কালের সাক্ষী হয়ে পড়ে আছে দ: এশিয়ার বৃহত্তম মোহাম্মদীয়া অয়েল অ্যান্ড রাইস মিল

মো. নাঈম হাসান ঈমন, ঝালকাঠি জেলা প্রতিনিধি

০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৭:৩১ পিএম


কালের সাক্ষী হয়ে পড়ে আছে দ: এশিয়ার বৃহত্তম মোহাম্মদীয়া অয়েল অ্যান্ড রাইস মিল

ছবি- প্রতিদিনেরচিত্র বিডি।

 

৪০বছর ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে ঝালকাঠির মোহাম্মদিয়া অয়েল অ্যান্ড রাইস মিল। ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলাটি একটি প্রাচীন বানিজ্যিক নগরী ছিলো যার অন্যতম এক প্রাচীন নিদর্শন রয়ে গেছে মোহাম্মদীয়া অয়েল অ্যান্ড রাইস মিল কলবাড়িতে। 

 

প্রায় ২০০ বছরের পুরনো প্রাচীন শিল্পাঞ্চলের প্রমান রেখে এখনো দাঁড়িয়ে আছে দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম মিলের ধ্বংসাবশেষ। নলছিটি শহরে প্রতিষ্ঠিত চাল, ডাল, আটা ও ভোজ্য তেল সরবরাহে বিশেষ অবদান ছিল মিলটির। নানা জটিলতায় ১৯৮৪ সালের দিকে বন্ধ হয়ে যায় মিলের চাকা। কালের সাক্ষী হয়ে এখনো পড়ে আছে মিলটির বিশালাকৃতির বয়লার ও যন্ত্রপাতি। তবে এর বেশির ভাগ দামি যন্ত্রাংশ চুরি হয়ে যাচ্ছে। কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি দখল করে প্রভাবশালীরা গড়েছেন বসতিসহ বিভিন্ন স্থাপনা।

 

 

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, নদীর তীরে পরে আছে একটি বিশালাকৃতির বয়লারের চেম্বার। অযত্নে অবহেলায় ভাড়ি লোহার যন্ত্রপাতি মরিচা ধরে পরে আছে। পুরনো দেয়াল গুলির সাথে টিনের ঝুপড়ি তুলে আশ্রয় নিয়েছেন অনেকে। তবে সুগন্ধার তীরে পরে থাকা অয়েল প্রপেলার সাপ্লাই পাইপ যেন ডেকে ডেকে তার সেই যৌবনের ইতিহাস শোনাতে চায়, যখন গুরুম গুরুম শব্দে ঘুরতো মোহাম্মদীয়া অয়েল অ্যান্ড রাইস মিলের বিশাল বিশাল চাকা।

 

স্থানীয়দের মতে পাকিস্তান ভাগের পরে এর মালিকানা নিয়ে দন্দ্ব শুরু হয়, সর্বশেষ স্বাধীনতা যুদ্ধের পরে পাকিস্তানের মালিকপক্ষ পাকিস্তানে ফেরত চলে গেলে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। সারাদিন কর্মব্যস্ততায় কত হাজারো লোকের ঘামে আর শ্রমে চলা কলকারখানার কলকব্জাগুলো আজ পরে আছে কেবলই নিথর। কোনো শব্দ নেই, কোনো কোলাহল নেই, লোহালক্করে মরিচা ধরে পরে আছে সুনশান নিরবতায়। মিলটির অধিকাংশ যায়গা বিভিন্নভাবে দখলদারদের পেটে চলে গেছে। পাশেই গড়ে উঠেছে কয়েকটি করাতকল,পরিত্যক্ত যায়গায় আশ্রয় হয়েছে কয়েকজনের। তারা সরকারের অনুমতি নিয়ে টিনের চাল দিয়ে থাকছেন কোনোমতে।

 

 

