ভালো থেকো 'মা'
১৬ মে ২০১৯, ০৪:৩৪ পিএম
বিশ্ব মা দিবস, আমার মতো লেখকদের দিবস আসে একটু আগেই। দিবস নিয়ে লিখিতে ভালো ও লাগে। মা দিবস নিয়ে অনেকের ভিন্ন মতামত, কেউ বলে মায়ের জন্যে একদিন কেনো? মা জন্যে দিবস কেনো? মা কি একদিনের? মায়ের ভালোবাসা কি একদিনের? ব্যক্তিগত ভাবে আমি মা দিবসের পক্ষে। আমার কাছে মা একদিনের নয়, একদিনের ভালোবাসা নয়। 'মা' এমন একটি শব্দ, বাংলা ভাষায় এর চেয়ে ছোট শব্দ আছে কিনা আমার জানা নেই। এই ছোট এক বর্ণের একটা শব্দের অর্থ খুঁজে বের করা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। আমার ১২ বছরের সন্তান অভ্র ফারিহা কে বলেছি মা দিবসের জন্যে কিছু লিখতে, সে লিখেছে-
"মা, আম্মা, আম্মু মানে কী তা আমি জানি না। শুধু এইটুকুই জানি মা মানে এমন একজন মানুষ, যিনি নিজে একজন মানুষ হয়ে আরেকটি মানুষকে ১০ মাস ধরে গর্ভে রাখেন। শুধু কি গর্ভে রাখেন, এখানেই কিন্তু শেষ নয়। এরপর বছরের পর বছর তাকে কোলেও রাখতে হয়। যখন সে স্কুলে যেতে শুরু করে তখন তাকে নিয়ে স্কুলে যাওয়া, বসে থাকা, আবার তাকে নিয়ে বাসায় আসা। গল্প করে ঘুম পাড়ানো। ঠিক সময় ঘুম থেকে তোলা, পড়ানো। জ্বর আসলে সারা রাত ধরে পাশে বসে মাথায় পট্টি দেয়া। পরীক্ষার সময় রাত জেগে পড়ানো। বাবা মারতে এলে বা অন্য কেউ মারতে এলে সেই সন্তানকে বাঁচানো। নিজে ঠিকই বকা দিতে পারবে, মারতে পারবে। অন্য কেউ তা করতে এলে রেগে যাবে।
আম্মুই বাইরে ঘুরতে নিয়ে যায়। শপিংয়ে নিয়ে যায়। ভালোমন্দ বুঝায়। কতই না কাজ মায়ের। আমার আম্মুও ঠিক ওই রকম। কিন্তু একটু ব্যতিক্রম, হ্যাঁ আমার আম্মুর নাম রহিমা আক্তার মৌ। আম্মুর খুব শখ লেখালেখি করা। রোজ সকালে আম্মু ঘুম থেকে উঠে নাস্তা বানিয়ে আমাকে খাইয়ে দিয়ে স্কুলে নিয়ে যায়। আম্মু স্কুলে বসে থাকে না। বাসায় গিয়ে সব কাজ করেন। লিখতে বসেন। এরপর ছুটির সময় এসে আবার আমাকে নিয়ে যায়। আমার জ্বর আসলে মা অনেক রাত জেগে থাকে। মাঝ রাতে জ্বর বেশি এলে যখন আমি ছটফট করি মাকে ডাকি, মা জেগে যান, আমাকে ওষুধ খাওয়ান। পরীক্ষা এলে বকা দিয়ে দিয়ে পড়ান। ঠাণ্ডা খেলে আমার সমস্যা হয়। তবুও আইসক্রিম খেতে ইচ্ছে করে। আম্মু খেতে দেয় না। তখন খুব রাগ লাগে।
আপু আমাকে মারতে এলে আম্মু আপুকে খুব বকা দেয়, উল্টো মার দেয়। শপিংয়ে গেলে আম্মুই সঙ্গে নিয়ে যায়। কারণ আম্মু জানে আব্বুর সঙ্গে গেলে আমরা কখনোই ঠিক সাইজের জামা কিনতে পারব না। আমি আম্মুকে বলে দিয়েছি। আমি বয়ফ্রেন্ড রাখব না। কিন্তু জামাইটা আম্মু নিজেই পছন্দ করে দেবে।
আজ যে আমি লিখতে বসেছি তাও আম্মুর জন্য। আম্মু লিখতে জোর করেছে। আমার বেস্ট ফ্রেন্ডের নাম অপি, অপির আম্মুর সঙ্গে আমার আম্মুর ভালো বন্ধুত্ব। এটা আমার খুব ভালো লাগে। আম্মুসহ আমরা ঘুরতে যাই খুব ভালো লাগে। আম্মু যখন লিখতে বসে তখন কেউ কোনো কথা বলতে পারে না। কিছু জিজ্ঞেস করলেও কিছু বলে না। তখন রাগও লাগে কিন্তু তার পরও আম্মু খুব ভালো। আম্মুকে আমি অনেক অনেক ভালোবাসি।"( অভ্র অল্প স্বল্প গল্প লিখে)
মা দিবসের আগের দিন জাতীয় দুই পত্রিকায় আমার লেখা, আরো লেখা প্রকাশের অপেক্ষায়। মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার বিশ্ব মা দিবস পালিত হয়, এবার পালিত হলো ১২ মে। ১১ মে খুব কাছের দু চারজনকে মনে করিয়ে দিয়েছি দিবসটির কথা। অনির্বানকে বলেছি বাসায় ফেরার পথে কিছু গিফট কিনে নিও, বাচ্চাদের দিও ওর মা কে দেবার জন্যে। অনির্বান বলে, 'কি গিফট নিবো' হেসে জবাব দিলাম, ' আমি তো দুটো কাঁচের চুড়ি পেলেও খুশি, এবার ভেবে দেখো তোমার ঘরের লোক কিসে খুশি হতে পারে।'
