স্বাধীন ও সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করাই মধ্যপ্রাচ্য সংকটের একমাত্র সমাধান

মো. জিল্লুর রহমান

১৬ অক্টোবর ২০২৩, ১২:২০ পিএম


স্বাধীন ও সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করাই মধ্যপ্রাচ্য সংকটের একমাত্র সমাধান

মো. জিল্লুর রহমান


সাম্প্রতিক বৈশ্বিক সংকটগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী সংকট হলো মধ্যপ্রাচ্যের ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল সংকট। ইসরায়েলকে বৃহৎ শক্তিগুলির একছত্র সমার্থন ও পৃষ্ঠপোষকতার কারণে জাতিসংঘ কিংবা কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থার কেউই এই দ্বন্দ্ব মীমাংসা করতে পারছে না। সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে নতুন নতুন সংকট তৈরি হচ্ছে। মৃত্যুর খাতায় যুক্ত হচ্ছে বহু অসহায় ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলি। আন্তর্জাতিক রাজনীতির নিয়ন্ত্রক রাষ্ট্রগুলোর একছত্র সমর্থন ইসরায়েলের পক্ষে হওয়ায় ফিলিস্তিনিরাই এই সংকটে সবচেয়ে বেশি অসহায়। তাদের কান্না আর হাহাকারে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠলেও তাদের স্বাধীন ও সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন অধরাই থেকে গেছে।

 

সাম্প্রতিক সময়ে গত ৭ অক্টোবর, ২০২৩ সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাসের আকস্মিক রকেট হামলায় এ পর্যন্ত অন্তত ১,৩০০ ইসরায়েলি নিহত এবং আহত হয়েছে কয়েক হাজার মানুষ। গাজা উপত্যকা থেকে ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চল লক্ষ্য করে ৫ হাজার রকেট ছোড়া হলে এই ঘটনার সূত্রপাত ঘটে। অন্যদিকে ইসরায়েলের পাল্টা হামলায় গাজা উপত্যকায় প্রাণ গেছে অন্তত ১,৯০০ জন ফিলিস্তিনি এবং আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৬ হাজারের অধিক। হামাসের আকস্মিক হামলার পর ইসরায়েলি বাহিনী গাজার বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। চলমান এই যুদ্ধ পরিস্থিতিতে গাজার প্রায় ২২ লাখ বাসিন্দা ইসরায়েলের আগ্রাসী আচরণে পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসবিহীন অবরুদ্ধ জীবন যাপন শুরু করেছে। ঘনবসতি–অধ্যুষিত এলাকাগুলোয় নির্বিচারে বোমা বর্ষণ করছে। এসব হামলার পাল্টা জবাবে হামাস নিক্ষিপ্ত রকেটের বেশির ভাগই মাঝ আকাশে প্রতিহত করেছে ইসরায়েল। হামাস বন্দী ফিলিস্তিনিদের মুক্তির দাবিতে নতুন করে আবার সংঘাতে লিপ্ত হয়। বন্দী ইসরায়েলও সেনাদের মুক্তির শর্ত দিয়ে রেখেছে।

 

এর আগে চলতি বছরের জুলাইয়ে পশ্চিম তীরের জেনিন শরণার্থী শিবিরে ইসরায়েল বাহিনী হামলা চালিয়েছিল। এই আক্রমণ ছিল গত দুই দশকের মধ্যে ইসরায়েলের পরিচালিত সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা। প্রথমে আকাশ থেকে ড্রোন আক্রমণ, পরে সাঁজোয়া যান এবং বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় শরণার্থীদের আশ্রয়স্থল। এর আগে ২০০২ সালের এপ্রিল মাসে ইসরায়েলি বাহিনী এই এলাকায় পূর্ণমাত্রায় সামরিক অভিযান পরিচালনা করে, যাতে ৫২ জন ফিলিস্তিনি ও ২৩ জন ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়েছিল। এসব হামলায় আন্তর্জাতিক পরাশক্তি সমাজের প্রতিক্রিয়া বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারা সবসময়ই ইসরায়েলের তথাকথিত আত্মরক্ষার অধিকারের পক্ষে সোচ্চার হয়েছে।

