কাতারের এলএনজি সরবরাহ বন্ধ আরও ২ মাস, বাড়তে পারে আমদানি ব্যয়
২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:০২ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
কাতার থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় বাংলাদেশে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ বন্ধ থাকার সময় আরও দুই মাস বাড়ানো হয়েছে। কাতারের রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি কোম্পানি কাতারএনার্জি চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঘোষিত ‘ফোর্স মেজর’-এর মেয়াদ আগামী নভেম্বর পর্যন্ত বাড়িয়েছে।
এতে দেশের গ্যাসের চাহিদা পূরণে বিকল্প উৎস থেকে এলএনজি সংগ্রহের প্রয়োজন আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে স্পট মার্কেট থেকে অতিরিক্ত কার্গো কিনতে হলে আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। কারণ দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির তুলনায় বর্তমানে স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম অনেক বেশি।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাতারএনার্জি ইতালির এডিসন এবং বাংলাদেশ ও পাকিস্তানসহ দক্ষিণ এশিয়ার কয়েকটি দেশের ক্রেতাকে সরবরাহ পরিস্থিতি সম্পর্কে নোটিশ দিয়েছে। এর আগে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে প্রথমবারের মতো ফোর্স মেজর ঘোষণা করেছিল প্রতিষ্ঠানটি। পরে এর মেয়াদ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছিল।
ফোর্স মেজর এমন একটি চুক্তিগত বিধান, যার আওতায় যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারি কিংবা নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা অন্য কোনো অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতিতে চুক্তির কোনো পক্ষ সাময়িকভাবে নির্ধারিত দায়বদ্ধতা থেকে অব্যাহতি পেতে পারে।
বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে কাতার ও ওমান থেকে এলএনজি আমদানি করে। পাশাপাশি দেশের চাহিদা ও সরবরাহ পরিস্থিতি বিবেচনায় পেট্রোবাংলা আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেট থেকেও এলএনজি সংগ্রহ করে। ফলে কাতারের সরবরাহ বন্ধ থাকার সময় আরও দীর্ঘ হলে ঘাটতি সামাল দিতে স্পট মার্কেট থেকে অতিরিক্ত কার্গো কেনার প্রয়োজন হতে পারে।
স্পট মার্কেটে বাড়ছে এলএনজির দাম
দেশে চলমান জ্বালানি সংকটের মধ্যে স্পট মার্কেট থেকে তুলনামূলক বেশি দামে এলএনজি কিনতে হচ্ছে সরকারকে। গত ১৩ সেপ্টেম্বর সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে পাঁচ কার্গো এলএনজি কেনার প্রস্তাব তোলা হলেও এর মধ্যে দুটি কার্গো কেনার অনুমোদন দেওয়া হয়।
অনুমোদিত ৫২তম কার্গোর জন্য প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজির দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২৮ দশমিক ৯৫ ডলার। আর ৫৬তম কার্গোর ক্ষেত্রে দর পড়েছে ২৯ দশমিক ৭৯৫ ডলার। সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে আরও দুই কার্গোর জন্য প্রতি এমএমবিটিইউ ১৭ ডলার এবং অন্য দুই কার্গোর জন্য ১৯ ডলার দর প্রস্তাব করা হয়েছে।
তবে গত বছরের ডিসেম্বরে স্পট মার্কেট থেকে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজি ১০ দশমিক ৫০ ডলারের কম দামে কেনা হয়েছিল। ফলে কয়েক মাসের মধ্যেই আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির স্পট মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে তুলনামূলক কম দাম
বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহ চুক্তির অন্যতম অংশীদার কাতারএনার্জি। প্রতিষ্ঠানটি বছরে ১৮ থেকে ২৫ লাখ টন এলএনজি সরবরাহ করে থাকে। চুক্তি অনুযায়ী প্রতি এমএমবিটিইউর দাম ১০ দশমিক ১১৪ ডলার।
অন্যদিকে ওমানের ওকিউ ট্রেডিং লিমিটেড ২০১৯ সাল থেকে বাংলাদেশে এলএনজি সরবরাহ করছে। ১০ বছরের চুক্তির আওতায় প্রতিষ্ঠানটি বছরে ১০ থেকে ১৫ লাখ টন এলএনজি দেয়। এই চুক্তিতে প্রতি এমএমবিটিইউর দাম ৯ দশমিক ৪৪৪ ডলার। চুক্তিটির মেয়াদ ২০২৮ সালে শেষ হওয়ার কথা।
দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে কাতার ও ওমান থেকে পাওয়া এলএনজির দামের তুলনায় বর্তমানে স্পট মার্কেটের মূল্য অনেক বেশি। ফলে কাতারের সরবরাহ বন্ধ থাকায় ঘাটতি পূরণে স্পট মার্কেট থেকে অতিরিক্ত এলএনজি কিনতে হলে সরকারের আমদানি ব্যয়ের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে।
আমদানি নির্ভরতা কমানোর তাগিদ
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সাবেক সদস্য মকবুল ই ইলাহী চৌধুরী বলেন, দেশের জ্বালানি খাতে আমদানি নির্ভরতা বাড়ানোর কারণে বর্তমান পরিস্থিতিতে চাপ তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে প্রয়োজনীয় গতি না এনে আমদানির ওপর বেশি নির্ভর করা হয়েছে। কাতারএনার্জির ফোর্স মেজরের কারণে আমদানি ব্যয় আরও বাড়তে পারে। তাই দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে এখন বেশি গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
মকবুল ই ইলাহী চৌধুরীর ভাষ্য, কাতার থেকে এলএনজি সরবরাহ না এলে বর্তমান পরিস্থিতিতে স্পট মার্কেট থেকেই বেশি দামে গ্যাস কিনতে হবে। তার মতে, তাৎক্ষণিকভাবে সরকারের সামনে এর বিকল্প সীমিত। ফলে কাতারের সরবরাহ বন্ধ থাকার মেয়াদ বাড়লে আমদানি ব্যয়ের চাপও বাড়তে পারে।



