১১ মে রাতে শরীর কিছুটা অসুস্থ্য বলে ঘুমিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি। রৌদ্র (আমার বড় সন্তান) বলল- 'এখুনি ঘুমিয়ে যাবে'? হা বলাতে ও আমার পাশ থেকে উঠে যায়। মিনিট দশের মাঝে দুই বোন আসে আমার সামনে। মা দিবসের উপহার আর কার্ড নিয়ে। আমি এতোই আনন্দিত হই যা ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না। দ্রুত মাথায় কাপড় দিয়ে ছবি তুলতে বলি। গিফট বের করি। কার্ড পরে দেখবো, কারণ কার্ডে কিছু লেখা আছে তা মন দিয়ে পড়বো। আমাদের কান্ড দেখে আহসান চুপ হয়ে আছে, এসব বিষয়ে তার কোন মাথা ব্যাথা নেই। আহসান মেয়েদের সহযোগিতা না করলেও বাবা দিবসে আমি ঠিক মেয়েদের সহযোগিতা করি করব ও। তবে মেয়েরা আগে বললে ওদের সাথে কম বেশি সে থাকতো। কার্ডে লেখা-
প্রিয় আম্মু,
জানি আমরা তোমার অনেক অবাধ্য, কথা শুনিনা। পড়ালেখা ঠিক মত করিনা। তোমার কাজ বাড়াই, ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু একটা সত্যি কথা হলো আমরা তোমাকে অনেক ভালোবাসি। মাকে ভালবাসার জন্যে বছরের একটা দিন না, সবগুলো দিন চাই। আর মা দিবসের দিন একটা প্রমিস করতে চাই যে, আমরা দুজন ভালো হওয়ার চেষ্টা করব, মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করার চেষ্টা করব। আর একটা কথা, আমরা তোমাকে অনেক ভালোবাসি।
ধন্যবাদ, আম্মু।
লেখাগুলো পড়ার সাথে সাথে অভ্র কানের কাছে এসে বলে- "ভালো হওয়ার চেষ্টা করব বলেছি, মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা করার চেষ্টা করব বলেছি। করবই বলিনি কিন্তু।" ওর কথা শুনে আমি হাসি, আমার সন্তান চেষ্টা করবে বলেছে, এটাই অনেক। মনে মনে বলি, ভালো থেকো "মা"।
১২ তারিখ দুপুরে শাশুড়িকে কল করি। মা কে কল দিই, উনি ধরেন নি। জানি মা কল দিবেন। মা ঘুমে ছিলেন সেই সময়ে আমাদের চার ভাই বোনের কল যায়, মা কারো কল ধরতে পারেন নি। ছোট বেলা থেকে শুনে এসেছি আমি নাকি মায়ের মা এর মতো হয়েছি। মানে নানীর মতো। মা আমাকে 'মা' বলেই ডাকেন। আবার সখ করে 'মনা' বলেও ডাকেন। বাবা ডাকেন শাশুড়ি বলে। মা দিবসে বাবা মা দুজন আমায় কল করে শুভেচ্ছা জানায়। বাবা কল করে বলেন, 'কেমন আছেন শাশুড়ি আম্মা' খুব মজা পাই আমি। বিকেলে বাবা কল করে কথা বললেন। সন্ধ্যার পর মা কল করেন,
'কি রে আজ নাকি মা দিবস।'
'আমি তো কল করেছি, আপনি ধরেন নি।'
'হ্যা, আমি ওমেরার (আমার ছোট ভাইয়ের মেয়ে) সাথে ঘুমিয়ে ছিলাম। তখন তোরা সবাই কল করেছিস, কারো কল ধরতে পারিনি। একটু আগে আনিস কল করেছে, কল করে মা দিবসের শুভেচ্ছা জানিয়েছে। ও অনেকক্ষন কথা বললো। শেষে বলল, 'ভালো থেকো "মা"।
আমি মায়ের কথায় চুপ হয়ে যাই। মা দিবসে আনিস ভাই কল করেছে মা কে। সত্যিই মা দিবসের প্রয়োজন আছে। আনিস ভাই আমাদের নতুন এক ভাই। আজ থেকে ২০ বছর আগে বড় বোনের কিডনি সমস্যা দেখা দেয়। দেশে পার্শবর্তী দেশে চিকিৎসা করানো হয়। আপার কিডনি প্রতিস্থাপনের কথা বলে ডাক্তার। কিন্তু কে দিবে? মা হার্টের রোগী, বাবা ধুমপান করেন, ভাইয়েরা ছোট। আর আছি আমি, আমি দিতে চেয়েছি। কিন্তু বাবা মায়ের নিষেধ, উনাদের কথা, 'তোর সন্তান আছে, তোর কিছু হলে ওদের কে দেখবে?'
