স্কুল পড়ুয়া ইমরানের ফুলের চারা বিক্রি করে মাসে আয় লক্ষ টাকা
১৮ নভেম্বর ২০২৩, ১০:৪২ পিএম
ফুলপ্রেমী ইমরান আহাম্মেদ, বয়স-১৭, শরীয়তপুর সদর পৌরসভার ১নং ওয়ার্ডের শাবনুর মার্কেট এলাকায় তার বাসা। আবুল বাসার কাজী ও শিউলি আক্তার দম্পতির একমাএ ছেলে ইমরান আহাম্মেদ। ইমরান আহাম্মেদ মজিদ জরিনা ফাউন্ডেশন স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এবার এসএসসি পাশ করেন। তার পরিবারে সদস্য সংখ্যা ৪ জন। ভাই-বোনদের মধ্যে সে সবার ছোট। তার বড় বোন এবার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবে।
ইমরান আহাম্মেদ যখন চতুর্থ শ্রেনিতে পড়তেন তখন থেকেই তার ফুলগাছ রোপন করার ইচ্ছা জাগে। সেই থেকে বিভিন্ন যায়গা থেকে ফুল গাছ সংগ্রহ করে বাড়ির আঙ্গিনায় লাগাতে শুরু করেন এবং সপ্ন দেখতে শুরু করেন সে একদিন বড় ফুলের বাগান তৈরি করবেন।
ইমরান আহাম্মেদ যখন পঞ্চম শ্রেনিতে পড়তেন তখন বৃক্ষ মেলা থেকে ২৫০ টাকা দিয়ে একটি গোলাপ ফুলের চারা কিনেন। এরপর পরের বছর অর্থাৎ যখন ষষ্ঠ শ্রেনিতে অধ্যয়নকালে বৃক্ষমেলা থেকে নয়নতারা, হাসনাহেনা ও চায়না টগরের চারা কিনে আনেন। সেটি রোপনের পর এক সময় ওই গাছ থেকে ফুল ও বীজ হয়। অবশেষে বীজ রূপন করে চারা হয় এবং সেই চারাগাছে অসাধারণ ফুল ফোঁটে। তা দেখে সে আনন্দিত ও অনেক খুশি হয়। ইমরান এরপর থেকে ফুল বাগান তৈরি করার জন্য অনেক আগ্রহী হয়ে উঠেন।
বিশ্বব্যাপী করোনা মাহামারির ভয়ংকর রূপ ধারণের সময় ইমরান আহাম্মেদ যখন অষ্টম শ্রেনিতে পড়তেন। সেসময় সরকারীভাবে তখন চলাফেরায় সীমাব্ধতা নিয়ে আছে। যে কারণে লেখা-পড়ার সুবিধার্তে পরিবার থেকে তাকে অনলাইন ক্লাস করার জন্য একটি স্মার্টফোন কিনে দেওয়া হয়। মামা-ভাগ্নের খুনসুটিতে একদিন ইমরান আহাম্মেদের মামা এনায়েত হোসেন ফেসবুকের একটি ছাদবাগানের গ্রুপের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন তাকে। সেদিন থেকে ইমরান আহাম্মেদ সারাদেশের মানুষের চারা রোপনের ছবি দেখেন। সে সমস্ত দেখে তারও ফুল বাগান তৈরি করার আগ্রহ জম্মে।
এরপর ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতির চারা গাছ সংগ্রহের জন্য ফেসবুক গ্রুপের সাথে যুক্ত হয় সে। এরপর সংগ্রহে যায় পেয়েছেন সেগুলো দিয়ে তাদের বাড়ীর ছাদে শুরু করেন ফুলের বাগান।
ইমরান দেখেন- যেসব ফুল গাছের চারা সংগ্রহের জন্য ফেসবুক গ্রুপে যুক্ত হয়েছিলেন, দেখা যায় সেই সব গ্রুপে প্রচুর পরিমানে বিক্রি হচ্ছে তার সংগ্রহে থাকা একই রকম ফুলগাছও। তখন সে পরিকল্পনা নেয় তার সংগ্রহে থাকা বিভিন্ন রকমের ফুলের চারাগাছ অনলাইনে বিক্রি করার।
