ভোলার গ্যাসে কমতে পারে এলএনজি আমদানিনির্ভরতা

নিজস্ব প্রতিবেদক

০৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:০২ পিএম


ভোলার গ্যাসে কমতে পারে এলএনজি আমদানিনির্ভরতা

ছবি: সংগৃহীত

দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন চাহিদার তুলনায় কম থাকায় আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ওপর বাংলাদেশের নির্ভরতা বাড়ছে। এ অবস্থায় ভোলার শাহবাজপুর, ভোলা নর্থ ও ইলিশা গ্যাসক্ষেত্রের মজুতকে জাতীয় জ্বালানি সরবরাহে কাজে লাগানোর উদ্যোগকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

তিনটি গ্যাসক্ষেত্রে আনুমানিক ২ দশমিক ০৪৭ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) গ্যাসের মজুত রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১ দশমিক ৪৩ টিসিএফ গ্যাস উত্তোলনযোগ্য বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে বাণিজ্যিকভাবে কতটুকু গ্যাস উত্তোলন করা সম্ভব, তা নির্ধারণে আরও কূপ খনন ও উৎপাদন পরীক্ষা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

বাংলাদেশে অবশিষ্ট উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুত প্রায় ৭ দশমিক ৬৩ টিসিএফ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। সে হিসাবে ভোলার মজুত দেশের অবশিষ্ট দেশীয় গ্যাসসম্পদের প্রায় এক-পঞ্চমাংশের সমান।

তবে ভোলার গ্যাসের ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ মাটির নিচে মজুতের পরিমাণ নয়, বরং উৎপাদিত গ্যাস জাতীয় গ্রিড ও ভোক্তাদের কাছে পৌঁছানো।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি (বাপেক্স) জানিয়েছে, ভোলার নয়টি কূপ থেকে দৈনিক প্রায় ১৮২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে বর্তমানে প্রায় ৭৫ মিলিয়ন ঘনফুট ব্যবহার করা হচ্ছে। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে আরও প্রায় ৪৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস অব্যবহৃত থাকছে।

ভোলা নর্থ-১, ভোলা নর্থ-২ ও ইলিশা-১ কূপ থেকে অতিরিক্ত ৬০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদনের জন্য একটি গ্যাস প্রক্রিয়াজাতকরণ প্ল্যান্ট স্থাপনের কাজ চলছে। প্রকল্পটি ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

এর পাশাপাশি ভোলায় আরও পাঁচটি কূপ খননের পরিকল্পনাও রয়েছে। নতুন কূপগুলো থেকে উৎপাদন শুরু হলে ভোলার গ্যাস জাতীয় জ্বালানি সরবরাহে আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার বিষয়টিও বিবেচনা করছে সরকার। এ জন্য ভোলা-বরিশাল গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন নির্মাণের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা শেষ হয়েছে। পরবর্তী সময়ে ভোলা-বরিশাল-খুলনা রুটের মাধ্যমে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গ্যাস নেটওয়ার্কের সঙ্গে ভোলাকে যুক্ত করার পরিকল্পনাও বিবেচনায় রয়েছে।

দেশীয় গ্যাস উৎপাদন চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে না পারায় বর্তমানে এলএনজি আমদানি করে ঘাটতি পূরণ করতে হচ্ছে। গত ১৫ সেপ্টেম্বর জাতীয় গ্রিডে প্রায় ২ হাজার ৬০৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে আসে প্রায় ১ হাজার ৬১৫ থেকে ১ হাজার ৬২০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং আমদানি করা এলএনজি থেকে প্রায় ৯৯০ মিলিয়ন ঘনফুট।

এলএনজি সরবরাহ অব্যাহত রাখতে পেট্রোবাংলা অক্টোবর ও নভেম্বরের জন্য ১৯টি কার্গো নিশ্চিত করেছে। এর মধ্যে অক্টোবরে ১০টি এবং নভেম্বরে নয়টি কার্গো রয়েছে।

আমদানি করা এলএনজির ওপর নির্ভরতার আর্থিক চাপও বাড়ছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে এলএনজি ভর্তুকি বাবদ সরকার প্রায় ১০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ছাড় করেছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

এ অবস্থায় ভোলার অব্যবহৃত গ্যাস উৎপাদন ও জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা গেলে আমদানিনির্ভরতার ওপর কিছুটা চাপ কমানো সম্ভব হতে পারে। তবে গ্যাসের সর্বোচ্চ অর্থনৈতিক ব্যবহার নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

ভোলার গ্যাস বিদ্যুৎ উৎপাদন, সার কারখানা এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ব্যবহার করা যেতে পারে। একই সঙ্গে ভোলা ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে শিল্পায়ন বাড়াতে গ্যাসের সরবরাহ কাজে লাগানোর সম্ভাবনাও রয়েছে। ভোলায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের বিষয়টিও ২০২৬ সালে বিবেচনা করা হচ্ছে।

তবে গ্যাসভিত্তিক শিল্প ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো গড়ে তুলতে সড়ক, বন্দর, বিদ্যুৎ, পানি, আবাসন ও দক্ষ জনবলের মতো সহায়ক অবকাঠামোও প্রয়োজন হবে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের পরিমাণ নিশ্চিত হওয়ার আগে বড় ধরনের অবকাঠামো বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই মজুত নির্ধারণ, উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সঞ্চালন অবকাঠামোর উন্নয়নকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।

ভোলার গ্যাসের গুরুত্ব তাই শুধু ভূগর্ভে থাকা গ্যাসের পরিমাণে সীমাবদ্ধ নয়। উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের পর দ্রুত সেই গ্যাস জাতীয় গ্রিডে পৌঁছে শিল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও অর্থনীতিতে কাজে লাগানোই এখন বড় বিষয়।

এলএনজি আমদানি জাতীয় জ্বালানি সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে থাকায় ভোলার অব্যবহৃত গ্যাস উৎপাদনে আনা গেলে দেশীয় সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি আমদানিনির্ভরতার ওপরও কিছুটা চাপ কমানো সম্ভব হতে পারে।

Ads