''সচেতন হই, ডেঙ্গু মোকাবিলা করি''

প্রতিদিনেরচিত্র ডেস্ক

১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০৪:৩৫ পিএম


''সচেতন হই, ডেঙ্গু মোকাবিলা করি''

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংজ্ঞা অনুযায়ী, জ্বরের সঙ্গে প্লাটিলেট কাউন্ট এক লাখের কম ও রক্তে হিমাটোক্রিট ২০ শতাংশ কমবেশি হলে সেটা ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার, এর সঙ্গে রক্তনালি লিকের (প্লাজমা লিকেজ) উপসর্গ—যেমন প্রোটিন কমা, পেটে বা ফুসফুসে পানি জমার মতো উপসর্গ থাকতে পারে।

বর্তমান সময়ে ডেঙ্গু এক মহামারীর নাম। ৮০ শতকের কথা। কলেরার ছোবল দেখেছি দুর থেকে, আমার বয়স তখন ৬/৭ বছর হবে। এক গ্রাম পরে আমার তৃতীয় খালার বাড়ি। আমার মায়েরা সাত বোন, মা হলেন ৬ষ্ঠ। কলেরায় খালার শাশুড়ি তিন সন্তান না ফেরার দেশে। উনাদের বাড়িতে এমন অনেক পরিবারেই,,, "ইয়া আল্লাহ্‌ তুমি আমাদের রক্ষা করো, আমাদের এমন মহামারী মোকাবিলা করার শক্তি দাও, সাহস দাও, এই আজাব থেকে মুক্তি দাও।"

আমার বারান্দায় পনেরোটার মতো গাছ আছে। শাক আর ফুল গাছ। শুধু মাত্র একটু সবুজের স্পর্শ পেতেই এই গাছ লাগানো। প্রতিদিন গাছে আমিই পানি দিই, টবে কোন পানি জমা থাকে না। আমি টব রাখার জন্যে লোহার খাঁচকাটা বেঞ্চি বানিয়ে নিয়েছি যেন ফ্লোরে টব না রাখতে হয়।  আমার ঘরের ফ্রিজের পানি পড়ার পাত্রটি আমি নিজেই প্রতিদিন পানি ফেলে দিই। আমার ঘরের এসির পানি একটা বালতিতে পড়ে যা প্রতিদিন দুইবার ফেলে দিই। আমার বারান্দার একটা অংশ হালকা ঢালু, আমি প্রতিদিন বুয়াকে দিয়ে বারান্দা মুছিয়ে শুকনো করে রাখি। তিন ওয়াশরুমে তিনটি বালতিতে পানি রাখা যা ঢাকনা দেয়া। তবুও আমি প্রতিদিন সেই পানি ব্যবহার করাই, এবং নতুন পানি রাখি। তবুও প্রতিদিন মশার ওষুধ ঘরে ছিটাই।  এটা আমার ব্যক্তিগত উদ্যোগ, নিজেকে ভালো রাখার পরিবারকে সুস্থ রাখার সচেতনতা। 

অভ্র নবম শ্রেনীতে পড়ে, স্কুলে যায় রোজ। সাপ্তাহে তিনদিন ইংরেজি পড়ত যায়, আর একদিন আর্ট একাডেমিতে আর্ট শিখতে। মঙ্গলবার আর্ট ক্লাস করে বাসায় এসে বলেছে, আর্ট ক্লাসে ওকে মশা কামড় দিয়েছে। আমি সাথে সাথেই কর্তৃপক্ষকে কল করে ব্যবস্থা নিতে বলি। সামনের ক্লাসে ব্যবস্থা নেওয়া না দেখলে আমি থানায় কল দিবো, নইলে ৯৯৯ কল দিবো। ইংরেজি স্যারের রুম অনেক পরিস্কার পরিচ্ছন্ন এসি রুম। তিনি সব বিষয়ে সতর্ক আছেন উনি ডেঙ্গু সচেতনতা নিয়ে ছোট নির্দেশাবলী লিখে সবাইকে দিয়েছেন। ইংরেজি স্যারের রুম তৃতীয় তালায়। অভ্রকে আনতে যাই আমি, ছুটি হওয়ার সময় হয়েছে বলে উপরে না উঠে নিচে দাঁড়াই। গরম লাগছে বলে দুই অভিভাবক সহ নিচতলার একটা রুমে ( যে রুমে অন্য বাচ্চারা কোচিং করে) লাইট ফ্যান ছেড়ে একটু বসতে যাই। ফ্যান দেয়ার পর ১০'/১০' (দশ ফিট বাই দশ ফিট) রুমে প্রায় ৪০/৫০ মশা উড়তে থাকে। দ্রুত লাইট ফ্যান বন্ধ করে বেরিয়ে আসি। পাশের রুমে একজন শিক্ষক ১০/১২ জন শিক্ষার্থীকে পড়াচ্ছেন। উনাকে জানালাম, উনি বললেন, "অফিস রুমে জানান।" 