কিডনি চাই বলে পত্রিকায় অনেক বিজ্ঞাপন দিই আমরা। এটা ২০০৭/০৮ সালের কথা। বিজ্ঞাপন দেখে আনিচ ভাই, উনি নিজেই যোগাযোগ করেন। পারিবারিক ভাবে উনি দরিদ্র, তার উপর অনেক ঋণ। এই ঋণ শোধ করতেই তিনি কিডনি দিতে রাজি। পরীক্ষানিরীক্ষা করার পর আপার সাথে সব মিলে যায়। আনিচ ভাইয়ের বউ ও একটা কন্যা সন্তান আছে। সব কথা হবার পর আনিচ ভাইয়ের সব ঋণ পরিশোধ করে আমাদের পরিবার। আনিচ ভাই একটা কিডনি দেয় আপাকে। সেই থেকে আনিচ ভাই আমাদের আরেকটা ভাই। উনি গ্রামে থাকেন পরিবার নিয়ে। কিডনি দেয়ার পর উনার আরেকটা সন্তান হয়। উনার ভেঙ্গে পড়া আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন হয়। সব সময় আমাদের পরিবারের সাথে যোগাযোগ হয় উনার। বছরে দুই তিনবার আসেন মায়ের বাসায়। মা বলতে উনি আমার মা কেই বুঝেন। আসার সময় গ্রামের অনেক কিছু নিয়ে আসেন। যাবার সময় মা আর আমার আপা অনেক কিছু দেন। সেই থেকেই একটা বন্ধন উনাদের সাথে আমাদের।
কিছুদিন আগে আনিচ ভাইয়ের মেয়ের বিয়ে হলো, আমাদের নিমন্ত্রণ করলেন। উনাদের প্রয়োজন মতো উপহার পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। ঈদ এলেই আনিচ ভাই আসেন, মা আর আপা উনার বউ বাচ্চা আর উনার জন্যে নতুন পোষাক আর প্রয়োজনীয় জিনিস দেন। ২০০৭/০৮/০৯ সালের দিকে কিডনি কেনাবেচা নিয়ে অনেক সমালোচনা হয়। আসলেও তাই অনেকের অঙ্গ কেটে নিয়েছে অনেকেই। কিন্তু আনিচ ভাইয়ের একটা অঙ্গ দিয়ে আপা বেঁচে আছেন। এ যে অনেক অনেক,,,,,, (শব্দটা কি দিব ভেবে পাচ্ছি না) এ আল্লাহর অশেষ মেহেরবানি।
মায়ের সাথে কথা বলে আমি আরো ভাবনায় বসি। আমি জানি মায়ের জন্যে কোন দিবস নেই। কিন্তু দিবস থাকলে সমস্যা কোথায়? যারা ৩৫৫ দিন মাকে ভুলে থাকে একদিন মা কে নিয়ে সেলফি তুলে ফেইসবুকে ছাড়ে তাদের কর্মফল তারা নিশ্চই পাবে। যারা প্রতিদিনের মতো মা দিবসে মাকে মনে করে ভালোবাসে তারা তেমনি কর্মফল পাবে। আর আনিচ ভাই, তিনি তো সত্যিই এক অন্য মানুষ। যিনি ভালোবাসা জানানোর জন্যে শুভেচ্ছা জানানোর জন্যে আমার মা কে মা ডেকে কল করেন। মা দিবসের শেষ ঘন্টা বাজতে চলছে, আবারও বলি পৃথিবীর সব মায়েরা ভালো থাকুন। সুস্থ্য থাকুন। আনিচ ভাইয়ের মতো আমিও বলি, ভালো থেকো "মা"।
লেখক- সাহিত্যিক কলামিস্ট ও প্রাবন্ধিক।


























