সন্তানের সাথে বাবার সম্পর্ক সম্পূর্ণ অকৃত্রিম
১৫ জুন ২০১৯, ০৪:৪৫ পিএম
মানুষের প্রয়োজনেই তৈরী হলো পরিবার, আর পরিবার থেকে বিনির্মাণ হলো সমাজ। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পরিবার ও সমাজ ব্যবস্থার স্বরূপ ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। ভাব প্রকাশের ভাষা, পোশাাক ও সংস্কৃতি আলাদা হতে পারে। কিন্তু পরিবার তথা সমাজ ব্যবস্থার মূল কাঠামো কিন্তু প্রায় একই রকম। বাবা-মা, ভাই-বোন ছাড়াও পুরাতন কিছু সদস্য নিয়েই তো পরিবার। তবে বর্তমানে কিছু যৌক্তিক কারণে পরিবারের পুরাতন সদস্যগুলোকে আলাদা বা দূরে রাখারও সংস্কৃতি চালু হয়েছে। যাক সে সব। বলছিলাম-সন্তানের সাথে বাবার সম্পর্ক সম্পূর্ণ অকৃত্রিম। শিশুর জন্মের পর থেকেই হৃদয় নিংড়ানো শতভাগ ভালোবাসা ও আত্মীক সম্পর্ক এক উঁচু মাত্রায় বহমান। সন্তানের সাথে বাবার এ সম্পর্ক দিন দিন গভীর থেকে গভীরতর হয়ে ওঠে যৌক্তিক কারণেই।
আমাদের সমাজে মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের কদর একটু হলেও বেশি। এটা পরিবার থেকেই শুরু হয়। এই রেওয়াজ চলে আসছে বহুদিন যাবৎ। পরিবারের অন্য সদস্যরাও তা অকপটে মেনে নিয়েছে। কিন্তু এসব নিয়ে ভাই-বোনেরা কী চিন্তা করতো কখনো? অথচ বর্তমানে ছেলেরা যেমন সচেতন মেয়েরাও কম কিসে? তবে সাধারণ পরিবারে ছেলেদের’কে বাবা’য় এবং ‘মা’ মেয়েদের’কে বেশি আদর যতœ করে থাকে। তবে কোন কোন পরিবারে বাবা-মা উভয়ই ছেলেকে বেশি প্রাধান্য দেয়, আর মেয়েকে একটু হলেও কম প্রাধান্য দেয়ার প্রবণতা এখনও সমাজে আছে বিস্তর। তবে মধ্যবিত্ত বা একটু অবস্থাসম্পন্ন শিক্ষিত পরিবারে ছেলে-মেয়েতে কোন প্রকার প্রাধান্য দেওয়ার বিষয়টা ওইভাবে দেখা যায় না। তবে উচ্চবিত্ত পরিবারে কোনো কোনো ক্ষেত্রে মেয়েদের বেশি প্রাধান্য দেওয়ার প্রবণতাও দেখা যায়। আর এসব হচ্ছে দৃষ্টিভঙ্গি ও বাস্তবতার প্রেক্ষিতে। দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টালে সবই পাল্টে যাবে।
পরিবারে কে কতটুকু সুবিধা ভোগ করছে, বাবা-মার কাছে কে কম/বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। কার চাহিদাকে গুরুত্বসহ পুরণ করার চেষ্টা করা হয় ইত্যাদি বিষয় নিয়ে সন্তানদের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক করতেও দেখা যায় হরহামেশায়। আসলে ছেলে বেলায় এসব চিন্তা করার প্রকৃত সময় নয়। নব উচ্ছ¦াস ও উদ্দীপনায় বেড়ে ওঠা শৈশবের দিনগুলো পার করে কৈশোর যখন উঠোনে হানা দেয়, তখনি কিছু পরিবর্তন দেখা যায় ছেলে-মেয়ে উভয়ের। পিতা-মাতার উচিত তখনি তাদের প্রতি আরো মনোযোগ বাড়ানো।
একসময় ছেলেটি বড় হয়। উপযুক্ত সময়ে পরিবার থেকে সিদ্ধান্ত এসে যায় ‘বিয়ে’ নামক একটি সামাজিক ও গুরুত্বপূর্ণ প্রথা সম্পূর্ণ করার। বিয়ের পর নতুন সংসার। পরিবার। তারপর পরিবারে যথারীতি নতুন মেহমানের শুভাগমন। আর এভাবে বাবা হওয়ার মাধ্যমে জীবনচক্রের ষোলকলা পূর্ণ হয়।
সন্তানসহ পরিবারের সকল সদস্যদের সার্বিক পরিচালনার ভার যার কাঁথে বা ঘাড়ে তিনি তো বাবা। বাবা সারা জীবনই এই বোঝা বহে বেড়ান যতো জটিল ও কঠিন সময় হোক না কেন, জীবনের যবনিকা পর্যন্ত এ গুরু দায়িত্ব পালন করতে হয় বাবাকে। মায়ের অবর্তমানে একজন বাবাকে আরো অনেক বেশি ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। সন্তানের লালন-পালন, খাওয়া-দাওয়া, পড়ালেখা, পোশাক, নিরাপদে বেড়ে ওঠা, মানুষের মতো মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার মতো ইত্যাদি বিষয়গুলো বাবাকে মাথায় রাখতে হয় সব সময়। আর এসব বাস্তবায়ন করতে হলে প্রয়োজন অর্থ, সময় এবং প্রয়োজনীয় আরো অনেক উপাদান। যার শতভাগ বাবাকেই যোগান দিতে হয়। বাবার ত্যাগ, বুদ্ধিদীপ্ত জ্ঞান, চিন্তা চেতনা সবই যেন পরিবারের মানুষগুলোকে ঘিরেই আর্বতিত হতে থাকে অনবরত।
