ব্যাংকে নগদ টাকার তীব্র সংকট: খোলা বাজারে চড়া দামে বিকোচ্ছে নতুন নোট

অয়ন আহমেদ

১৪ মে ২০২৬, ১০:৩৮ এএম


ব্যাংকে নগদ টাকার তীব্র সংকট: খোলা বাজারে চড়া দামে বিকোচ্ছে নতুন নোট

 

সন্ন ঈদ উৎসবকে কেন্দ্র করে দেশের ব্যাংকিং খাতে নগদ টাকার তীব্র তারল্য সংকট দেখা দিয়েছে। প্রতিবছর এই সময়ে উৎসবের খরচ, বেতন-বোনাস এবং কেনাকাটার কারণে নগদ টাকার চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। তবে এবারের চিত্র ভিন্ন ও নজিরবিহীন। দেশের সিংহভাগ বাণিজ্যিক ব্যাংক গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী নগদ টাকা সরবরাহ করতে পারছে না। ফলে ঈদের আনন্দ উপভোগের চেয়ে নিজের জমানো টাকা তুলতে গিয়ে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সাধারণ গ্রাহকরা।

রাজধানীর মতিঝিল, দিলকুশা, কারওয়ান বাজার ও ধানমন্ডিসহ বিভিন্ন এলাকার ব্যাংক শাখাগুলোতে সকাল থেকেই গ্রাহকদের দীর্ঘ লাইন চোখে পড়ছে। অনেক ব্যাংক দৈনিক নগদ উত্তোলনের সীমা নির্দিষ্ট করে দিয়েছে, যার ফলে ব্যবসায়ী ও সাধারণ গ্রাহকরা প্রয়োজনীয় অর্থ তুলতে পারছেন না। ক্ষুব্ধ এক গ্রাহক জানান, "ঈদের কেনাকাটা ও পারিবারিক খরচের জন্য টাকা তুলতে এসেছি, কিন্তু ব্যাংক বলছে পর্যাপ্ত ক্যাশ নেই। নিজের টাকা তুলতে কেন এত ভোগান্তি পোহাতে হবে?"অন্যদিকে, ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের অন্যতম প্রধান মাধ্যম এটিএম (ATM) বুথগুলোর বেশির ভাগই 'আউট অব ক্যাশ' বা টাকা শূন্য হয়ে পড়ে রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বুথগুলোতে পর্যাপ্ত টাকা রাখার নির্দেশনা দিলেও মাঠপর্যায়ে তার বাস্তবায়ন মিলছে না।

ঈদের সালামি বা উপহারের জন্য চকচকে নতুন নোটের চাহিদা বাঙালির দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নীতিগত পরিবর্তন এনে এবার ঈদের বিশেষ নতুন নোট বিতরণ কার্যক্রম বন্ধ রেখেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, উৎসবভিত্তিক নতুন নোট না দিয়ে এখন থেকে সারা বছর জুড়েই চাহিদা অনুযায়ী ব্যাংকিং চ্যানেলে নতুন নোট সরবরাহ করা হবে। সাধারণ কাউন্টারে জনসাধারণের জন্য নতুন নোটের সরবরাহ না থাকায় সাধারণ মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

ব্যাংক কাউন্টারে নতুন টাকা না মিললেও রাজধানীর গুলিস্তান, মতিঝিল এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সামনের ফুটপাতে অবৈধভাবে দেদারসে বিক্রি হচ্ছে নতুন নোটের বান্ডিল। ১টি ১০, ২০, ৫০ বা ১০০ টাকার নোটের বান্ডিল কিনতে গ্রাহকদের গুনতে হচ্ছে ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত প্রিমিয়াম বা কমিশন। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—ব্যাংক যেখানে নতুন টাকা দিতে পারছে না, সেখানে এই অবৈধ ব্যবসায়ীদের কাছে বিপুল পরিমাণ চকচকে নোট কীভাবে পৌঁছায়? এর পেছনে কোনো শক্তিশালী সিন্ডিকেট জড়িত রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অর্থনীতিবিদ ও খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংকিং খাতের ওপর গ্রাহকদের আস্থার ঘাটতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং সঞ্চয় কমার কারণে মানুষ ব্যাংক থেকে টাকা তুলে হাতে রাখাকে বেশি নিরাপদ মনে করছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো প্রতিনিয়ত আন্তঃব্যাংক কলমানি মার্কেট (Interbank Call Money Market) এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের রেপো (Repo) ও বিশেষ তারল্য সহায়তার ওপর নির্ভর করছে। প্রতিদিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকার ধার দেওয়া হলেও বাজারের তারল্য ঘাটতি মেটানো সম্ভব হচ্ছে না।সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ঈদের ছুটির আগে ব্যাংকিং খাতের এই নগদ টাকার সংকট দ্রুত দূর করা না গেলে তা উৎসবের অর্থনীতির গতি সচল রাখার ক্ষেত্রে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে।

 

Ads