গ্রাহকদের আশ্বস্ত করলেন গভর্নর

‘ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের কোনো অসুবিধা হবে না’

অয়ন আহমেদ

১৩ জুন ২০২৬, ০৮:২৩ এএম


‘ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের কোনো অসুবিধা হবে না’

 

সলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিকে ঘিরে চলমান পরিস্থিতিতে আমানতকারীদের বিন্দুমাত্র উদ্বিগ্ন না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমান। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, ব্যাংকটির আমানতকারীরা যেকোনো সময় তাদের টাকা তুলতে পারবেন, এতে কোনো অসুবিধা হবে না। ব্যাংকটির স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে এবং বিদ্যমান নিয়ম-কানুন প্রয়োগ করেই বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হবে।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে গভর্নর এসব কথা বলেন। অর্থমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই উচ্চপর্যায়ের সংবাদ সম্মেলনে সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি ‘গ্রাহক ফোরামের’ ব্যানারে চলা আন্দোলনের মুখে গত কয়েক দিনে আমানতকারীরা ব্যাংকটি থেকে সাত হাজার কোটি টাকারও বেশি আমানত তুলে নিয়েছেন। এই আকস্মিক চাপ সামলাতে ব্যাংকটি বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ১০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ সহায়তা চেয়েছে। বিষয়টি নিয়ে গত সপ্তাহে গভর্নরের সঙ্গে বৈঠক করে নিজেদের উদ্বেগ জানিয়েছিল ব্যাংকারদের শীর্ষ সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ (এবিবি)।

সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর এই পরিস্থিতি নিয়ে বলেন, একটি বিশেষ গোষ্ঠী ইসলামী ব্যাংকে অবৈধ হস্তক্ষেপের যে অভিযোগ তুলছে, তা সম্পূর্ণ সঠিক নয়। বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো ঋণ অনুমোদন, নিয়োগ, বদলি বা পদোন্নতির মতো অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করেনি।

দেশের সামগ্রিক ব্যাংক খাতের নাজুক পরিস্থিতি তুলে ধরে গভর্নর জানান, বিগত সময়ে বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে ব্যাংকিং খাতের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অর্থ বের করে নেওয়া হয়েছে, যার পরিমাণ প্রায় পাঁচ লাখ কোটি টাকা। সাধারণ মানুষের কষ্টের এই জমানো টাকার একটি বড় অংশ বিভিন্নভাবে আত্মসাৎ করা হয়েছে।

তিনি বলেন- "এই বিশাল পরিমাণ অর্থ পুরোপুরি সরকারি রাজস্ব থেকে ফিরিয়ে দেওয়া কতটা সম্ভব, তা নিয়ে বাস্তবতা ও সরকারের সক্ষমতা বিবেচনা করতে হচ্ছে। তাই আপাতত ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে।"

তিনি আরও জানান, খাতটিতে স্থিতি ফেরাতে কিছুটা সময় ও সবার সহযোগিতা প্রয়োজন, তবে জমে থাকা সমস্যাগুলো পর্যায়ক্রমে সমাধান করা হবে। এছাড়া, ৫টি ইসলামী ধারার ব্যাংকের আমানতকারীদের অর্থ ফেরতের বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষিত স্কিম অনুযায়ী অর্থ পরিশোধের কাজ চলছে। পাশাপাশি, ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে যারা দীর্ঘদিন অর্থ ফেরত পাচ্ছেন না, তাদের আগামী এক-দুই সপ্তাহের মধ্যে অর্থ ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার বিষয়ে গভর্নর বাস্তব চিত্র তুলে ধরে বলেন, এই প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জটিল এবং আন্তর্জাতিকভাবে অর্থ উদ্ধারের সফলতার হার ২ শতাংশেরও কম। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক হাত গুটিয়ে বসে নেই। বিভিন্ন দেশে পাচার হওয়া অর্থ জব্দের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং অন্তত ১০টি সংস্থা এই লক্ষ্যে কাজ করছে। ইতিমধ্যে কিছু অর্থ করের মাধ্যমে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রাথমিক সাফল্য পাওয়া গেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

মোস্তাকুর রহমান বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানামুখী গুজব ছড়ানো হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত ৫ সদস্যের পরিচালনা পর্ষদের একজন পরিচালককে অভিযোগের ভিত্তিতে অপসারণ করা হয়েছিল। পরে ঈদের আগে আন্দোলনের মুখে তৎকালীন চেয়ারম্যান পদত্যাগ করলে দ্রুত নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়। এরপর থেকেই একটি পক্ষ ব্যাংকটিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অস্থির করার চেষ্টা করছে। তবে সামগ্রিকভাবে ব্যাংক খাতে কোনো তারল্যসংকট নেই এবং ইসলামী ব্যাংকের সমস্যাও দ্রুত সমাধান করা সম্ভব হবে।

নিজের বিরুদ্ধে ওঠা ঋণখেলাপির অভিযোগের বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়ে গভর্নর বলেন, বিগত চার মাস ধরে এই অভিযোগ শোনা গেলেও তিনি আগে মুখ খোলেননি। তিনি যে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, সেটি একটি আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং তারা কখনো ঋণ মওকুফ চায়নি।

তিনি জানান, একটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক-সমর্থিত প্রকল্পের আওতায় কম সুদে ঋণ নেওয়ার পর হঠাৎ সুদের হার বেড়ে যাওয়ায় ঋণ পরিশোধে কিছুটা বিলম্ব হয়েছিল, যা একটি বিশেষ পরিস্থিতির কারণে হয়েছে। তবে ওই প্রতিষ্ঠানটি ইতিমধ্যে ১০০ কোটি টাকারও বেশি ঋণ পরিশোধ করেছে।

 

Ads