আইন প্রয়োগের পাশাপাশি আমাদের সচেতন হওয়া দরকার

প্রতিদিনেরচিত্র ডেস্ক

০৫ আগস্ট ২০১৮, ০৭:৫৭ পিএম


আইন প্রয়োগের পাশাপাশি আমাদের সচেতন হওয়া দরকার

‘নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনটি কোনো রাজনৈতিক ইস্যু নয়। এটি একটি সামাজিক আন্দোলন। দল, মত, নির্বিশেষে এ আন্দোলনকে বাস্তবায়ন করার অধিকার সকলেই রাখে। সকলেরই নিরাপত্তা লাভের অধিকার আছে। তাই দেশের আপামর জনগণ চায় নিরাপদে পথ চলতে, নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাতে। অনিরাপদ সড়কের কোণঠাসায় পড়ে স্বজন হারাতে কেউ চায় না। কেউই চায় না, সড়কে আহত হয়ে বিকালাঙ্গ জীবনযাপন করতে। কিন্তু কোনো কিছুতেই আমাদের দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলো যেন নিরাপদ হয়ে উঠছে না। প্রতিদিন সড়ক দূর্ঘটনায় অকালে প্রাণ হারাচ্ছে অসংখ্য মানুষ। স্কুল-কলেজ-বিশ^বিদ্যালয়গামী শিক্ষার্থীরা লাশ হয়ে বাড়ি ফিরছে। গন্তব্য পথে কেউই যেন নিরাপত্তাবোধ করছে না। একটি স্বাধীন দেশে এমন দুঃসহ দূর্ঘটনা ঘটা ও দূর্ঘটনায় অকাল মৃত্যু কখনই কাম্য নয়। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ও মৃত্যুর পেছনে আমরা প্রথমত কাকে দায়ী করতে পারি?

বর্তমান সড়ক দূর্ঘটনার মহামারী রুপই বলে দিচ্ছে সড়ক দূর্ঘটনার জন্য কে বা কারা দায়ী। পরিবহন খাতে দুর্নীতি, যানবাহনের বেপরোয়া গতি, চালকের অসম প্রতিযোগিতামুলক মনোভাব ও নিদারুণ খামখেয়ালিপনা, অপ্রশিক্ষিত চালক, মাদকাসক্ত ও শিশু চালক দিয়ে গাড়ি চালানো, রাস্তায় গণপরিবহনের আধিক্য, লাইসেন্সবিহীন চালক, ফিটনেসবিহীন গাড়ির ছড়াছড়িসহ নানা কারণে সড়ক পথ অনিরাপদ হয়ে উঠেছে। চালকেরা কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করেই পথচারীদের ওপর গাড়ি চালিয়ে দিয়েও পার পেয়ে যাচ্ছে। তারা দেশের বিদ্যমান আইনসমুহ কোনো কিছুতেই আমলে নিচ্ছে না। গাড়ি চাপা দিয়ে মানুষ হত্যা করেও ঘুষ, তদবির আর ক্ষতাসীন মালিকের আশ্রয়ে রেহাই পেয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এমন নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলা আর কতকাল মেনে নেওয়া যায়? এ বিষয়ে আজ দেশের জনগণ সোচ্চার ও সচেতন হতে শুরু করেছে। তাই সবাই বলছে, দূর্ঘটনার মুল নায়ক ঘাতক চালকের কেন মৃত্যু দন্ড হবে না? তাই দেশে নিরাপদ সড়ক আইন চেয়ে সচেতন অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা দেশব্যাপি তীব্র আন্দোলন নেমেছে। শিক্ষার্থীদের এমন একটি আন্দোলন বর্তমান প্রেক্ষিতে সত্যই প্রশাংসার দাবি রাখে।