অফিস রুমে গেলাম, যা কথা হলো-

আপনাদের ক্লাসরুমগুলোতে অনেক মশা দেখছি। 

তাই নাকি?

জ্বী, কি ব্যবস্থা নিয়েছেন এই ডেঙ্গু মহামারীতে ।

দেখছি, কি করা যায়।

দ্রুত ব্যবস্থা নিন। আজই এখুনিই।

এটা ৩১ জুলাইয়ের কথা। আমি ৩ আগষ্ট আবার সেখানে যাবো, দেখবো উনারা কি ব্যবস্থা নিয়েছেন। ব্যবস্থা না নিলে সরাসরি থানায় বা ৯৯৯ কল করে অভিযোগ করবো। আমি মনে করি এটা আমার নৈতিক দায়িত্ব। 

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় ডেঙ্গু জ্বরের প্রকোপ অতীতে যে কোন সময়ের তুলনায় বেশি। ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে গত দুই সপ্তাহে অন্তত আটজন মারা গেছেন, যাদের মধ্যে চিকিৎসকও আছেন। স্বাভাবিকভাবেই ডেঙ্গু জ্বর নিয়ে মানুষের মাঝে প্রবল উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সাধারণভাবে ডেঙ্গুর লক্ষণ হচ্ছে জ্বর। ১০১ ডিগ্রি থেকে ১০২ ডিগ্রি তাপমাত্রা থাকতে পারে। জ্বর একটানা থাকতে পারে, আবার ঘাম দিয়ে জ্বর ছেড়ে দেবার পর আবারো জ্বর আসতে পারে। এর সাথে শরীরে ব্যথা মাথাব্যথা, চেখের পেছনে ব্যথা এবং চামড়ায় লালচে দাগ (র‍্যাশ) হতে পারে। তবে এগুলো না থাকলেও ডেঙ্গু হতে পারে।( তথ্যসূত্র : বিবিসি বাংলা; ২৬ জুলাই, ২০১৯)

ল্যাবএইড জেনারেল হাসপাতাল এর মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, অধ্যাপক ডা. খাজা নাজিমুদ্দিন নিজের লেখায় জানান- 