 

তাছাড়া, ১৯৬৭ সালে ছয় দিনের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে পশ্চিম তীরের বেশিরভাগ অংশ ইসরায়েল দখল করে নেয়। ফলে শরণার্থীতে পরিণত হয় ফিলিস্তিনের লাখো মানুষ। জীবন ও জীবিকার তাগিদে ব্যাপক মানুষ বাস্তুচ্যুত ও শরণার্থীতে পরিণত হয়ে প্রতিবেশী আরব দেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে বসবাস করছে। নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদকৃত ফিলিস্তিনিদের বদলে সেখানে আশ্রয় গেড়েছে ইসরায়েলের প্রায় পাঁচ লাখ নাগরিক। ইসরায়েলের ভাষায় যারা অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী, ফিলিস্তিনের ভাষায় তারা কিন্তু মাতৃভূমির অধিকার রক্ষায় অকুতোভয় সংগ্রামী যোদ্ধা।

 

ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৮৯৭ সাল থেকে মূলত ইহুদিরা নিজেদের জন্য আলাদা একটি রাষ্ট্র গড়ে তুলতে চেয়েছিল। ভূ-মধ্যসাগরের পূর্বে ১০,৪২৯ বর্গমাইল ব্যাপী ফিলিস্তিন দেশটি ছিল তুরস্কের উসমানীয় খেলাফতের অধীন এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তারা ব্রিটেনবিরোধী জোটে ছিল। ব্রিটিশরা যুদ্ধে জয়ের আশায় ফিলিস্তিনদের সহযোগিতা চায়। ১৯১৭ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তুরস্কের সেনাদের হাত থেকে জেরুজালেম দখল করে ব্রিটেন। সেই থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত ফিলিস্তিনের ভূমি ব্রিটেনের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ১৯১৭ সালের ২ নভেম্বর তৎকালীন ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেমস আর্থার বেলফোর ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে ব্রিটেনের অবস্থানের কথা ঘোষণা করে। সে 'বেলফোর ঘোষণা'ই ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগের সূচনা করে। এরপরে গাজা থেকে দুই মাইল উত্তরে কিবুটস এলাকায় ১৯৩০ এর দশকে পোল্যান্ড থেকে আসা ইহুদীরা কৃষি খামার গড়ে তুলতে শুরু করে। ইহুদিদের পাশেই ছিল ফিলিস্তিনী আরবদের বসবাস। সেখানে আরবদেরও কৃষি খামার ছিল। তারা কয়েক শতাব্দী ধরে সেখানে বন্ধুত্বপূর্ণভাবে বসবাস করে আসছিল। তবে ধীরে ধীরে ফিলিস্তিনীরা বুঝতে পারলেন যে তারা তাদের দেশের ভূমি হারাচ্ছে। ইহুদিরা দলে-দলে সেখানে জমি ক্রয় করতে থাকে আর বাড়তে থাকে তাদের ক্ষমতার দাপট। অসহায় হয়ে পড়ে ফিলিস্তিনিরা।

 