অনুসন্ধান করে জানা গেছে, ১৯৫০ সালের দিকে প্রায় ২০০ মেশিন নিয়ে মোহাম্মদিয়া অয়েল অ্যান্ড রাইস মিলের যাত্রা শুরু করেন গুজরাটের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ জামাল। তৎকালীন ঝালকাঠি মহকুমার নলছিটি বন্দরের প্রাণকেন্দ্রে সুগন্ধা নদীর তীরে প্রতিষ্ঠিত হয় চাল, ডাল, আটা ও ভোজ্য তেল সরবরাহে বিশেষ অবদান রাখা ডিজেল ও কয়লায় চালিত এই মিলটি। পাকিস্তানি শাসনামলে উপমহাদেশের ইতিহাসে যে কয়টি অয়েল অ্যান্ড রাইস মিলের নাম পাওয়া যায়, মোহাম্মদিয়া অয়েল অ্যান্ড রাইস মিল এর অন্যতম। মোহাম্মদিয়া অয়েল অ্যান্ড রাইস মিলের পাশেই ছিল ছোট নদীবন্দর। মিল থেকে উৎপাদিত পণ্য জাহাজে সরবরাহের জন্য নদী পর্যন্ত তৈরি করা হয় রেললাইন। সুগন্ধা নদীপথে বড় বড় নৌকায় মিলটির উৎপাদিত পণ্য দক্ষিণাঞ্চলের চাহিদা মিটিয়ে দেশ ও বিদেশে পৌঁছে দেওয়া হতো। প্রতিষ্ঠার কিছুদিনের মধ্যেই মিলটি একটি লাভজনক শিল্পে পরিণত হয়। ১৯৬০ থেকে ১৯৭০ দশকের মধ্যে মিলে পাঁচ শতাধিক শ্রমিক কাজ করত। ১৯৭৪ সালে মিলের মালিক মোহাম্মদ জামালের মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে মোহাম্মদ আমিন আনোয়ার মিলটির দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ধীরে ধীরে লোকসানের মুখে পড়ে মিলটি। পরে ১৯৮৪ সালে উৎপাদন বন্ধ ঘোষণা করেন।

 

স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানি মালিকের এক সন্তানকে ততকালীন সন্ত্রাসীরা গুলি করে হত্যা করে। সেই শোকে মারা যান তার পিতাও। এরপর একমাত্র ছোট ছেলে আমীন মোহাম্মদ এখানে ছিলেন। কিন্তু স্থানীয় কিছু লোকজন এটিকে দখল করে নিতে চেয়েছিলেন। তাদের একটি চক্র এবং সর্বহারা পার্টির আগ্রাসনের তীব্র ত্রাসে তিনি টিকতে পারছিলেন না। অবশেষে বানারীপাড়ার একজন ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করে দেন। কিন্তু সেই চক্রের সাথে ততকালীন সরকারি খাদ্যশস্য মন্ত্রণালয়ের কিছু লোকের সাথে সেই চক্রটি মিলে সরকারি ধানের একটি চালান পরিবহনের সময় অনিয়ম করে। সেই অনিয়মের দ্বায় চাপাতে পাকিস্তানি মালিকের নামে মামলা করে খাদ্যশস্য বিভাগ।

 

মিলটির মালিক আমিন আনোয়ারও করোনায় আক্রান্ত হয়ে গত ২০২০ সালে মারা যান। এরপর তাঁর স্ত্রী ইসরাত আমীন স্বামীর সম্পত্তি দেখাশোনা করে মিলটি আর চালু করতে পারেননি।

 

 

স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহল মিলের মূল্যবান সম্পদ ও কিছু পরিমাণ জমি দখল করে নেয়। ওই জমিতে তাঁরা বসতঘরসহ বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করেন। তৎকালীন মিলের কাজের অংশীদার শাহজাহান মিয়া মজনু নামের এক ব্যক্তি মিলটির সম্পত্তির মালিকানা দাবি করে এর কিছু অংশ ভোগদখল করা শুরু করেন। বর্তমানে এ নিয়ে একটি মামলা বিচারাধীন।

 

মিলের ১১ বিঘা সম্পত্তির মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ জমি বর্তমানে বেদখল রয়েছে। কারখানার অনেক মূল্যবান যন্ত্রাংশ এখনো পরিত্যক্ত অবস্থায় দেখা যায়। বর্তমানে ওই জমিতে একটি মসজিদ, কবরস্থান ও কয়েকটি আবাসস্থল রয়েছে। জমির বর্তমান মূল্যমান বিবেচনায় কাঠাপ্রতি দাম বর্তমানে ১২ লাখ টাকার ওপরে। সেই হিসাবে ১১ বিঘা জমির বাজারদর প্রায় ৪৫ কোটি টাকা।