"২০০০ সালে একজন অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞর আক্রান্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে রাজধানীতে ডেঙ্গুর আত্মপ্রকাশ। তাঁর প্রচণ্ড পেটব্যথাকে অ্যাপেন্ডিসাইটিস ভেবে অস্ত্রোপচার করার সময় সার্জন বিস্মিত হয়ে দেখেন যে পেটের ভেতরে রক্ত। তাঁর মৃত্যুর এক সপ্তাহের মধ্যে মারা যান একজন ডেন্টিস্ট। এরপরই নতুন এ রোগের প্রাদুর্ভাব নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েন চিকিৎসকেরা। ২০০০ সালে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ছিল সাড়ে পাঁচ হাজারের মতো, মারা যায় ৯৩ জন। সেবার ডেঙ্গু বিষয়ে সবার অভিজ্ঞতা ছিল কম, এমনকি দু–একটি হাসপাতাল ছাড়া পরীক্ষাও হতো না এর। যেকোনো ভাইরাসজনিত জ্বরের মতো ডেঙ্গুতেও জ্বরের সঙ্গে মাথাব্যথা, কাশি, গলাব্যথা গা–ব্যথা থাকে। বিশেষত্ব হলো যে এই ব্যথা হাড়ে হাড়ে অনুভূত হয়। মাথাব্যথার তীব্রতা চোখের পেছনে বেশি (রেট্রোঅরবিটাল); চোখ ঘোরালে বা আই মুভমেন্টে ব্যথা বাড়ে। তবে ক্ষুধামান্দ্য বমি ভাব থাকে। দেহের বিভিন্ন জায়গায় রক্তক্ষরণ ডেঙ্গুকে অন্য রোগ থেকে আলাদা করেছে। এবারে ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার বেশি হচ্ছে। প্রাকৃতিক নিয়মেই দ্বিতীয় বা তৃতীয়বার ডেঙ্গু হলে তা হেমোরেজিক ফিভারে মোড় নেয়। যেহেতু আমাদের দেশে ডেঙ্গু শুরু হয়েছে ২০০০ সাল থেকে, তার মানে অনেকেই দ্বিতীয় বা তৃতীয়বারের মতো আক্রান্ত হয়েছে এবার। এবার তাই ডেঙ্গু ক্ল্যাসিক্যাল ডেঙ্গুর মতো কেবল জ্বর বা মাথাব্যথা নিয়ে নয়, সরাসরি হেমোরেজিক ফিভার গ্রেড-২–এর উপসর্গগুলো নিয়েই আসছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে রক্ত পরীক্ষায় প্লাটিলেট ২০ হাজারের নিচে নেমে গেছে।"

অধ্যাপক ডা. খাজা নাজিমুদ্দিন আরো লিখেন- 

"জ্বরের প্রথম থেকেই প্রচুর পরিমাণে পানি ও তরল পান করুন। খাওয়ার স্যালাইন, ডাবের পানি, ফলের রস, ফল ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত করুন। বয়স্ক ব্যক্তিদের দৈনিক তিন লিটার পানি পান করা উচিত। তাপমাত্রা কমানোর জন্য প্যারাসিটামল ছাড়া অন্য কোনো ওষুধ ব্যবহার করা যাবে না। দিনে চারবার প্যারাসিটামল দিতে পারবেন। জ্বর চলে যাওয়ার পর থেকে সতর্কতা অবলম্বন করুন। জ্বরের ছয়, সাত, আট দিনের মাথায় ক্রিটিক্যাল ফেজ শুরু হয়। এ সময় নিয়মিত রক্তচাপ, নাড়িস্পন্দন মাপুন, প্রয়োজনে চার ঘণ্টা পরপর। পালস প্রেশার অবশ্যই ২০–এর বেশি থাকা উচিত। প্রস্রাব ঠিকমতো হচ্ছে কি না, খেয়াল রাখুন। রোগী সম্পূর্ণ সচেতন আছে কি না বা অসংলগ্ন আচরণ করছে কি না, লক্ষ করুন। যেকোনো রোগীর হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন নেই। ক্ল্যাসিক্যাল ও গ্রেড–১ হেমোরেজিক ডেঙ্গু বাড়িতেই চিকিৎসা করা সম্ভব। গ্রেড–২ হেমোরেজিক ফিভারে অতিরিক্ত সতর্কতা চাই, সতর্কসংকেত না থাকলে বাড়িতেই রাখতে পারেন। তবে গ্রেড–৩ ও ৪ হেমোরেজিক ফিভারের রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে স্থানান্তর করতে হবে। এমন হাসপাতালে যাবেন, যেখানে ফ্লুইড মনিটরিং করা সহজ। ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম দিনে ঠিকমতো ফ্লুইড দিতে পারাটাই মূল চিকিৎসা। রোগী শকে চলে গেলে নিবিড় পরিচর্যা বা আইসিইউ লাগবে। রক্তক্ষরণ হলে যদি রক্তচাপ কমে যায়, নাড়িস্পন্দন দ্রুত হয়, হিমগ্লোবিন ১০–এর নিচে নেমে আসে, হিমাটোক্রিট কমে, তবেই রক্ত দিতে হয়। রক্তক্ষরণ আর রক্তনালির লিকিং মারাত্মক ডেঙ্গুর মূল কারণ। লিকিংয়ের জন্য ফুসফুসে, পেটে পানি জমতে পারে, বিশেষ করে ক্রিটিক্যাল পর্যায়ে। স্যালাইন বা পানির চুলচেরা হিসাব রাখতে হবে দিনে কয়েকবার রোগীর পালস, প্রেশার দেখে। ( তথ্যসূত্র : দৈনিক প্রথম আলো; ৩১ জুলাই ২০১৯)

