২০২৮ থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে ৪ নতুন বিষয়, থাকছে না জিপিএ
১০ জুন ২০২৬, ১০:০৯ এএম
দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাব্যবস্থায় বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আগামী ২০২৮ সাল থেকে নতুন শিক্ষাক্রম চালুর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে পাঠ্যসূচিতে যুক্ত হচ্ছে ৪টি নতুন বিষয়। এগুলো হলো—আনন্দময় শিক্ষা (লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস), খেলাধুলা, সংস্কৃতি এবং কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা। তবে নতুন যুক্ত হওয়া এসব বিষয়ে শিক্ষার্থীদের মেধা মূল্যায়নে কোনো গ্রেড বা জিপিএ (GPA) থাকছে না; মূল্যায়ন হবে কেবল 'পাস' বা 'ফেল' ভিত্তিতে।
সোমবার (৮ জুন) সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন এই সিদ্ধান্তের কথা জানান।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, নতুন এই পরিকল্পনা অনুযায়ী চতুর্থ শ্রেণি থেকে খেলাধুলা ও সংস্কৃতি বিষয় দুটি বাধ্যতামূলক করা হবে। আর ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে যুক্ত হবে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং ‘আনন্দময় শিক্ষা’। এর পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের বাংলা ও ইংরেজির বাইরে তৃতীয় একটি ভাষা শেখানোর পরিকল্পনাও করছে সরকার।
শ্রেণিকক্ষে ফিরছে খেলার মাঠ ও সংস্কৃতি
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “বর্তমানে বিভিন্ন বিদ্যালয়ে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড চালু থাকলেও সেগুলো মূল শিক্ষাক্রমের অংশ ছিল না। নতুন পরিকল্পনায় এগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক পাঠ্যসূচির আওতাভুক্ত করা হচ্ছে।”
জানা গেছে, খেলাধুলার মধ্যে প্রাথমিকভাবে ফুটবল ও দাবা দিয়ে যাত্রা শুরু হবে। পরবর্তীতে ক্রিকেটসহ অন্যান্য খেলাও পর্যায়ক্রমে যুক্ত করা হবে। অন্যদিকে, সংস্কৃতি বিষয়টিকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে—
পারফরমেটিভ: এর আওতায় থাকবে গান, নাচ, আবৃত্তি, বিতর্ক ও বক্তৃতা।
এক্সপ্রেসিভ: এই অংশে চিত্রাঙ্কন ও সাহিত্যচর্চাসহ শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল প্রকাশকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। শিক্ষার্থীরা তাদের নিজস্ব আগ্রহ অনুযায়ী যেকোনো একটি ক্ষেত্র বেছে নেওয়ার সুযোগ পাবে।
বাধ্যতামূলক হচ্ছে কারিগরি শিক্ষা
শিক্ষার্থীদের কর্মমুখী করে গড়ে তুলতে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন বলেন, “সব শিক্ষার্থীর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়মুখী শিক্ষা একমাত্র পথ হতে পারে না। স্কুল পর্যায় থেকেই কারিগরি দক্ষতা অর্জনের সুযোগ তৈরি হলে দেশে কর্মসংস্থান ও স্বাবলম্বিতা বাড়বে।” এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে দেশের প্রতিটি বিদ্যালয়ে ধাপে ধাপে কারিগরি ল্যাব স্থাপন করা হবে বলেও জানান তিনি।
‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ বা আনন্দময় শিক্ষা
ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে যুক্ত হতে যাওয়া ‘আনন্দময় শিক্ষা’ বিষয়টি কেবল সনাতন কোনো পাঠ্যবই নয়, বরং এটি পুরো শিক্ষাব্যবস্থার একটি নীতিগত কাঠামো হিসেবে কাজ করবে। উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন জানান, এই বিষয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা, পারিবারিক মূল্যবোধ, সামাজিক আচরণ, দায়িত্ববোধ এবং মানবাধিকার সম্পর্কে সচেতন করা হবে। একই সাথে বৃক্ষরোপণ এবং জাতীয় দিবসের তাৎপর্য অনুধাবনের মতো বিভিন্ন বাস্তবভিত্তিক সামাজিক কাজের মাধ্যমে এই মূল্যবোধগুলোর চর্চা করানো হবে।
বাস্তবায়ন পরিকল্পনা ও চ্যালেঞ্জ
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে দেশের কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরীক্ষামূলকভাবে (পাইলট প্রকল্প) এই শিক্ষাক্রম চালু করা হবে। সেই অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে ২০২৮ সাল থেকে পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাক্রম চূড়ান্ত রূপ পাবে। তবে এটি সব শ্রেণিতে একযোগে নাকি ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
নতুন এই বিষয়গুলো চালুর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাব। সরকার এই সংকট মোকাবিলায় যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত ক্রীড়া শিক্ষক নিয়োগ এবং সংস্কৃতি শিক্ষার জন্য বিশেষ প্রস্তুতি নিচ্ছে। এছাড়া ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ বিষয়ের জন্য আলাদা নির্দেশিকা (গাইডলাইন) তৈরি এবং শিক্ষকদের ধাপে ধাপে প্রশিক্ষণের আওতায় আনার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে।


