আমাদের দেশের সংবিধানে পরিবহনের সুনির্দিষ্ট আইন রয়েছে। কিন্তু তা সময়োপযোগী নয় কিংবা সামান্য সংশোধন ও সংযোজন করা প্রয়োজন বলে মনে করছে সবাই। তাই জনগণের ক্ষোভ, পরিস্থিতি বিচেনায় কেন আইনে সংশোধন ও সংযোজন আনা হবে না? কেন পরিবহন আইনে ঘাতক চালকের মৃত্যুদন্ড বহাল রাখা হবে না? ফিটনেসবিহীন পরিবহনের মালিক, লাইসেন্সবিহীন চালক কেন শাস্তি ও জরিমানার আওতায় আসবে না? এমনই দাবি দাওয়া নিয়ে দেশব্যাপি শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের তোপের মুখে পড়ে বর্তমান বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে নিরাপদ সড়ক আইনের প্রস্তাবনা তৈরি করেছেন। অচিরেই উচ্চ আদালতের রায়ের মাধ্যমে তা বাস্তবায়ন হবে বলে আমরা আশা করছি। বর্তমান সরকারের গৃহীত নিরাপদ সড়ক আইনটি সকলের জানার জন্য নিচে তুলে ধরা হল-

নিরাপদ সড়ক আইন (প্রস্তাবিত)

অপরাধ -   শাস্তি
১.    গাড়ি দিয়ে মানুষ হত্যা।   - ১.    ৩০২ ধারায় মৃত্যুদন্ড।
২.    গাড়ি দিয়ে আহত হলে।   - ২.    ৩০৪ ধারা অনুযায়ী যাবজ্জীবন কারাদন্ড।
৩.    বেপোরোয়া গাড়ি চালিয়ে দূর্ঘটনা ঘটালে।  -  ৩.    ৩ বছরের সশ্রম কারাদন্ড।
৪.    গাড়ি পাল্লা দিয়ে দূর্ঘটনা ঘটালে।  -  ৪.    ৩ বছরের কারাদন্ড কিংবা ২৫ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয়দন্ড।
৫.    দূর্ঘটনা না ঘটালেও বেপোরোয়াভাবে গাড়ি চালালে।  -  ৫.    ২ বছর কারাদন্ড কিংবা ২ লাখ টাকা জরিমানা।
৬.    ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তায় নামানো হলে।  -  ৬.    ১ বছর জেল অথবা ১ লাখ টাকা জরিমানা।
৭.    চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স না থাকলে।  -  ৭.    অনধিক ৬ মাস কারাদন্ড কিংবা ৬০,০০০ টাকা জরিমানা এবং এক্ষেত্রে বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তার করা হবে।

উল্লেখ্য যে নতুন এ ধারায় গাড়ির মালিককেও শাস্তির আওতায় আনা হবে। এছাড়া ড্রাইভিং লাইসেন্সে ১১ টি বিশেষ পয়েন্ট যুক্ত করা হয়েছে। চালকদের বিভিন্ন অপরাধের ভিত্তিতে এই পয়েন্টগুলো কমতে থাকবে। উদাহণস্বরুপ বলা যেতে পারে, মোটরযানের গতিসীমা নিয়ন্ত্রণ না করলে ১ পয়েন্ট কাটা যাবে। এই ভাবে এক সময় পয়েন্ট শূণ্য হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে উক্ত চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স বাতিল হয়ে যাবে। অতঃএব, এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রস্তাবিত আইনের ধারাগুলো সময়োপযোগী। আশা করছি, দ্রুত বাস্তবায়ন হওয়ার মধ্য দিয়ে দেশের জনগণ এটির আশানুরুপ সুফল ভোগ করবে।

কিন্তু খবরে এসেছে, পরিবহন কর্তৃপক্ষ প্রস্তাবিত আইনটি মাথা পেতে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। এ নিয়ে তারা পরিবহন ধর্মঘট বহাল রেখেছে। তারা রাস্তায় কোনো গাড়ি নামাচ্ছে না। কিন্তু প্রশ্ন হল, পরিবহন শ্রমিক ও মালিকদের রাষ্ট্রের প্রতি এমন অনীহা ও স্বেচ্ছাচারিতা কেন? তারা কি দেশের জনগণকে নিরাপত্তা দিতে চায় না? এ বিষয়ে সরকারকে কঠোর থেকে কঠোর হওয়ার আহ্বান করছি। সময় এসেছে দেশের পরিবহনখাতের সিস্টেমকে সুপথে পরিচালিত করার। অতঃএব প্রস্তাবিত আইনের ধারাগুলো দেশের মানুষের নিরাপত্তাসহ সার্বিক বিবেচনায় বাস্তবায়িত হওয়ার যথাযথ দাবি রাখে।

