বিবাহ-বিচ্ছেদ বাড়ছে
১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০৮:৩৪ পিএম
বিবাহ একটি মধুর সম্পর্কের মজবুত বন্ধন। কিন্তু দিন দিন বিবাহ-বিচ্ছেদের হার বেড়েই চলেছে। বাল্যবিবাহ প্রধান কারণ। এতে ব্যক্তিত্বের ভারসাম্য নষ্ট হয়। গবেষণায় দেখা যায় যে, টিন এজ বা ৩২ পেরিয়ে বিয়ে করা দম্পতির মধ্যে বিচ্ছেদের হার বেশি। অপরদিকে ২৭-৩০ বছরে যারা বিয়ে করছেন তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক সবচেয়ে মধুর। কলেজ গ্রাজুয়েট দম্পতির চেয়ে হাইস্কুল না পেরোনো দম্পতির মাঝে ডিভোর্সের হার প্রায় দ্বিগুণ। এগুলো হল বিজ্ঞানভিত্তিক যুক্তি।
২০১৩ সালে Institute for Divorce Financial Analysts একটি সমীক্ষা করে। যেখানে দেখা যায় বিবাহ বিচ্ছেদের জন্য যে কারণটি সবচেয়ে বেশি দায়ী তা হল ব্যক্তিত্বের অমিল অর্থাৎ দুজনের মাঝে পারস্পরিক অসঙ্গতি। নিজস্ব মতবাদ, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, ইচ্ছা সবকিছুতে যখন পার্থক্য দেখা দেয় তখন দা¤পত্য জীবন বেশ জটিল হয়ে উঠে। আমাদের সমাজের পরিপেক্ষিতে দেখা যায় হয়ত স্ত্রী চাকুরি করতে আগ্রহী, যা স্বামীর পছন্দ নয়। কিংবা স্বামীর ঘুরতে ভালো লাগে যা স্ত্রীর মোটেও পছন্দ নয়। এইসব মত বা পছন্দে অমিল স্বামী-স্ত্রীর মাঝে কলহর জন্ম দেয়। দুজন ভিন্ন ব্যক্তিত্বের মানুষ বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলে তারা একে অপরকে বুঝতে চায়না। অনেকক্ষেত্রে দুজনই নিজের ইচ্ছা বা মতকেই প্রাধান্য দিয়ে চলতে চায়। যা প্রতিদিনের ঝগড়া এবং সর্বশেষে বিবাহ বিচ্ছেদের কারণ হয়। এছাড়া নারীর সমঅধিকার, নৈতিক অবক্ষয়, ব্যক্তিত্বের দ্বন্দ্ব, ইন্টারনেটের অপব্যবহার, পর্নোগ্রাফির সহজলভ্যতা, মাদকাশক্তি, পরকীয়া, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সন্দেহ, ফেসবুকে আসক্তি, যৌতুক ইত্যাদি কারণে বিবাহ-বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘মনিটরিং দ্য সিচুয়েশন অব ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস অব বাংলাদেশ’(এমএসভিএসবি) শীর্ষক প্রতিবেদন বলছে, দেশে বিবাহ বিচ্ছেদের হার বেড়েছে। এ বিচ্ছেদ করার ক্ষেত্রে পুরুষের চেয়ে নারীরা বেশি এগিয়ে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তালাক বা বিচ্ছেদের ঘটনা দিনদিন বেড়ে যাওয়ার পেছনে মাদকের বিস্তার, প্রযুক্তির উৎকর্ষতা, নারীর উপার্জিত অর্থ স্বাধীনভাবে ব্যয়ে বাধা, পারিবারিক ও সামাজিক মেলবন্ধনের ঘাটতি বড় ভূমিকা রাখছে। বিবিএসের সর্বশেষ তথ্য অনুসারে, দেশে বিবাহিত ও তালাকপ্রাপ্ত পুরুষ উভয়ই বেড়েছে। বিবাহিত পুরুষ বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বিপত্নীক পুরুষের সংখ্যাও বেড়েছে। তালাকপ্রাপ্ত ও