জাতিসংঘ সফরে বাংলাদেশের স্বার্থ ও সম্ভাবনা তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী: মাহদী আমিন

নিজস্ব প্রতিবেদক

৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৩০ পিএম


জাতিসংঘ সফরে বাংলাদেশের স্বার্থ ও সম্ভাবনা তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী: মাহদী আমিন

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চার দিনের নিউইয়র্ক সফরে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা গুরুত্ব পেয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সফরে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জনশক্তি রপ্তানি, জ্বালানি নিরাপত্তা, আঞ্চলিক সহযোগিতা, রোহিঙ্গা সংকট, স্বাস্থ্য, জলবায়ু ও আন্তর্জাতিক শান্তিসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

মাহদী আমিন বলেন, চার কর্মদিবসের সফরে প্রধানমন্ত্রী বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ ও সম্ভাবনার বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন। এ সময় তিনি ১১টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকসহ মোট ৩০টি আনুষ্ঠানিক কর্মসূচিতে অংশ নেন।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র জানান, প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচির মধ্যে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদকেন্দ্রিক আটটি আয়োজন, চারটি উচ্চপর্যায়ের পার্শ্ব-ইভেন্ট এবং ১১টি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক ছিল। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে আরও কয়েকটি বৈঠকে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। সব মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সফরসঙ্গীরা প্রায় ৮০টি কর্মসূচিতে অংশ নেন।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী গণতন্ত্র, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, মানবাধিকার, আইনের শাসন, বাকস্বাধীনতা, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলাসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন অগ্রাধিকারের বিষয় তুলে ধরেন।

তিনি সরকারের ‘থ্রি-আর’—রিকভারি, রিস্টোরেশন অ্যান্ড রিকনস্ট্রাকশন—কৌশলের কথা তুলে ধরেন। পাশাপাশি ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার কার্ড, হেলথ কার্ড ও প্রস্তাবিত ইউনিভার্সাল কার্ডের মতো সামাজিক সুরক্ষা উদ্যোগের বিষয়ও তুলে ধরেন। জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে তিনি সমৃদ্ধ, স্বাবলম্বী ও কল্যাণমুখী বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্যও তুলে ধরেন।

মাহদী আমিন বলেন, মানবসম্পদ উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উদ্যোক্তা তৈরি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবোটিক্সের ব্যবহার সম্প্রসারণ নিয়েও প্রধানমন্ত্রীর পরিকল্পনা আলোচনায় এসেছে।

সফরে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। এ ক্ষেত্রে আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ, ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন, তিস্তা মাস্টারপ্ল্যান ও পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং সৌর ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে জলবায়ু অর্থায়ন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়।

বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার যৌথ আয়োজনে ধাত্রীবিদ্যা ও মাতৃস্বাস্থ্যবিষয়ক একটি বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনার কথা জানান। এর মধ্যে ৮০ শতাংশ নারী থাকার কথা উল্লেখ করে ইউনিয়ন থেকে উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায় পর্যন্ত স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও সফরে আলোচনা হয়। বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার যৌথ আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছায় ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে পাঁচ দফা রূপরেখা তুলে ধরেন। এতে মানবিক সহায়তা, মানবাধিকার, ন্যায়বিচার ও আঞ্চলিক সহযোগিতার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।

দ্বিপক্ষীয় বৈঠকগুলোতে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জনশক্তি রপ্তানি, জ্বালানি নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সহযোগিতার মতো বিষয় আলোচনায় আসে বলে জানান মাহদী আমিন। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে বৈঠকে জনশক্তি রপ্তানি ও বিনিয়োগ এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনায় আঞ্চলিক সহযোগিতা ও স্থিতিশীলতার বিষয় গুরুত্ব পায়।

সফরকালে প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ মহাসচিব, বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট, গেটস ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধি, আন্তর্জাতিক পিস ইনস্টিটিউটের কর্মকর্তা এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। এসব আলোচনায় উন্নয়ন সহযোগিতা, বিনিয়োগ ও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার বিষয় উঠে আসে।

মাহদী আমিন জানান, ওয়াল স্ট্রিটের ২৫ জনের বেশি বিনিয়োগকারীর সঙ্গে আলোচনায় বাংলাদেশের আর্থিক খাতে বিনিয়োগ ও নতুন বন্ড চালুর বিষয়েও আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে। পাশাপাশি ১১টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তির প্রেক্ষাপটে বোয়িংয়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক হয়।

প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানও সফরকালে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেন। তিনি আটটি কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের পাশাপাশি তিনটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে সফরের মাধ্যমে কী বার্তা দেওয়া হয়েছে—এমন প্রশ্নের জবাবে মাহদী আমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রা, আত্মনির্ভরশীল ও আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের পরিকল্পনা এবং বৈশ্বিক শান্তিতে বাংলাদেশের ভূমিকার বিষয় তুলে ধরেছেন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ সমতা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক স্বার্থ ও মর্যাদার ভিত্তিতে দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতা বাড়াতে চায়। একই সঙ্গে আইনের শাসন, মানবাধিকার ও বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

মাহদী আমিনের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘ সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বের পরিধি বাড়ানোর পাশাপাশি বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের স্বার্থ ও সম্ভাবনাগুলো তুলে ধরা। এ সময় বিভিন্ন দেশের সঙ্গে অংশীদারত্ব, বিনিয়োগ ও বাণিজ্য বাড়ানোর আগ্রহও প্রকাশ করা হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব এএএম সালেহ শিবলী, অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন, প্রধানমন্ত্রীর স্পিচ রাইটার মাহফুজুর রহমান, উপ-প্রেস সচিব হাসান শিপলু, উপ-প্রেস সচিব মো. সুজাউদ্দৌলা (সুজন মাহমুদ), সহকারী প্রেস সচিব শাহরিয়ার পামির এবং সহকারী প্রেস সচিব কেএম নাজমুল হক উপস্থিত ছিলেন।

Ads