আমরা দেখেছি, সারা দেশব্যাপি নিরাপদ সড়কের দাবি নিয়ে আন্দোলন চলেছে (এবং চলছে)। বাংলাদেশ সরকার এই আন্দোলনকে ইতিবাচকভাবেই দেখেছেন এবং আন্দোলনকারীদের সকল দাবী দাওয়া মেনে নেওয়ার আশ^াস দিয়েছেন এবং যেগুলো এখনই পূরণযোগ্য তিনি তা পূরণ করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু কিছু দুবৃর্ত্তরা অর্তকিত হামলা ও মিথ্যা গুজব রটিয়ে আন্দোলনকে ভিন্নপথে পরিচালিত করার চেষ্টা চালিয়েছে। যাইহোক, এখন যেহেতু নিরাপদ সড়ক আইনের প্রস্তাবনা এসেছে, তাই সকলকে প্রস্তাবিত আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে ঘরে ফিরে যাওয়া উচিৎ। শিক্ষার্থীদের পাঠে মনোযোগ দেওয়া উচিৎ। তারা দেশের জনগণকে সড়কে যে শৃঙ্খলতা দেখিয়েছে, তা সত্যই প্রশংসার দাবিদার। তারা দেখিয়ে দিয়েছে, কিভাবে গাড়ির লেন মেনে গাড়ি চালাতে হয়, লাইসেন্স না থাকলে কি ক্ষতি হতে পারে, উল্টোপথে গাড়ি চালানোর কুফল কি ইত্যাদি যা ছিল ট্রাফিক পুলিশের কাজ। এসব থেকে ব্যর্থ ট্রাফিক পুলিশেরাও নতুন কিছু শিখেছে আশা করছি। যে কথা বলছিলাম, শিক্ষার্থীদের এখন আন্দোলন বন্ধ করা উচিৎ। কেননা, আন্দোলন দীর্ঘমেয়াদী হলে তা ভিন্নপথে পরিচালিত হবে। দেশের আর্থিক ক্ষতিসহ আন্দোলনকারীদেরও অপরিমেয় ক্ষতি হতে পারে।

আমি এ পরিসরে যে কথাগুলো বলতে চাই, শুধু পরিবহন শ্রমিকদের আইন না মানার দোষ দিয়ে আমরা কখনই চুপ থাকতে পারি না। আমাদের পথচারীদের যেমন সচেতনতার অভাব রয়েছে, তেমনি রয়েছে অসাবধানতা। আমরা রাস্তায় নেমে লাগাতার ঠিকই আন্দোলন করছি, কিন্তু কেউ কখনও এমন চিন্তা করেছি যে আমাদেরকে ফুটপাত বাদ দিয়ে রাস্তার মধ্য দিয়ে হাঁটা যাবে না! আমরা পথচারীরা অনেকেই নিকটস্থ ফুট ওভার ব্রিজ রেখে হাত দিয়ে গাড়ি থামিয়ে রাস্তা পারাপার হই, লাফ দিয়ে বাসে উঠি, যাত্রী ভর্তি বাস দেখেও ভীড় ঠেলে উঠি। কিন্তু এই সব বদঅভ্যাসগুলো পরিহার করতে না পারলে আমাদেরকে কোনো নিরাপদ সড়ক আইনই নিরাপত্তা দিতে পারবে না। কোনো দিনও সড়ক দূর্ঘটনা বন্ধ হবে না। আমরা অসচেতন হয়ে যদি নিজের মৃত্যু ডেকে আনি, তাহলে সে দায়ভার রাষ্ট্র বহন করবে কি?