২০২১ সালের ৮ই জুন তার ব্যাক্তিগত ফেসবুক আইডি থেকে চারা বিক্রি করার জন্য একটি পোস্ট করেন। প্রথমে তেমন সারা না মিললেও পরবর্তীতে ধীরে ধীরে বিক্রি বাড়তে থাকে তার। প্রথমে ভিন্ন ভিন্ন প্রজাটির নয়টি নানা রংয়ের জবা ফুলের গাছ দিয়ে শুরু হয় অনলাইনে ফুল বিক্রি। ফুল বিক্রির পাশাপাশি চাষ বৃদ্ধির পরিকল্পনা নিয়ে ধীরে ধীরে এগোতে থাকেন ইমরান। ব্যাপকভাবে শুরু করেন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ফুলের চারা সংগ্রহের।
২০২২ সালের ১০ই জানুয়ারিতে ইমরান আহাম্মেদের শুরু হয় ভাগ্য পরিবর্তন। তার সংগ্রহে থাকা জবা ফুলের চারা পেতে নক করতে থাকেন ফুলপ্রেমী কাস্টমাররা। ইমরান বলেন, দামা-দামি ছাড়া তার নির্ধারণ করা প্রতিটি গাছের দাম ৩৪০টায় কিনছে গ্রাহকরা।
ফুলপ্রেমী গ্রাহকদের আগ্রহ দেখে ইমরান আহাম্মেদের নতুন পরিকল্পনা শুরু হয়, কিভাবে আরো নানান প্রজাতির ফুলের গাছ সংগ্রহ করা যায়। চেষ্টা চালিয়ে বার বার ব্যর্থ হচ্ছিলেন। তখন সে কিছুটা হতাশার মধ্যে পড়ে যান। কিন্তু সে দমে যাওয়ার ছেলে নয়, তাকে যেভাবে হোক পেতে হবে। শুরু করেন অনলাইনে সার্চ।
অনলাইনে সার্চ করতে করতে জানতে পারেন কিছু প্রজাতির চারা ইন্ডিয়াতে পাওয়া যাচ্ছে যা তার সংগ্রহে ছিলনা। তখন সে চেষ্টা করেন অনলাইনের মাধ্যমে ওই প্রজাতির কিছু চারা অর্ডার করতে। অবশেষে দীর্ঘ ৫ মাস পর ট্রপিক্যাল কালারের জবা ফুলের চারা সংগ্রহে পেতে সক্ষম হন। ইমরান আহাম্মেদ জানিয়েছেন তার বিভিন্ন প্রজাতির জবা ফুলের চারা গুলো ইন্ডিয়া থেকে সংগ্রহ করা।
ইমরান আহামেদ আনন্দের সাথে বলেন, আমি নিজেও কোনদিন ভাবিনি `ইন্ডিয়া থেকে বিভিন্ন প্রজাতির জবা ফুলের চারা এনে বাংলাদেশে বিক্রি করবো। আমি সফল হয়েছি, আমার চেষ্টার মাধ্যমে। তিনি আরো বলেন, অনলাইনে ব্যাপকভাবে চারা বিক্রি করার জন্য আমি নতুন একটি ফেইসবুকে ‘আল ইমরান নার্সারি’ নামে একটি ফেসবুক পেজ ওপেন করি। এ নামে আমি এখন অনেক পরিচিতি পেয়েছি।
অনলাইন ভিত্তিক নার্সারির মধ্যে আমার প্রতিষ্ঠান বিশ্বাসযোগ্য অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে বলে ইমরান বলেন, সারাদেশের মানুষ ‘আল ইমরান নার্সারি’ ফেসবুক পেইজে মেসেজ করে বিভিন্ন ধরনের জবা ফুলের চারা অর্ডার করছেন। বর্তমানে ৬৪টি জেলায় আমার জবা ফুলের চারা বিক্রি হয়েছে। তার সংগ্রহে মোট ৩০০টি প্রজাতি বা কালারের জবা ফুলের গাছ রয়েছে বলে জানান ইমরান।
প্রতিবেদকের কাছে ইমরান আরো বলেন, আমি ১ মাস ধরে বিদেশী ভালো এক প্রজাতির এডেনিয়াম নামের এক ফুলের চারা বিক্রি করা শুরু করেছি। আশাকরি খুব শিঘ্রই ভালো ফলাফল পাবো। তার লক্ষ্য দেশের সবচেয়ে বড় জবা ফুলের প্রজেক্ট করবে। এছাড়া জবা ফুল ব্যতীত এডেনিয়াম ও বাগান বিলাসের আরও দুইটি প্রজেক্ট খুব শিগগিরই গড়ে তুলবেন ইমরান।






