বৈবাহিক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করা পুরুষের হার ২০১৬ সালে ছিল শতকরা ১ দশমিক ৪ শতাংশ। পরের বছর সেটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৫ শতাংশে। এই হার ৫ বছরের ব্যবধানে বেড়েছে দশমিক ৪ ভাগ। একই সঙ্গে নারীদের বিবাহ, তালাক ও পৃথক বসাবাসের সংখ্যাও বেড়েছে। দেশের ১০০ জন নারীর মধ্যে বতর্মানে গড়ে ১০ দশমিক ৫ শতাংশ নারী তালাকপ্রাপ্ত, যা আগের বছর ছিল ১০ শতাংশ। গত ৫ বছরের ব্যবধানে এই হার বেড়েছে ২ ভাগ।
সমাজ ও মনোবিজ্ঞানীদের মতে, আধুনিকতার নামে পশ্চিমাধাঁচের জীবনযাপন মানুষের জীবনের খুব বেশি প্রভাব ফেলছে। এজন্য মধ্য ও উচ্চবিত্ত প্রায় প্রতিটি পরিবারের মধ্যেই খুব অস্থিরতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। উপড়ে উঠার জন্য ও নিজেদের প্রকাশ করার প্রতিযোগিতায় সমাজের মানুষ খুব বেশি অধৈর্য হয়ে পড়ছে। পরিবারগুলোর মধ্যে ধর্মীয় ও নৈতিকতার চর্চা উঠে যাচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ও সমাজবিজ্ঞানী ড. এমাজউদ্দিন আহমদ বলেন, একটি সমাজ যখন হিংসাত্মক কার্যক্রমে লিপ্ত হয়, তখন সমাজের স্বাভাবিকতা নষ্ট হয় এবং এসব ঘটনা ঘটে। আমাদের মূল্যবোধ তো গেছেই পাশাপাশি স্বাভাবিকতাও বিনষ্ট হয়ে গেছে। প্রথমে শহরে, পরে গ্রামে। তিনি বলেন, সমাজে তথ্য-প্রযুক্তির প্রভাবে মোবাইল ফোনের অপব্যবহার, ফেসবুক, টুইটার, স্কাইপিসহ নানা প্রযুক্তির বিকৃত ব্যবহার, পারিবারিক মূল্যবোধের অভাব, বিদেশি অপসংস্কৃতির প্রভাব, নিজেদের মাঝে আত্মতুষ্টি না থাকা, একে অপরের মাঝে বোঝাপড়ার অভাব বা ধৈর্যচ্যুতি, পারিবারিক শিক্ষা ও সচেতনতা না থাকাসহ নানা কারণে পরকীয়া ও বিবাহ-বিচ্ছেদের ঘটনা বাড়ছে। এ সমস্যার উত্তরণ ঘটাতে নতুন কোনো উদাহরণ তৈরি করতে হবে।
অভিজাত ও উচ্চবিত্তদের মধ্যে স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সন্দেহ অবিশ্বাসের কারণেও কিছু বিচ্ছেদ ঘটছে। অনেকক্ষেত্রে ঠুনকো সন্দেহবশত আবেগতাড়িত বিষয়ও থাকে। রাজধানীর গুলশান, বনানী, উত্তরা ধানমন্ডির মতো অভিজাত এলাকার বহু সুখের সংসারের অবসান হচ্ছে বিচ্ছেদে। গরিব পরিবারগুলোর সমস্যা ভরণপোষণ কিংবা যৌতুক ও অভাব অনটন। বিয়ের দীর্ঘদিন পরে কয়েকটি সন্তান জন্মের পরও স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তালাকের ঘটনা ঘটছে। এতে তালাক হওয়া দ¤পতির সন্তানরা পারিবারিকভাবে পিতা অথবা মাতা না থাকায় অনায়াসে বিপথগামী হয়ে পড়ছে। বাবা-মায়ের এ ধরনের ঘটনা সন্তানদের ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলছে।