আমরা আমাদের প্রয়োজনে প্রতিনিয়ত গণপরিবহনে যাতায়াত করি। একটি বাসে কমপক্ষে ৪০-৫০ জনের মত যাত্রী থাকে। প্রশ্ন হল, আমরা কি কোনো দিন ড্রাইভারের লাইসেন্স চেক করেছি? কখনও কি জিজ্ঞেস করেছি, ‘ভাই আপনার লাইসেন্স আছে কিনা?’ এটা সত্য, আমরা কোনো দিন এ কাজগুলো করিনি এবং করার প্রয়োজনও মনে করিনি। সব সময় প্রশাসনকেই দোষ দিয়ে এসেছি। কিন্তু নিজেদের স্বার্থে নিজেদেরও কিছু দায়িত্ব থাকে। তাহলে এখন থেকে আমাদের এ মনোবল তৈরি করতে হবে- আমি কি ফিটনেসবিহীন গাড়ীতে উঠেছি? লাইসেন্স আছে কি না একটু জেনে নিই। এসব জানার অধিকার সকলের আছে। এবং চালক তার প্রয়োজনীয় প্রমাণ দেখাতে বাধ্য থাকবে। যদি এর ব্যতয় ঘটে তখনই আন্দোলন করতে হবে। প্রশাসনের আশ্রয় নিতে হবে। যদি চালকের লাইসেন্স না থাকে, তাহলে আমাদেরকে সে গাড়ি পরিহার করতে হবে, গাড়ি থেকে নেমে যেতে হবে। সামাজিক ভাবে সে পরিবহনকে বয়কট করতে। দেখা যাবে যাত্রী শূণ্যতায় তারা ঠিকই নিয়ম মেনে রাস্তায় গাড়ি নামাবে।

আমরা গাড়িতে বসে লক্ষ্য করি, চালকেরা অনেকাংশেই সঠিক গতিতে বাস চালাচ্ছে। কিন্তু তখন কেউ কেউ নিজেদের তাগিদেই বলে থাকি, ‘মামা গাড়ি কেন জোড়ে চালাও না?’ তখনই চালক মামা রেগে গিয়ে বেপোরোয়া গতিতে গাড়ি চালাতে থাকে। পরিনামে দূর্ঘটনার শিকার হতে হয়। তাই আমাদেরকে গন্তব্যে যাওয়ার জন্য হাতে পর্যাপ্ত সময় নিয়ে বের হতে হবে। নিজেদের তাড়াহুড়াকে চালকের ওপর বর্তিয়ে বিপদ ঢেকে না আনাই শ্রেয়। আমরা যদি আমাদের অভ্যাসকে পরিবর্তন করতে পারি তাহলেই সড়ক দূর্ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব। আমাদের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা কয়েকদিনের আন্দোলনের মাধ্যমে দেশবাসিকে শিখিয়ে দিয়েছে, জনগণ যদি নিয়ম মেনে চলে এবং সুশৃঙ্খলভাবে গাড়ি চালানো হয়, তাহলে কোনো সড়ক দূর্ঘটনা ঘটবে না। আমরা অনেক সময় সরকারের সিদ্ধান্তকে দায়ী করি। কিন্তু সরকার যেই সিদ্ধান্তই গ্রহণ করুক, তা বাস্তবায়নের দায়িত্বটা আমাদের উপরও পড়ে। আমরা নিজেরা সব দেখে সব সরকারের উপর ছেড়ে দিলে পরিবর্তন কখনোই সম্ভব না। মনে রাখবেন, যে কোনো দেশের সরকার কখনই অবৈধ সিদ্ধান্তকে প্রশ্রয় দিয়ে তাঁর পতনকে ত্বরান্বিত করবে না।

পরিশেষে বলতে চাই, শুধু আইনের প্রয়োগ হলেই যে সমস্যার সমাধান হবে, তা কিন্তু মোটেও সত্য নয়। দেশের আইন প্রয়োগের পাশাপাশি আমাদের সচেতন হওয়া দরকার। উন্নয়নমুখী সরকার ও সচেতন নাগরিকই পারে দেশ থেকে সকল অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা দূর করতে। সড়ক দূর্ঘটনা যেহেতুু বেড়েই চলেছে, তাই এটি প্রতিরোধে সরকারকে সহযোগিতা প্রদান করা হোক। প্রস্তাবিত আইনের পাশাপাশি আর কি কি পদক্ষেপ গ্রহণ করলে সড়ক পথ নিরাপদ হবে, তা তুলে ধরা হোক। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় নিরাপদ পথচলা নিশ্চিত হোক, নিরাপদে বেঁচে থাকা নিশ্চিত হোক সে প্রত্যাশা রাখি।

লেখক: কবি ও কলামিস্ট, ঢাকা।

Ads