ব্যবসায় নৈতিকতা: ইসলামের নির্দেশনা ও আমাদের দায়িত্ব

মোঃ আরিফ উল্লাহ

০১ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৮:১০ পিএম


ব্যবসায় নৈতিকতা: ইসলামের নির্দেশনা ও আমাদের দায়িত্ব

 

সলাম ধর্মে ব্যবসাকে হালাল করেছে এবং এটি উপার্জনের সর্বোত্তম মাধ্যম হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। ইসলামে ব্যবসার সংজ্ঞা খুবই সহজ ও প্রাঞ্জল। ব্যবসা হচ্ছে এমন একটি লেনদেন যেখানে ক্রেতা ও বিক্রেতার সম্মতি থাকে এবং যেখানে মিথ্যা, ভেজাল, অবৈধ মজুদ, কিংবা বাড়তি লাভের কোনো জায়গা নেই। কুরআনের সূরা নিসা-এর ২৯ নং আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওতায়ালা বলেন: "হে ঈমানদারগণ! তোমরা একে অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না। শুধু তোমাদের পরস্পরের সম্মতিক্রমে যে ব্যবসা করো তাই শুধু বৈধ।"

কিন্তু আমাদের দেশের ব্যবসা খাতের বাস্তবতা ইসলামী নীতিমালার বিপরীত। ব্যবসায়ীদের একটি বড় অংশ নিজেদের মুনাফার পেছনে এতটাই ব্যস্ত যে সমাজের প্রতি তাদের নৈতিক দায়িত্ব প্রায় ভুলতে বসেছে। সিন্ডিকেট তৈরি, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, ভেজাল পণ্য সরবরাহ, এবং অতিরিক্ত মূল্য নির্ধারণ—এসব নীতিহীন কাজ সাধারণ মানুষের জীবনকে অসহনীয় করে তুলেছে।

বিশেষ করে পবিত্র রমজান মাসে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী মুনাফার লোভে পণ্য মজুদ করে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করেন। তাদের কারণে প্রতিটি নিত্যপণ্যের দাম আকাশচুম্বী হয়ে যায়। অনেক খেটে খাওয়া মানুষ পরিবারের মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণ করতে পারেন না। এমনকি অনেক পরিবার ইফতারে দুইটি খেজুর জোটাতে হিমশিম খায়। শিশুদের জন্য নতুন পোশাক কেনা বা ঈদের দিন মিষ্টি খাওয়ানোর সামর্থ্য থাকে না। এর ফলে একটি বিশাল অংশ মানবিক সংকটের মধ্যে পড়ে।
রসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, "যে প্রতারণা করে, সে আমার উম্মত নয়।" (সহিহ মুসলিম, হাদিস ১০২)।

অন্য এক হাদিসে এসেছে: "জঘন্য অপরাধী ছাড়া কেউ-ই নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি (মূল্য বৃদ্ধির আশায়) মজুত করে না।" (আবু দাউদ শরিফ, হাদিস ৩৪৪৭)

বর্তমান সময়ে মুসলিম দেশগুলো রমজান উপলক্ষে পণ্যের মূল্য কমিয়ে প্রতিযোগিতা করে, যাতে গরিব মানুষেরাও এই মাসে শান্তিতে ইবাদত করতে পারে। কিন্তু আমাদের দেশের কিছু অসাধু ব্যবসায়ী উল্টো পথে হাঁটে। উদাহরণস্বরূপ, ৫০০ টাকার পণ্যে ১২০০ টাকার নকল স্টিকার লাগিয়ে ৩০০ টাকা ছাড় দিয়ে সেটি ৯০০ টাকায় বিক্রি করা হয়। এমনকি অনেক ক্ষেত্রেই ভেজাল পণ্য সরবরাহের প্রবণতা দেখা যায়।

সরকার বাজার মনিটরিং ও সিন্ডিকেট ভাঙার জন্য কিছু উদ্যোগ নিলেও এর ফলাফল তেমন কার্যকর হয়নি। বাজার ব্যবস্থাপনায় নতুন পদ্ধতির প্রবর্তন ছাড়া পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়। তবে বাস্তবতা হলো, সরকারের হস্তক্ষেপের বাইরে ব্যবসায়ীদের নৈতিকতা ও মানবিকতার অভ্যাস তৈরিই একমাত্র স্থায়ী সমাধান।
ব্যবসায়ীদের প্রতি আমার আন্তরিক আহ্বান, তারা যেন ইসলামের নীতিমালার প্রতি বিশ্বস্ত থেকে ব্যবসা পরিচালনা করেন। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে সমাজের প্রতি তাদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হন। ব্যবসায় সৎ আচরণ করলে শুধু আখিরাতে নয়, দুনিয়ার জীবনেও তারা সুনাম ও বরকত পাবেন।

ইসলামের দৃষ্টিতে ব্যবসায়ীদের শুধুমাত্র মুনাফা নয়, বরং সমাজের কল্যাণেও কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করে। যারা পণ্য মজুদ করে মূল্য বৃদ্ধি করেন, তাদের জন্য কঠিন শাস্তির কথা উল্লেখ রয়েছে। ব্যবসা একটি ইবাদত হতে পারে যদি তা সৎভাবে পরিচালিত হয়। ব্যবসায়ী হিসেবে আমাদের নৈতিক দায়িত্ব হলো, এমন একটি সমাজ গড়ে তোলা যেখানে কোনো পরিবারকে ক্ষুধার্ত থাকতে না হয়।

অন্যদিকে, উন্নত ব্যবসার নীতিমালা অনুসরণ করলে ব্যবসায়ীরা শুধু নিজেরাই লাভবান হবেন না, বরং পুরো সমাজ উন্নতির দিকে ধাবিত হবে। প্রফেসর মোহাম্মদ ইউনুসের মতো উদ্যোক্তারা যেভাবে ক্ষুদ্র ব্যবসায় অর্থায়নের মাধ্যমে লাখো মানুষের জীবন বদলে দিয়েছেন, সেভাবেও আমাদের ব্যবসায়ীদের এগিয়ে আসা উচিত। ব্যবসা যদি নৈতিকতার ভিত্তিতে পরিচালিত হয়, তাহলে সমাজে বৈষম্য কমে যাবে এবং সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি হবে।

বর্তমান সময়ে, নৈতিকতা ছাড়া ব্যবসা শুধু সমাজের দুর্দশা বাড়ায়। ব্যবসায়িক সাফল্যের জন্য ক্রেতাদের আস্থা অর্জন করা জরুরি। ব্যবসায়ীরা যদি তাদের পণ্যের গুণগত মান বজায় রাখেন এবং ন্যায্য মূল্যে তা সরবরাহ করেন, তাহলে ক্রেতারা তাদের প্রতি অনুগত থাকবে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসায়ীরা আরও সফল হবেন।
ব্যবসায়ী সমাজ হলো একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম স্তম্ভ। তাদের মধ্যে নৈতিকতা, সততা, এবং মানবিকতার চর্চা থাকলে পুরো সমাজ উপকৃত হবে। আমরা যদি ব্যবসাকে ইসলামের নীতিমালা অনুযায়ী পরিচালিত করি, তাহলে তা শুধু ব্যক্তি বা সমাজ নয়, বরং পুরো জাতির জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে।

 

লেখক-
মোঃ আরিফ উল্লাহ
গবেষক ও উন্নয়ন কর্মী

 

বিদ্রঃ লেখাটি সম্পূর্ণ লেখেকের মতামত।

 

Ads