বেশি অর্থ যেমন অনর্থ ঘটায় আবার অর্থের অভাবও তাই। হাস্যকর হলেও খুবই বাস্তব সত্য হল এই যে, আর্থিক সমস্যা বর্তমানে বিবাহ বিচ্ছেদের একটি অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। হয়ত স্ত্রীর একটি ফ্ল্যাটের চাহিদা কিংবা একটি দামী এলইডি টিভির শখ। স্বামীর পক্ষে সেই চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হচ্ছেনা। অথবা এমনটা হতে পারে, স্ত্রী সংসারে কোন আর্থিক সাহায্য করতে পারেনা বলে প্রায় প্রতিদিনই কথা শুনতে হয়। আমাদের দেশে এই সমস্যা ব্যাপক। বিয়ের আগে যৌতুক থেকে শুরু করে বিয়ের পর একের পর এক প্রয়োজন। বেশিরভাগ সময় এক্ষেত্রে স্বামীর আর্থিক অবস্থান দা¤পত্যে মনোমালিন্যের সৃষ্টি করে। আবার অনেক সময় উল্টোটাও দেখা যায়। মানে স্ত্রী স্বামীর চেয়ে বেশি রোজগার করলে সেটাও নিয়েও ঝামেলা হয়। সবশেষে এই অর্থের কারণে ভেঙ্গে যায় অনেক সম্পর্ক।
যোগাযোগের উপর নির্ভর করে সম্পর্ক। এটি একটি বড় বিষয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, স্বামী দেশের বাইরে বা আলাদা জেলায় থাকে বলে যোগাযোগ হয়ত অনেক কম হয়। এই কম যোগাযোগ এক সময় সন্দেহ, অবিশ্বাস এবং একঘেয়ামির জন্ম দেয়। যা বিবাহ বিচ্ছেদের মত ঘটনার সূত্রপাত ঘটায়। উচ্চস্বরে কথা বলা, বিনা কারণে সন্দেহ করা, ছোটখাটো বিষয়কে অনেক বড় করে দেখাৃ এই বিষয়গুলো বিবাহ বিচ্ছেদের জন্য দায়ী। বিবাহিত জীবন যখন মানসিক অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায় তখন মানুষ বাধ্য হয়ে বিচ্ছেদের পথ বেঁছে নেয়। অপরপক্ষে অবহেলা, অকারণে সন্দেহ মানসিকতায় বেশ প্রভাব ফেলে। শারীরিক সম্পর্ক থেকে দূরে থাকা, দুজনের আলাদা সময় না কাটানো, নিজেদের ব্যস্ততা নিয়ে ব্যস্ত থাকাও এর জন্য দায়ী।
এক সমীক্ষায় দেখা যায় বিবাহ বিচ্ছেদের হার কমবয়সী বিবাহিত দম্পতিদের মধ্যে অনেক বেশি। বিশেষজ্ঞরা এর জন্য মূলত মানসিক অপরিপক্বতাকে দায়ী করেছেন। এটা খুব স্বাভাবিক যে একজন ২০/২২ বছরের মানুষের মানসিকতা আর একজন ৩০/৩৫ বছরের মানুষের মানসিকতায় যথেষ্ট ফারাক রয়েছে। কম বয়সে মানুষের মাঝে আবেগ বেশি কাজ করে। কিন্তু সময়ের সাথে মন মানসিকতা বদলে যায়। সেই সাথে চারপাশের বাস্তবটাও। আর তখন মধুর বিবাহিত জীবন আর মধুর থাকেনা এবং বিবাহ বিচ্ছেদের ঘটনা ঘটে।
বিবাহ বিচ্ছেদকে আমরা সবসময় আমাদের সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের ভিত্তিতে বিচার করি। সবসময় এটা অবক্ষয় নয়, সামাজিক পরিবর্তনও হতে পারে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে উন্নত দেশের মতো যুবক যুবতীদের বিবাহ সম্পর্কে অরিয়েন্টেশন কোর্স বা প্রোগ্রাম করা যেতে পারে। বাল্যবিয়ে কমাতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়ন করতে হবে। কুসংস্কার এবং সামাজিক মূল্যবোধের অভাবে সমাজে বাল্যবিয়ে রোধ করা যাচ্ছে না। বাল্যবিয়ে বা বিবাহ-বিচ্ছেদ কমাতে জনসচেতনতা বড় বিষয়।
লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট।


























