নারী শিক্ষা ও ক্ষমতায়নের কিংবদন্তিকে স্মরণ করছি
০৯ ডিসেম্বর ২০১৮, ০৬:১২ পিএম
নারী শিক্ষা ও ক্ষমতায়নের কিংবদন্তি বেগম রোকেয়া ৯ ই ডিসেম্বর ১৮৮০ সালে জন্মগ্রহণ করেন এবং ৯ ই ডিসেম্বর ১৯৩২ সালে মারা যান। আমরা ডিসেম্বরের ৯ তারিখকে ‘রোকেয়া দিবস’ হিসাবে পালন করে থাকি। বেগম রোকেয়া মাত্র ৫২ বছর জীবনযাপন করেছেন। আমাদের দেশে শিক্ষিত, ক্ষমতায়ন ও আলোকিত নারীদের বেগম রোকেয়ার উদার অবদানকে যেকোন বয়সের নারীদের মাইলফলক হিসাবে গণ্য করা যেতে পারে।
বেগম রোকেয়া রংপুর জেলার পায়রাবন্দের সভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পরিবারিক নাম রোকিয়া খাতুন; কিন্তু তিনি বেগম রোকেয়া নামে সু-পরিচিত। বেগম রোকেয়ার বড় ভাই কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে পড়াশোনা করেন; কিন্তু রোকেয়া ও তাঁর বড় বোন করিমুন্নেছাকে স্কুলে পাঠানো হয়নি! তবুও রোকেয়া বাড়িতে তাঁর ভাইদের সাহায্যে বাংলা ও ইংরেজী ভাষা শিখেছিলেন। তাঁর ভাই ও বোন তাকে লেখালেখি করতেও অনুপ্রাণিত করেছিলেন।
বেগম রোকেয়া ১৯১৬ সালে ‘আঞ্জুমান-ই-খাওয়াতীন-ই-ইসলাম’ (একেআই) বা ‘মুসলিম নারী সমাজ’ প্রতিষ্ঠা করেন যাতে নারীরা তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়। নারীদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান, ক্ষমতায়ন, আইন, রাজনৈতিক অধিকার প্রভৃতির জন্য সংগ্রাম করার পক্ষে এই সংগঠনটি পুরোপুরিভাবে নিয়োজিত ছিল। ‘মুসলিম নারী সমাজ’ বিপুলসংখ্যক নারীর শিক্ষার খরচ নিরসন করে এবং অনেক দরিদ্র নারীর জন্য বিয়ের ব্যবস্থা করে। এটি অনাথ, নিঃস্ব নারী এবং বিধবাদের আর্থিক সাহায্যের পাশাপাশি আশ্রয় দিয়ে সাহায্য করেছে। এটি মহিলাদের জন্য উপার্জন এবং আত্মনির্ভরশীল হতে কিছু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে। ‘মুসলিম নারী সমাজ’ কলকাতায় মুসলমান নারীদের বিকাশে, রক্ষণশীল জনগণের নেতিবাচক মন্তব্য ও অভিযোগ মোকাবেলায় অবদান রাখে।
বেগম রোকেয়া তাঁর উদার চিন্তা, ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি এবং শক্তিশালী লেখনির জন্য স্মরণীয়। তাঁর কিছু লেখার মধ্যে সামাজিক উন্নয়ন প্রচেষ্টার জন্য নারী ও পুরুষের একাত্মতার পক্ষে তাঁর সমর্থন পাওয়া যায়। তিনি সমসাময়িক রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করেও লিখেছেন। বেগম রোকেয়ার লেখনিতে নারী নির্যাতনের প্রতিবাদ এবং সামাজিক বাঁধাসমূহ ভেঙ্গে দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে, যা তাদের বিরুদ্ধে বৈষম্যের ছিল। তার ‘অবরোধবাসিনী’ বইটি নারীর জীবনকে বাঁধাগ্রস্ত করে অন্য নারীদের কাছ থেকে দূরে রাখা নারীদের পর্দা প্রথার বিরুদ্ধে চরমভাবে আঘাত করে।
বেগম রোকেয়ার অন্যান্য উল্লেখযোগ্য রচনাবলী হল- ‘মতিচূর’, ‘পদ্মরাগ’, ‘সুলতানা’স ড্রিমস’ (যা পরবর্তীতে বাংলায় ‘সুলতানার স্বপ্ন’ নামে অনুবাদ করেছিলেন) ইত্যাদি। তিনি কবিতাও লিখেছেন। তার অসংখ্য কবিতা এবং প্রবন্ধ বিভিন্ন জনপ্রিয় পত্র-পত্রিকায় প্রকাশ হয়। বেগম রোকেয়া বিভিন্ন প্রবন্ধে সামাজিক বৈষম্য, পর্দা ব্যবস্থার প্রতিকূল প্রভাব, নারীর শিক্ষা, নারীর ওপর নির্যাতন, নারীর অধিকার এবং নারীর জাগরণ নিয়ে লিখেছেন। তিনি বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ ইত্যাদি প্রথার বিরুদ্ধেও লিখেছেন।