 

মিলটির ইতিহাস সম্পর্কে জানার জন্য কথা হয় শতবর্ষ বয়সী বৃদ্ধা বিন্দু মাসীর সাথে। তিনি বলেন, বৃটিশ আমল, পাকিস্তান আমল থেকে আজকের স্বাধীন দেশ সব কিছুই তার চোখে এখনো জলন্ত এক চলচ্চিত্র। এ মিলে প্রায় ৩৬০ টি তেলের ঘানি ছিলো, যা একত্রে চালু হলে ৩ মাইল দূরের মাটি কেপে উঠতো। তখন এই অঞ্চলের বেশ রমরমা অবস্থা ছিলো।

 

মিলের মালিকপক্ষের লোকজন জানান, দেশ স্বাধীনের আগে খাদ্য অধিদপ্তর মোহাম্মদিয়া অয়েল অ্যান্ড রাইস মিলের পাঁচ-ছয়টি গুদাম ভাড়া নিয়ে তাদের খাদ্যপণ্য মজুদ রাখে। কিন্তু স্বাধীনতাযুদ্ধ চলাকালীন গুদাম থেকে ওই খাদ্যপণ্য লুটপাট করা হয়। পরবর্তী সময়ে খাদ্য অধিদপ্তর ক্ষতিপূরণ বাবদ মিল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করে। পাশাপাশি মিল কর্তৃপক্ষও তাদের বকেয়া গুদাম ভাড়া বাবদ আদালতে একটি মামলা করে। মামলা দুটি দীর্ঘদিন সময় চলার পর ২০২২ সালে ক্ষতিপূরণ বাবদ আদালত থেকে ধার্য করা অর্থ খাদ্য অধিদপ্তরকে পরিশোধ করে দেয় মিল কর্তৃপক্ষ।

 

 

স্থানীয় সার ব্যবসায়ী কামাল হোসেন বলেন, এক সময় এই তেলের মিলটি পুরো জেলার গৌরব ছিলো। যখন চালু হতো তখন দশ মাইল দূর থেকেই গুরুম গুরুম আওয়াজে বোঝা যেত যে অয়েল মিলের প্রপেলার ঘুরছে। তখন কলকাতা থেকে বানিজ্যের জন্য নৌপথে এখানে ব্যবসায়ীরা আসতো, তেল নিতো। কয়েকশো লোক দিন রাত এখানে কাজ করতো। কিন্তু কি কারনে হঠাৎ মিলটি বন্ধ হয়ে গেল। অনেকেই মেশিনের অনেক কিছু লুটপাট করে নিয়ে গেল। আর এক সময় ধিরে ধিরে নির্জন হয়ে গেল যায়গাটি।

 

এই মিলের মূল মালিক পাকিস্তানের ছিলেন বলে জানা যায়। স্বাধীনতা যুদ্ধের পরে তারা পাকিস্তানে ফেরত চলে যান। তবে পাকিস্তানের নাগরিক আমীন মোহাম্মদের থেকে ক্রয় করে এর পুরো অংশের বাংলাদেশী মালিকানা দাবি করা মো: শাহজাহান মিয়া মজনু'র ছেলে ইলিয়াস হোসেন বলেন, আমার বাবা এখানে এসেছিলেন এই মিলটি ক্রয় করে ব্যবসার জন্য। আমীন মোহাম্মদ যখন প্রানভয়ে ছিলেন যে সরেবহারার তাকে হত্যা করতে পারে। তখন তিনি জৌনপুর পীর সাহেবের স্বরনাপন্ন হন।পীর সাহেবের ঘনিষ্ঠ বড় ব্যবসায়ী ছিলেন শাহজাহান মিয়া মজনু। তিনিই মজনু মিয়াকে এই মিল ক্রয়ের পরামর্শ দেন। যেহেতু পাকিস্তানি মালিকের প্রান শংকায় ছিলো তাই তিনি সেটি হস্তান্তর করে চলে যান। কিন্তু মামলা মোকদ্দমার চক্করে প্রায় অর্ধশত বছরের লড়াই চলছে আমাদের, এক প্রকার নি:স্ব হবার পথে আমরা। বাবা তার যৌবন বয়সে এখানে এসেছিলেন। এখন বার্ধক্যের শেষে পৌঁছে গেছেন। বাবা সারা জীবন এই মিলটির জন্য লড়াই করে গেছেন।