অন্যদিকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটেনের প্রয়োজনে দুর্লভ বোমা তৈরির উপকরণ কৃত্রিম ফসফরাস তৈরি করতে সক্ষম হন ইহুদি বিজ্ঞানী ড. হেইস বাইজম্যান। ফলে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী আনন্দিত হয়ে বাইজম্যানকে পুরস্কার দিতে চান। কিন্তু বাইজম্যান নগদ কোনো পুরস্কার গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়ে স্ব-জাতির জন্য ফিলিস্তিনে এক টুকরো স্বাধীন ভূমি দাবি করেন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ফিলিস্তিন ভূখন্ডটি ইহুদিদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুতি নেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ জয়ের পর ব্রিটেন ইহুদিদের স্বাধীনতা দেওয়ার অঙ্গীকারে ১৯১৮ সাল থেকে ৩০ বছর দেশটিকে নিজেদের অধীনে রাখে। মূলত এই সময়টিতেই ফিলিস্তিনকে আরবীয়শূন্য করার কাজে লাগায় ইঙ্গ-মার্কিন শক্তি। অন্যদিকে, ১৯২০ সালে জাতিপুঞ্জ ঘোষণার মাধ্যমে ব্রিটিশরা ম্যান্ডেটরি প্যালেস্টাইন প্রতিষ্ঠা করে। ফিলিস্তিনে ব্রিটিশ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে দলে দলে ইহুদিরা ফিলিস্তিনে বসতি স্থাপন করতে থাকে। ব্রিটিশ সরকার একদিকে ইহুদিদের জন্য ফিলিস্তিন উন্মুক্ত করে দেয়, অন্যদিকে ব্রিটিশ বাহিনীর সহযোগিতায় ইহুদি মিলিশিয়ারা ফিলিস্তিনিদের বিতাড়িত করে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করার জন্য গড়ে তুলতে থাকে সংগঠন। এর মধ্যে প্রধান তিনটি সংগঠন ছিল ‘হাগনাহু, ইরগুন ও স্ট্যার্ন গ্যাং। যারা হত্যা, সন্ত্রাস, ধর্ষণ আর ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টির মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের বাধ্য করে ফিলিস্তিন ছেড়ে চলে যেতে। এদের গণহত্যার কথা যখন আন্তর্জাতিকভাবে প্রচার হচ্ছিল তখন পরিস্থিতিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে বেছে নেয় আত্মহননের পথ।

 

১৯৪০ সালে এসএস প্যান্ট্রিয়া নামক একটি জাহাজকে হাইফা বন্দরে উড়িয়ে দিয়ে ২৭৬ জন ইহুদিকে হত্যা করে ফিলিস্তিনিদের ওপর দোষ চাপিয়ে দেয়া হয়। এভাবে নিজেরাই নিজেদের লোক হত্যা করতে থাকে। ইংরেজদের সহযোগিতায় ইহুদিদের বসতি স্থাপন ও আবরদের উচ্ছেদকরণ দ্রুত চলতে থাকে। ১৯৪৭ সালে ২৯ নভেম্বর ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ইঙ্গ-মার্কিন চাপে জাতিসংঘে ভোট গ্রহণ করা হয়। এতে ৩৩টি রাষ্ট্র ফিলিস্তিনে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে ভোট দেয়। ১৩টি বিপক্ষে, ১০টি ভোটদানে বিরত থাকে। ফিলিস্তিনে মোট জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশ ইহুদিরা পেল ৫৭%, আর ফিলিস্তিনিরা পেল ৪৩%। ইহুদি রাষ্ট্রের উত্তর-পশ্চিম সীমানা ছিল অনির্ধারিত। পরবর্তীতে এই সীমানাকে কেন্দ্র করেই ইসরায়েল-ফিলিস্তিন বিরোধ শুরু হয়।

 

