খালিদের অকাল মৃত্যু'তে গোপালগঞ্জে শোকের ছায়া
১৯ মার্চ ২০২৪, ০২:৩১ পিএম
খালিদ
একসময় যে মানুষটার গান শোনা যেত বিভিন্ন পাড়া-মহল্লার নানা বয়সী মানুষের মুখে মুখে আর বাজত বিপণি বিতানছাড়াও চায়ের দোকানসহ বিভিন্ন দোকানে, সেই সাড়া জাগানো “চাইম ব্যান্ডের” সংগীত শিল্পী খালিদের অকাল মৃত্যুতে শোকাহত তার গ্রামের বাড়ী গোপালগঞ্জের সকল শ্রেনী-পেশার মানুষ।
সোমবার রাতে তার মৃত্যুর খবর গ্রামের বাড়ী গোপালগঞ্জে ছড়িয়ে পড়ার পর স্বজন-বাল্যবন্ধু-পাড়া-প্রতিবেশি-সহপাঠি-ভক্ত ও সাধারণ শ্রোতা দর্শকদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে।
১৯৮৩ সালে ”চাইম ব্যান্ডের” মাধ্যমে পুরোপুরিভাবে গানের জগতে আসা এই সংগীত শিল্পী খালিদ সরলতার প্রতিমা ‘যতটা মেঘ হলে বৃষ্টি নামে” ‘কোনো কারণেই ফেরানো গেল না তাকে’‘হয়নি যাবারও বেলা’‘যদি হিমালয় হয়ে দুঃখ আসে” ‘তুমি নেই তাই এমন অসংখ্য জনপ্রিয় গান গেয়ে সংগিত জগতে সাড়া ফেলেন।
দীর্ঘ সময়ের মিউজিক ক্যারিয়ারে অন্য শিল্পীদের তুলনায় কম গান করলেও খালিদের গাওয়া প্রতিটি গানই পেয়েছে জনপ্রিয়তা। এছাড়াও গত কয়েক দশকে যেসব শিল্পী মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিতে সুনাম কুড়িয়ে নিজেদের খ্যাতি ধরে রেখেছেন তার মধ্যে খালিদ অন্যতম।
২০২৩ সালের আগষ্ট মাসের শেষ দিকে গান ও স্টেজ শো নিয়ে ব্যস্ততা না থাকায় বেশ কিছুদিন যাবত বাল্যবন্ধুদের সাথে কাটিয়েছেন গ্রামের বাড়ী গোপালগঞ্জে। সে সময় চ্যানেলআইকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে ব্যক্তিগত জীবন ও সংগীত নিয়ে জানিয়েছেন অনেক অজানা কথা।
গানের জগতে আসার শুরুটা কিভাবে, এমন এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছিলেন, আমি তখন খুব ছোট, ক্লাস ওয়ানে পড়ি। ৭ ভাই বোনের মধ্যে আমি সবার ছোট। বাড়িতে ওস্তাদের কাছে গান শিখত আমার বড় ভাই- বোনেরা। ছোট হওয়ায় আমাকে তাদের গান শেখার কাছে যেতে দিত না। হঠাৎ একদিন আমার ভাই বোনদের গানের ক্লাস শেষ করে ওস্তাদ বেরিয়ে গেলেন। দরজা খোলা পেয়ে আমিও ভেতরে প্রবেশ করলাম। গিয়ে দেখলাম একটি হারমোনিয়াম। এরপর হারমোনিয়ামটার কাছে গিয়ে বেলো টান দিয়ে চাবিতে চাপ দিতেই দেখলাম বেজে উঠল। বাসার সবাইকে গিয়ে বললাম আমি গান শিখবো। হারমোনিয়াম আমি বাজিয়েছি। আমি পারবো। সেখান থেকেই গানের আগ্রহটা জন্ম নেয়। আমি মুলত গান গাওয়া শুরু করি ১৯৮১ সালে আর পুরোপুরিভাবে শুরু করি ৮৩ সালে ‘চাইম ব্যান্ডের মাধ্যমে।