 

তিনি আরও বলেন, বৃটিশ আমলের দক্ষিন এশিয়ার বৃহত্তম এই অয়েল মিলটি আমরা পাকিস্তানি মালিকের থেকে ১৯৮০ সালের দিকে কিনে এখানে এসেছিলাম। তখন আমার বাবার চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ ব্যবসা ছিলো। এখানে আসার পরে অনেক হয়রানিমূলক মিথ্যা মামলার সাথে আমাদেরকে প্রায় ৪৩ বছর লড়াই করতে হয়েছে। অবশেষে সত্যের বিজয় হয়েছে। দেশের সর্বোচ্চ আদালতে আমরা জিতেছি। এখানে আমরা চেয়েছিলাম আবাসিক এলাকা বানাতে। কিন্তু তারা আমাকে প্রস্তাব দিয়েছে যেহেতু ঐতিহ্য সম্বলিত এবং নদীর তীর ঘেষে এই যায়গায় মনোরম পরিবেশ তাই পরিকল্পিত একটি পার্ক নির্মাণ করা যেতে পারে। যদি সরকার এটিকে ভালোভাবে সংরক্ষণ করে পার্ক নির্মাণের উদ্যোগ নেয় তাহলে আলোচনা করে আমরা সর্বোচ্চ সহযোগিতা করার চেষ্টা করবো।

 

উপজেলার ঐতিহ্য রক্ষায় কাজ করা সমাজকর্মী বালী তূর্য বলেন, এই ঐতিহ্যটি রক্ষায় ইতোমধ্যে মাননীয় সংসদ সদস্য মহোদয় বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করেছি। যাতে এই যায়গাটিকে সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করে একটি পার্ক নির্মানের ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু নদীর তীরবর্তী স্থান,শহরের বর্জ্য ফেলে পানি এবং বাতাস দুষন করা হচ্ছে।

 

এখানে নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সহ একটি পার্ক নির্মান করা হলে আমাদের বয়স্ক নাগরিকদের সকাল-বিকাল হাটার যায়গাও হবে, আমাদের নতুন প্রজন্ম আমাদের এই প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী উপজেলার ইতিহাস সম্পর্কেও জানতে পারবে। মালিকপক্ষের সাথেও কথা বলেছি। আশা করি সরকারি কর্তৃপক্ষ এবং মালিকপক্ষকে নিয়ে সমন্বয় করে এই ঐতিহ্যবাহী স্থানটিকে সংরক্ষণের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।

 

 

স্থানীয় বাসিন্দা শাহাদাত হোসেন মনু বলেন,  এখানে ব্যাপক কর্মযজ্ঞ ছিল। বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর মিলটির মালামাল চুরি হয়ে যাচ্ছে। মিল মালিক আমিন আনোয়ারের ছেলে আনিসুর রহমান বাপ্পি বলেন, স্থানীয় একটি মহল মিলের মূল্যবান সম্পদ ও কিছু পরিমাণ জমি দখল করে নেয়। তৎকালীন মিলের কাজের অংশীদার শাহজাহান মিয়া মজনু মিলটির সম্পত্তির মালিকানা দাবি করে এর কিছু অংশ ভোগদখল করা শুরু করেন। বর্তমানে এ নিয়ে একটি মামলা বিচারাধীন। মামলা জটিলতা শেষ হলে আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন একটি মিল প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে।

 

মিল মালিক আমিন আনোয়ারের স্ত্রী ইসরাত আমীন বলেন, শ্বশুরের প্রতিষ্ঠিত মিলটির সম্পত্তি দেখাশোনার পাশাপাশি এখনো এর স্মৃতি আকড়ে বেঁচে আছি। সুযোগ পেলে স্থানীয়দের জন্য আবারও নতুন কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে চাই।

 

নলছিটি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, এই মিলটির মামলা জটিলতা শেষ হলে নতুন উদ্যমে মিলটি আবার চালু করতে চাইলে তাদের প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা প্রদান করা হবে।

Ads