১৮৯৮ সালে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেনের সাথে রোকেয়ার বিয়ে হয়। সাখাওয়াত হোসেন উদার, প্রগতিশীল ছিলেন এবং তাঁর স্ত্রী রোকেয়াকে বাংলা ও ইংরেজি পড়ার জন্য উৎসাহিত করেছিলেন। তিনি দেশ-বিদেশের সাহিত্যকর্মসমূহ পড়তে অনুপ্রাণিত করেন। বেগম রোকেয়া তার স্বামীর অনুপ্রেরণা নিয়ে লিখতে শুরু করলেন। দুর্ভাগ্যবশত, ৩ রা মে ১৯০৯ সালে তার স্বামী মারা যান। বেগম রোকেয়ার দুই মেয়ে ছিল; কিন্তু তারা শৈশবে মারা যায়।
বেগম রোকেয়া কখনোই অলস হয়ে থাকতে পারতেন না। সর্বদা নারীর শিক্ষা ও মুক্তির জন্য কাজ করতেন। সেই সময়ে বাংলার মুসলিম নারীরা অনগ্রসর, অবহেলিত ও নিপীড়িত ছিল। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে যদি তারা শিক্ষিত হয় এবং অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছল হয়ে যায়, তবেই কেবল নারীরা তাদের শেকল থেকে মুক্ত হতে পারবে। তিনি ১ লা অক্টোবর ১৯০৯ সালে ভারতবর্ষের ভাগলপুরে মাত্র পাঁচজন ছাত্রী নিয়ে মুসলমান মেয়েদের জন্য বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি তার স্বামীর নামে বিদ্যালয়টির নামকরণ করেন ‘সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল’। কিন্তু তারপর তাকে কলকাতায় চলে যেতে হয়।
তিনি ১৬ ই মার্চ ১৯১১ সালে কলকাতায় মাত্র আটজন ছাত্রী নিয়ে ‘সাখাওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করেন। বেগম রোকেয়ার অসাধারণ প্রচেষ্টার মাধ্যমে স্কুলটি ধীরে ধীরে ‘মিডল ইংলিশ গার্লস স্কুল ও হাই ইংলিশ গার্লস স্কুল’ এ উন্নীত হয়। ছাত্রী সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়া ও অন্যান্য কিছু কারণে বিদ্যালয়টি বিভিন্ন জায়গায় স্থানান্তরিত করা হয়। অবশেষে নিজের বাড়ীতে স্থানান্তর করা হলে বিদ্যালয়টি তার স্থায়ী ঠিকানা পায়। বিভিন্ন বাঁধা পেরিয়ে সেই সময় বেগম রোকেয়া চৌদ্দ বছর যাবৎ স্কুল চালিয়েছিলেন। তিনি মুসলিম মেয়েদের শিক্ষার জন্য সেরা আসনের বিদ্যালয় তৈরি করেছিলেন, সেই সময় এমন একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মেয়েদের কল্পনার বাইরে ছিল। এক কথায়, রোকেয়া সমাজের নেতিবাচক নিয়মগুলোর বিরুদ্ধে গিয়ে ‘অসম্ভব’কে সম্ভব করেছিলেন।
নিদারুণ কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি তাঁর নারী সহকর্মীদের ইতিবাচকভাবে বাস করার জন্য বাস্তবসম্মত বিশ্বের মুখোমুখি আনতে সক্ষম হন। তিনি মুসলিম মেয়েদের বিদ্যালয়ে পাঠানোর জন্য কঠোর পরিশ্রম করেছিলেন। তিনি বাড়ি বাড়ি গিয়েছিলেন, বাবা-মায়েদের অনুপ্রাণিত করেছিলেন যে শিক্ষা মেয়েদের জন্য মঙ্গলজনক এবং তাদের ক্ষমতায়নের পূর্বশর্ত।
কিন্তু এটা বড়ই দুঃখের বিষয় যে আমাদের দেশে, বেগম রোকেয়ার মাতৃভূমিতে এখনও প্রায় অর্ধেক নারী জনসংখ্যা অশিক্ষিত! ১৯০১ সালে সাক্ষরতার হার ছিল ৫.৬ শতাংশ, কিন্তু ১০০ বছরের মধ্যে আমরা ১০০% পর্যন্ত সাক্ষরতার হার বৃদ্ধি করতে পারিনি! এ কারণে আমাদের সকল নারীকে শিক্ষিত করার জন্য প্রচলিত সমস্যাগুলোকে চিহ্নিত করতে হবে এবং সময় সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া উচিত। সরকার, এনজিও, সুশীল সমাজ এবং আমাদের প্রত্যেককে ‘রোকেয়া দিবস’ পর্যবেক্ষণের অংশ হিসাবে আজ থেকে কমপক্ষে একজন নিরক্ষর ব্যক্তিকে শিক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব নিতে হবে।
অনুবাদক: মোহাম্মদ অংকন, কথাসাহিত্যিক ও কলামিস্ট, ঢাকা।
মূল: পারভেজ বাবুল, গণমাধ্যমকর্মী ও ‘নারীর ক্ষমতায়ন, খাদ্য নিরাপত্তা ও জলবায়ু পরিবর্তন’ বইয়ের রচিয়তা।


























