যুক্তরাষ্ট্র-ভারত-চীনের সাথে ভারসাম্য নীতি
প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়া ও চীন যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
২০ জুন ২০২৬, ১১:৫০ এএম
দীর্ঘ প্রায় দেড় যুগের বৃত্ত ভেঙে বহুমাত্রিক ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও চীনের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী তিন বৃহৎ শক্তির সঙ্গে একই সাথে কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখার লক্ষ্য নিয়ে আগামীকাল থেকে নিজের প্রথম দ্বিপক্ষীয় সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মালয়েশিয়া ও চীন—এই দুই দেশে তার ৬ দিনের এই সফরকে দেশের অর্থনৈতিক কূটনীতির ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখছেন নীতিনির্ধারকরা।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় আমেরিকা, ভারত ও চীনের মতো পরস্পরবিরোধী ও প্রতিদ্বন্দ্বী তিন বৃহৎ শক্তির সঙ্গে একসঙ্গে ভারসাম্য বজায় রাখা বাংলাদেশের জন্য বেশ চ্যালেঞ্জিং। তবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সুদূরপ্রসারী ও কৌশলী কূটনৈতিক পদক্ষেপ যদি সফল হয়, তবে তা বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সার্বভৌমত্বকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
সরকার গঠনের পর প্রায় চার মাসের মাথায় প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম অর্থনৈতিক পরাশক্তি মালয়েশিয়াকে বেছে নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তার পরবর্তী গন্তব্য বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনৈতিক পরাশক্তি চীন। মালয়েশিয়া এবং চীন—এ দুই দেশে ছয় দিন ব্যস্ত সময় পার করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আগামীকাল রোববার দুপুরে একটি ফ্লাইটে প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়ার উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করবেন। সোমবার দিনভর সেখানে ব্যস্ত সময় পার করে ২২ জুন রাতেই তার চীনের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেওয়ার কথা রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বাংলাদেশের স্বার্থের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত এই দুটি দেশ সফরে স্বাক্ষর হতে পারে ১৩টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ)। এর মধ্যে কুয়ালালামপুরে জনশক্তি রপ্তানিসহ তিনটি এবং বেইজিংয়ে ১০টি এমওইউ স্বাক্ষর হওয়ার কথা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং সফরে অবকাঠামো, জ্বালানি, শিল্প পার্ক, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও অর্থায়নের মতো বিষয় প্রাধান্য পাচ্ছে। এসবের বাইরেও বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে মালয়েশিয়ায় তিনটি গুরুত্বপূর্ণ করপোরেট বৈঠক করবেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি চীনে অবকাঠামো ও শিল্প খাতের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈঠক হতে পারে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২২ জুন বিকেলে মালয়েশিয়া সফর শেষে সরাসরি চীনের একটি উপকূলীয় বন্দরনগরী দালিয়ানের উদ্দেশে রওনা দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সেখানে ২৩ জুন বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে তার বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে। পরে জলবায়ু এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পুনর্গঠন বিষয়ে উচ্চ পর্যায়ের আলোচনায় অংশ নেবেন তিনি। ২৪ জুন ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ১৭তম বার্ষিক সভায় অংশগ্রহণ করবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে বিশ্ব অর্থনীতি, বিনিয়োগ প্রবাহ, সবুজ অর্থনীতি এবং জলবায়ু পরিবর্তন isu প্রাধান্য পাবে। একই দিনে অবকাঠামো ও শিল্প খাতের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈঠক নির্ধারিত রয়েছে। চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন করপোরেশন, চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশন এবং চায়না মেশিনারি ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশনের प्रतिनिधियों সঙ্গে রেলপথ, সেতু, বিদ্যুৎ এবং শিল্পায়ন প্রকল্পে বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হবে ২৬ জুন। ওই দিন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বসবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রথম দুটি সফরের দেশ নির্বাচনই স্পষ্ট করে দেয় যে, বর্তমান সরকার তার বৈদেশিক নীতিতে এক বড় ধরনের ভারসাম্য আনতে যাচ্ছে। বেইজিং সফরকালে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামোগত উন্নয়ন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হতে পারে।
নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে তিনটি স্তম্ভের ওপর। সেগুলো হচ্ছে—পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত সহায়তা, শ্রমবাজারের প্রসার এবং অবাধ ও সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক পরিবেশের ধারাবাহিকতা রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ককে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দেশের বৃহৎ অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়ন এবং অর্থনৈতিক অঞ্চলের বিকাশে চীনের বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতাকে কাজে লাগাতে চায় ঢাকা। ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা এবং ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক কারণে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে ট্রানজিট, তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন এবং সীমান্ত সুরক্ষার মতো সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে বদ্ধপরিকর সরকার।
জানা গেছে, চীন সফর সফলভাবে সমাপ্ত করার পরপরই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রতিবেশী ভারত সফরে যেতে পারেন। এরপর জাপান কিংবা তুরস্ক অথবা অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ মিত্র দেশে দ্বিপক্ষীয় সফরে অংশ নেবেন। বিশ্লেষকদের মতে, বেইজিং সফরের ঠিক পরপরই নয়াদিল্লি বা ওয়াশিংটনের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করার কৌশলটিই মূলত একটি বার্তা। বাংলাদেশ যে কোনো একটি পরাশক্তির দিকে ঝুঁকে নেই, বরং জাতীয় স্বার্থকে সবার ওপরে রেখে প্রতিটি দেশের সঙ্গেই সমমর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়তে চায়—এই বার্তাই বিশ্বমঞ্চে দিতে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর হিসেবে মালয়েশিয়া এবং পরে চীন সফর বাংলাদেশের নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতির একটি তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা বহন করে। তাছাড়া এই সফরগুলোতে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ, শ্রমবাজার এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় আমেরিকা, ভারত ও চীনের মতো পরস্পরবিরোধী ও প্রতিদ্বন্দ্বী তিন পরাশক্তির সঙ্গে একসঙ্গে ভারসাম্য বজায় রাখা বাংলাদেশের জন্য বেশ চ্যালেঞ্জিং হলেও দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় এই বহুমাত্রিক ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।




































