দেখতে এটিএম কার্ড, পরীক্ষায় জালিয়াতির অস্ত্র

প্রতিদিনেরচিত্র ডেস্ক

০১ নভেম্বর ২০১৫, ০৬:০১ এএম


দেখতে এটিএম কার্ড, পরীক্ষায় জালিয়াতির অস্ত্র

ছবি-সংগ্রহিত

    দেখতে হুবহু এটিএম কার্ড অথবা ক্রেডিট কার্ড এর মত। পরীক্ষা হলে মানিব্যাগে নিয়ে ঢুকে পড়লে কোন শিক্ষক তা বুঝার ক্ষমতা রাখেনা। কিন্তু এর সাথে যখন সযুক্ত হবে ইয়ারপিস তখন ঐ কার্ড সয়ংক্রিয়ভাবে কানে বলে দেবে সঠিক প্রশ্নের উত্তর। নতুন এই অস্ত্র ধরা পড়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের 'ক' ইউনিটে ভর্তি পরীক্ষা গত শুক্রবার মোহাম্মদপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজ অনুষ্ঠিত হয়। পরীক্ষা চলাকালীন সময় হাসিবুল হাসান সামু নামের এক শিক্ষার্থীর মনোযোগ ছিল তার প্যান্টের পকেটে। দেড় ঘণ্টার পরীক্ষায় ৪৫ মিনিট পার হলেও কোনো প্রশ্নের উত্তর করেনি সে। তার এমন আচরণে সন্দেহ হয় কক্ষ পরিদর্শকের। জিজ্ঞাসাবাদ ও তল্লাশি করে তার হাসিবুল পকেটে পাওয়া যায় একটি ডিজিটাল ডিভাইস, যার মাধ্যমে অন্য প্রান্ত থেকে প্রশ্নের উত্তর বলে দেওয়ার কথা ছিল জালিয়াতচক্রের। পরে এই পরীক্ষার্থীকে দুই বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন এটি বিশেষভাবে তৈরি একটি ইলেকট্রনিক যন্ত্র, যার ভেতরে সিম ডুকিয়ে মোবাইল ফোনের মত ব্যবহার করা যায়। পরীক্ষকের চোখ ফাঁকি দিয়ে কেন্দ্রের বাইরে যোগাযোগ করে জেনে নেওয়া যায় কাঙ্খিত প্রশ্নের উত্তর।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গোপন তথ্যের ভিত্তিতে গত বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর ফার্মগেট এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১২ ভর্তীচ্ছু শিক্ষার্থীকে আটক করে। তারাও হয়ত এই ডিভাইস কেনার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করেন বাহিনীটি।

অধ্যাপক মিজান প্রতিদিনের চিত্র ঢাবি প্রতিনিধিকে বলেন, দেড় ঘণ্টার পরীক্ষা এক ঘণ্টার মাথায় সন্দেহ হয়। হাসিবুলকে তল্লাশি করে পাওয়া যায় ওই ইলেকট্রনিক ডিভাইস। ওই যন্ত্রের সাহায্যে উত্তর জেনে নিয়ে সে পরীক্ষার হলে উত্তরপত্রে বৃত্ত ভরাটের চেষ্টা করছিল।”

ব্যাংকের এটিএম কার্ডের মত দেখতে ওই যন্ত্রের সঙ্গে এই জালিয়াতিতে ব্যবহার করা হয় তারবিহীন ‘ব্লুটুথ’ ইয়ারপিস। আকারে ছোট হওয়ায় পরীক্ষার্থী অন্য কারও দৃষ্টি আকর্ষণ না করে সহজেই তা কানের সঙ্গে আটকে রাখতে পারেন।

ওই যন্ত্রসহ আটকের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর কার্যালয়ে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় হাসিবুলকে। তিনি জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজির (আইআইটি) ফরহাদ মাহমুদ ও পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শুভ নামের দুই ছাত্রের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকায় ওই যন্ত্র পেয়েছেন তিনি।

হাসিবুলের দাবি, ফরহাদের কাছে তিনি ‘প্রাইভেট’ পড়তেন। পরীক্ষার হলে প্রশ্নের উত্তর সরবরাহের জন্য তাদের মধ্যে পাঁচ লাখ টাকার চুক্তি হয়েছিল।

জিজ্ঞাসাবাদের পর প্রক্টর কার্যালয়ে বসা ভ্রাম্যামণ আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মৌসুমী মাহবুব দুই বছর কারাদণ্ড দেন হাসিবুলকে। পরে তাকে শাহবাগ থানা পুলিশের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়।

ম্যাজিস্ট্রেট মৌসুমী মাহবুব সাংবাদিকদের বলেন, পরীক্ষা চালকালে ‘প্রযুক্তির মাধ্যমে’ অন্যদের সহায়তা নেওয়ার অপরাধে পাবলিক পরীক্ষা অপরাধ আইনের ১৯৮০ এর ৯ (খ) ধারা অনুযায়ী হাসিবুলকে দুই বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর অধ্যাপক আমজাদ আলী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এ ঘটনায় জড়িত যে দুই ছাত্রের নাম এসেছে, তাদেরও আটকের চেষ্টা চলছে।”

শুক্রবার সকাল ১০টা থেকে সাড়ে ১১টা পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও বাইরের ৭৬টি কেন্দ্রে বিজ্ঞান অনুষদের অধীন ‘ক’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা হয়, যেখানে প্রতি আসনের বিপরীতে অংশ নেন ৪২ জন শিক্ষার্থী।

গতকাল আরো দুজনকে আটক করা হয়েছে। 'ক' ইউনিটের পরীক্ষা শেষে দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের সামনে থেকে তাদের আটক করা হয়। তাদের একজন মানিক শেখ। তিনি ঢাকা কলেজের মনোবিজ্ঞান বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী। আরেকজন বগুড়া থেকে আসা এক ভর্তীচ্ছু শিক্ষার্থী।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা শেষে বিকেলে তার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে 'ক' ইউনিটের পরীক্ষা দেওয়ার কথা ছিল। সেই পরীক্ষার উত্তরপত্র সরবরাহের জন্য মানিকের সঙ্গে তার এক লাখ টাকার চুক্তির কথা চলছিল। সে সময়ই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর এম আমজাদ আলী দুজনকে আটক করেন। পরে তাদের গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।য়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর অধ্যাপক আমজাদ আলী জানান।

এরা হলেন- জগন্নাথের ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থী উম্মে কুলসুম নার্গিস এবং ঢাকা কলেজের মনোবিজ্ঞান বিভাগের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী মানিক শেখ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণ থেকে আটক দুজনের মধ্যে মানিক নামের একজন ‘জালিয়াত চক্রের সদস্য’ বলে অধ্যাপক আমজাদ আলী জানান। তিনি বলেন, জগন্নাথের ভর্তিচ্ছু নার্গিস পরীক্ষার হলে প্রশ্নের উত্তর যোগানোর জন্য মানিকের সঙ্গে চুক্তি করছিলেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভর্তি পরীক্ষায় জালিয়াতচক্রের সঙ্গে জড়িত রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী, ছাত্রলীগের নেতাকর্মী ও কয়েকটি কোচিং সেন্টার। আটকের পর ভর্তীচ্ছু শিক্ষার্থীদের দেওয়া জবানবন্দি, গোয়েন্দা সংস্থা ও প্রশাসন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

Ads