১৯৪৮ সালের ১২ মে রাত ১২টায় স্বাধীন ইসরায়েল রাষ্ট্র ঘোষণা করা হয়। মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে পূর্ব পরিকল্পনা অনুসারে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়। অতঃপর সোভিয়েত ইউনিয়নসহ অন্যান্য দেশ। ইসরায়েলের আধিপত্যবাদ নীতির কারণে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র হিসেবে বর্ণহীন হয়ে পড়ে। ইয়াসির আরাফাতের নেতৃত্বে দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের পর ১৯৮৮ সালের ১৫ নভেম্বর আলজিয়ার্স শহরে প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশন (পিএলও) ও প্যালেস্টাইন জাতীয় পরিষদ (পিএনসি) একপক্ষীয়ভাবে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা ঘোষণা করে। এ ফিলিস্তিন ছিল নির্বাসনে ঘোষিত একটি রাষ্ট্র, অথচ যে অঞ্চলগুলো পিএলওর দাবি ছিল, স্বাধীনতা ঘোষণাকালে সে অঞ্চলে পিএলওর নিয়ন্ত্রণে ছিল না। ব্রিটেন যখন ইহুদিদের জন্য স্বাধীন ভূখন্ডের ব্যবস্থা করে সেটি ছিল মূলত দ্বি-রাষ্ট্রতত্ত্ব কিন্তু সেটা আজও বাস্তবায়িত হয় নি।

 

দীর্ঘদিন ধরে চলমান ইসরায়েল-ফিলিস্তিন দ্বন্দ্ব নিরসনের অন্যতম শর্তই ছিল দুপক্ষের জন্য স্বতন্ত্র দুটি দেশ। পুরনো দ্বি-রাষ্ট্রতত্ত্বটি ১৯৯৩ সালে শান্তি আলোচনার মাধ্যমে আরও গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। দুপক্ষই এই তত্ত্বকে মেনে নিয়ে চলতে থাকে। শান্তি আলোচনার মধ্যস্থতাকারী যুক্তরাষ্ট্র সবসময় দ্বি-রাষ্ট্রতত্ত্বের কথা বললেও সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একতরফাভাবে আন্তর্জাতিক রীতিনীতি ও প্রতিবাদ উপেক্ষা করে ইসরায়েলে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস তেল আবিব থেকে সরিয়ে এনে জেরুজালেমে প্রতিষ্ঠা করে। এ ঘটনায় ফিলিস্তিনিরা বিশেষ করে সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস প্রচন্ডভাবে ক্ষুব্ধ হয়েছিল। যেদিন মার্কিন দূতাবাস সরিয়ে এনে জেরুজালেমে উদ্বোধন করা হয় সেদিন ফিলিস্তিন অংশে গাজা রক্তাক্ত প্রান্তরে পরিণত হয়েছিল। ইসরায়েলি সেনাদের হামলায় সেদিন নিহত হয়েছিল ৫৮ জন এবং আহত হয়েছিল প্রায় তিন হাজার।

 

রাজনৈতিক টানাপোড়েনে এবং আরব রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক বিচ্ছিন্নতায় পরিস্থিতি এখন  অনেকটাই বদলে গেছে। ইসরায়েলের সাথে বৈরি সম্পর্ক ছিলো এমন অনেক মুসলিম দেশ এখন ইসরায়েলের সাথে স্বাভাবিক সম্পর্ক তৈরি করেছে। হামাস বলছে এ ধরনের সম্পর্ক স্বাধীন ও সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথে প্রধান অন্তরায় এবং তাদের মূল দাবী ১৯৬৭ সালে আরব ইসরায়েল যুদ্ধের অবৈধ দখলকৃত জায়গা ইসরায়েলকে ছেড়ে দিতে হবে। এক্ষেত্রে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন সংকটের তাই আদৌ সমাধান হবে কিনা তা অনিশ্চিত। ইতিমধ্যে তাদের মধ্যে অনেক মীমাংসা চুক্তি হলেও কার্যত কোনোটিই সুখবর আনতে পারেনি। পরাশক্তি দেশগুলোর একছত্র ইসরায়েল সমর্থন অনেকাংশেই এই সংকটকে টিকিয়ে রেখেছে বলে অনেক বিশ্লেষকরা মনে করেন। তাদের মতে, স্বাধীন ও সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করাই মধ্যপ্রাচ্য সংকটের একমাত্র সমাধান।

 

ব্যাংকার ও কলাম লেখক,
সতিশ সরকার রোড, গেণ্ডারিয়া, ঢাকা

Ads