পরিবারে বাবার দায়িত্ব যে কি? কেবল মাত্র প্রকৃত বাবারাই ভালো বলতে পারবেন। হিন্দি সিনেমা ‘কাভি খুশি কাভি গাম’ যারা দেখেছেন, তারা বলতে পারবেন। বাবার সাথে সন্তানের সম্পর্ক কতো যে নিবিড়, গাঢ় ও অকৃত্রিম। তা ওই সিনেমায় ফুটিয়ে তোলা গেছে কিছুটা হলেও। প্রকৃতপক্ষে বাবার সাথে ছেলে-মেয়েদের সম্পর্ক মুখে বলে বা কলমে লিখে প্রকাশ করা কঠিন ও জাটিল। সন্তানের জন্য বাবার যে অসীম ত্যাগ স্বীকার ও অফুরাণ ¯েœহ-ভালোবাসা তা বাবা হবার পর বুঝতে পারেন এবং হৃদয়ঙ্গম করা সম্ভব হয়। সন্তানের খাদ্য নিরাপত্তা, ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা, সামাজিক মূল্যবোধ সব কিছু বাবাকেই চিন্তা করতে হয়। হলিউডের একটি সিনেমায়-সন্তানের খাবার যোগাড় করতে গিয়ে শপিং মল থেকে গুড়ো দুধ চুরি এবং তার পরিণতি এবং যে হৃদয়বিদারক কাহিনীর অবতারণা, তা না দেখলে বুঝা যাবে না। দারিদ্র পিতার পক্ষে শিশু খাদ্য যোগাড় করতে না পারার যে আকুতি এবং ব্যর্থতার গøানি বাবাকে কতো যে অসহায় করে তুলে, তা খুবই ভয়াবহ। তবে হলিউডের সিনেমায় নয়, সম্প্রতি বাংলাদেশেও অনুরূপ ঘটনার সত্যরূপ ঘটনা জাতির বিবেককে আলোড়িত করেছে। যা মানুষের মনে দাগ কেটেছে এবং এ দাগ হয়তো টিকে থাকবে বহুদিন।
সন্তানের সুখ, সমৃদ্ধ জীবন নির্বাহের জন্য বাবা যেকোনো ধরণের ঝুঁকি নিতেও পিছ পা হন না। বাবার চিন্তায়, ধ্যানে, কল্পনায় শুধু সন্তানের সুসাস্থ্য, মঙ্গলময় জীবন আর ঐশ^হ্যশালী পথপরিক্রমার দৃশ্য এঁকে যান সর্বদা। সন্তানের সামান্য অসুস্থ্যতা বা যেকোনো ধরণের সমস্যায় বাবা সর্বশক্তি প্রয়োগ করে সন্তানের রোগমুক্তি বা ঝুঁকি হ্রাস করতে প্রাণান্ত চেষ্টা অব্যাহত রাখেন। পরিবারের সুখের জন্য বাবা বছরের পর বছর পরিবার থেকে দূরে বহু দূরে অবস্থান করে হলেও অর্থ উপার্জনে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। নিজের সুখ-শান্তি ও যাবতীয় মৌলিক চাহিদাকে বিসর্জন দিয়ে বাবা অন্যদের শান্তি ও সমৃদ্ধি অর্জনে ব্যস্ত থাকেন। আর এ ব্যস্ততা কোনো কোনো বাবার শেষ হবার নয়। সারা জীবন হয়তো কর্মময় জীবন চালিয়ে যেতে হয় কোনো কোনো বাবাকে। আর এসব শুধুমাত্র পরিবারের সকলের সার্বিক মঙ্গলের জন্যই বটে।
কোনো কিছুর বিনিময়ে বাবা-সন্তানের সম্পর্ক বা আত্মার বন্ধন ছিন্ন করা যায় না। বর্তমান সমাজে মানুষগুলো যেহেতু আত্মকেন্দ্রিক হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। সমাজে কিছু অস্থিরতাও কাজ করছে। ফলে নিজেদের হীন স্বার্থকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে অনেক সন্তানকে বাবার সাথে জগড়া-বিবাদে লিপ্ত হতেও দেখা যায়। এমনকি অনেক অনাকাংক্ষিত ঘটনাও ঘটে চলেছে আমাদের মূল্যবোধহীন সমাজে। কোনো কোনো হতভাগ্য বাবার ঠিকানা হয়তো বৃদ্ধাশ্রমে। যা আশংকাজনকভাবে বেড়েই চলেছে। সামাজিক বন্ধন অটুট রাখতে হলে ছেলে-মেয়েদের শিশু বয়স থেকে নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে হবে। ধর্মীয় শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। ধৈর্য ও ত্যাগ স্বীকারে অভ্যাস করতে হবে ছোটবলো থেকেই। ছোটখাটো ত্যাগ স্বীকারও অনেক বড় প্রাপ্তি এনে দিতে পারে। সন্তানেরা পারিবারিক পরিবেশ ও বাবা-মায়ের কাছ থেকে যে নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষা অর্জন করে থাকে, সেটাই তাদের জন্য প্রকৃত শিক্ষার ভিত্তি। যা তার ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য মূল চাবিকাঠি হিসেবে কাজ করে। বাবা ও সন্তানের মধ্যে পারস্পরিক বন্ধন আরো নিবিড়, গভীর ও সুদৃঢ় হোক। বিশ^াস ও শ্রদ্ধার জায়গাটা আরো প্রশস্ত হোক। কোনো বাবা-মা’কে যেন বৃদ্ধাশ্রমে না থাকতে হয়। সে প্রত্যাশায়।
লেখক: কবি, কলামিস্ট ও ঊন্নয়ন কর্মী।


