নিজের গাওয়া গানের প্রথম অ্যালবাম কোনটি এমন এক প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন, আমার অস্তিত্ব হচ্ছে দুই ধরনের—একটা হচ্ছে চাইমের খালিদ, আরেকটা হচ্ছে ব্যক্তি খালিদ। আমার নিজের লেখা ও নিজের সুর দিয়ে গাওয়া প্রথম অ্যালবামটি বের হয়েছিল চাইম ব্যান্ডের অ্যালবামে” যার নাম দেওয়া হয়েছিল ‘চাইম। তাতে গান ছিল, ‘নাতি খাতি বেলা গেল’‘তুমি জানো নারে প্রিয়’‘কীর্তনখোলা নদী আমার, ‘এক ঘরেতে বসত কইরা. ‘ওই চোখ’‘সাতখানি মন বেজেছি আমরা’‘আমার জন্য রেখো একটা গানছাড়াও দুটি ইংরেজি গান। এরমধ্যে ‘নাতি খাতি বেলা গেল, এই গানটি লেখা ছিল যশোরের একজন কবি হাফিজুর রহমানের। সুর সংগ্রহ করা হয়েছিল অন্য জায়গা থেকে।
বেশ কিছুদিন ধরে গানের জগতের আড়ালে থাকার পরেও মানুষ গান শুনছে কিন্ত কেন, উত্তরে বলেছিলেন, নব্বইয়ের দশক বা তারপর পর্যন্ত আমাকে মিক্স মাস্টার বলা হতো। কারণ তখন মিক্স অ্যালবাম বের হলে কমপক্ষে আমার একটি গান সেই অ্যালবামে থাকত। আমি গান করার সময় অনেক সেক্রিফাইস করতাম। একটা গানের পেছনে অনেক কষ্ট করতাম। এ কারণেই হয়তো শ্রোতারা এখনো সেই গান শুনে। কেউ যদি একটি গান খেটে করে তাহলে অবশ্যই সেই গান হিট হবে। বর্তমান যে গানগুলো যত তাড়াতাড়ি হিট হয় ঠিক তত তাড়াতাড়ি আবার পড়েও যায়। কিন্তু আমার ‘সরলতার প্রতিমা, ‘কোন কারণে’ ‘হিমালয়’ ‘আকাশ নীলা, এখনো মানুষ শুনছে এবং এখন আরও বেশি হিট হচ্ছে। এছাড়াও যতদিন বাংলা ভাষা আছে, যতদিন বাংলা ভাষার মানুষ আছে, ততদিন খালিদের গান শুনবে শ্রোতারা ।
নতুন গানের ব্যস্ততা এখন কেমন, উত্তরে বলেছিলেন, নতুন গানের ব্যস্ততা নাই বললেই চলে। কয়েক বছর আগে সাউন্ডটেক-এর ব্যানারে ‘তুই বুঝলি না’ শিরোনামের একটি গান বের হয়েছে। এরপর আর কোনো গান বের হয়নি। তবে, নতুন একটা অ্যালবাম আসছে সেখানে, আমার গাওয়া দুইটা পুরোনো গান ও ৮টি নতুন গান গান থাকবে। সেই দুইটা গানের একটি গান আমি করব। এছাড়া তেমন কোনো ব্যস্ততা নেই।
নতুন শিল্পীদের নিয়ে কিছু বলতে চান কিনা, উত্তরে বলেছিলন, আমরাও তো মানুষ। আমাদেরকে নিয়ে তর্ক-বিতর্ক থাকতেই পারে। আমাদেরও তো শরীর, হাতে-পায়ে, কণ্ঠে মিসইউজ থাকতেই পারে। এটা অস্বাভাবিক কিছু না। বিতর্ক থাকাটাই স্বাভাবিক। এদের নিয়ে কিছু বলতে চাই না।
আপনি কি দেশে থাকেন নাকি বিদেশে থাকেন, উত্তরে বলেছিলেন, বর্তমান আমার পরিবার নিউইয়র্কে বসবাস করছে। সেখানে আমার ছেলে একটা স্কুলে পড়ছে। আমি কিছুদিনের জন্য বাংলাদেশে এসেছি আবার নিউইয়র্কে চলে যাব। নিউইয়র্কে সিটিজেনশিপ নেওয়ার খুব ইচ্ছা আছে।
সবশেষে, শ্রোতাদের জন্য খালি গলায় একটি গান শোনাতে চান কিনা, এরপর খালি গলায় একটি গান শোনান।
উল্লেখ থাকে যে, সোমবার ১৮ মার্চ সন্ধ্যা সোয়া ৭টার দিকে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ঢাকার গ্রিন রোডের কমফোর্ট হসপিটালে এই শিল্পী খালিদ ইন্তেকাল করেছেন।




































