ব সক্ষমতা না বাড়িয়ে ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ানো হলে সেটিই অর্থনীতির জন্য ফাঁদে পরিণত হয়। বাংলাদেশের সামনে এখন সেই ফাঁদ এড়ানোর সময়। আজকের ঋণ যদি আগামী দিনের উৎপাদন ও আয় বাড়ায়, তবে সেটি বিনিয়োগ। কিন্তু আজকের ঋণ যদি আগামী দিনের ঋণের সুদ পরিশোধেই ব্যয় হয়, তবে সেটি বোঝা।
সাড়ে ১১ লাখ কোটি টাকার অভ্যন্তরীণ ঋণ এবং তার সঙ্গে বিপুল বৈদেশিক দায় তাই কেবল হিসাবের খাতা নয়—এটি ভবিষ্যৎ অর্থনীতির জন্য একটি সতর্কবার্তা। এখনই ব্যয়সংযম, রাজস্ব সংস্কার, ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলা, প্রকল্পের মানোন্নয়ন এবং উৎপাদনশীল বিনিয়োগ নিশ্চিত করা না গেলে ঋণের পাহাড় একসময় উন্নয়নের অর্থকেই গ্রাস করতে পারে। বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা এখন ঋণ নেওয়া নয়; বরং ঋণকে কীভাবে সম্পদে রূপান্তর করা যায়, সেই সক্ষমতা অর্জন।
লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক।
E-mail: msislam.sumon@gmail.com
