প্রিয় পাঠক লেখাটার ঠিক সময়ে তেজগাঁও গার্লস স্কুলের কয়েকজন শিক্ষার্থীরা আসে বাসায়। কারো বাসায় ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী আছে কিনা তা তারা লিখে নিবে। স্কুল থেকে ওদেরকে পাঠিয়েছে। আর এই তথ্য নিতে বলেছে নাকি সরকার থেকে। আমি ওদেরকে প্রশ্ন করি-

তোমাদের এলাকায় কবে মশার ওষুধ দিয়েছে জানো কি? ওরা জানে না বলল। মশার ওষুধ দেয়ার খবর নেই রোগীর লিস্ট দিয়ে কি হবে। বিগত ২৫ দিন আগে আমার এলাকায় একবার আর গত ৪/৫ দিন আগে একবার খুবই অল্প পরিমানে ওষুধের গন্ধ পাই। এই মহামারিতে যেখানে একদিন পর পর ওষুধ ছিটানো দরকার সেখানে ২০ দিন পর দিয়ে যায় হাওয়া। শিক্ষার্থীদের সাথে একজন স্যার এসেছেন, উনাকে জিজ্ঞেস করায় বললেন, উনাদের স্কুলে ৩/৪ দিন আগেও দিয়েছে। একই জায়গায় বসলে আমরা মায়েরা অনেক বিষয়েই কথা বলি। ৩০ জুলাই ১০/১২ জন মায়েরা একসাথে বসা কার এলাকায় কবে মশার ওষুধ ছিটানো হয়েছে জিজ্ঞেস করায় দুজন বলল, কবে একবার গন্ধ পেয়েছে। কেউ কেউ বললেন, এই বয়সেও গন্ধ পানিনি। কেউ কেউ বললেন বছরে হয়তো একবার পেয়েছেন। আমি জানিনা সিটি কর্পোরেশন এখন যে ওষুধ ছিটাচ্ছেন তার আসলেই গন্ধ আছে কিনা। নাকি সেই ওষুধকে ডিজিটালাইজড করে গন্ধ বিহীন করেছেন। হয়তো সে কারনেই কেউ গন্ধ পান না। অবশ্য মশা মারার কামানের শব্দতো ঠিক পাওয়ার কথা। 

পরিশেষে কথা হলো যে কোন মহামারি মোকাবিলা করতে হয় সবাই মিলে। আমি আমার ঘরকে পরিস্কার রাখবো। রাস্তা পরিস্কার রাখবো ময়লা না ফেলে। কিন্তু রাস্তার মশা রাস্তার পানি তো আমি রাখিনি। বর্ষার মৌসুম, থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। গর্ত, পুরানো জিনিসপত্রে পানি জমছে, সেখানে মশা হচ্ছে। সেগুলো পরিস্কার করার দায়িত্ব সরকারের বা সিটি কর্পোরেশনের। দেশে আমদানি করা মশার ওষুধ কই যায়, নিশ্চই কয়েল কোম্পানিরা ওষুধের ব্যবসা নতুন করে শুরু করেন নি। সংবাদে বলছে সামনের মাসে আরো বেশি আক্রমণ হতে পারে মানুষ। তাই এই মহামারি বন্ধ করতে ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা যেমন বাড়াতে হবে তেমনি ওষুধ ছিটাতে হবে প্রতি একদিন পর পর। ঘরের পাশাপাশি বাইরে অনিয়ম দেখলে অসচেতনতা দেখলে নিজেকেই বলতে হবে। প্রতিবাদ নয়, সচেতন করে তুলতে হবে সবাইকে।

লেখক- সাহিত্যিক কলামিস্ট ও প্রাবন্ধিক।

Ads