জলবায়ু ঝুঁকিতে লাখো মানুষ বাস্তুহারা
১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০৩:৪৪ এএম
বাংলাদেশ একটি প্রাকৃতিক দূর্যোগপ্রবণ দেশ হওয়াতে প্রতিনিয়ত কোনো না কোনো দূর্যোগ আঘাতহানে। দূর্যোগ প্রতিরোধের অক্ষমতার কারণে অভ্যন্তরীন ক্ষয়ক্ষতির পরিমান বেড়ে যায়। খাদ্য, সুপেয় পানি সংকটসহ বাসস্থানের প্রবল সংকট দেখা যায়। আন্তর্জাতিক একটি পরিসংখ্যানে এসেছে, প্রাকৃতিক দূর্যোগের কারণে বিগত ছয় বছরে বাংলাদেশের ৫৭ লাখ মানুষ বাস্তুহারা হয়েছে। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে মাঝেমধ্যেই ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছাস সংঘটিত হতে দেখা যায়। এসব দূর্যোগ মোকাবিলার অসক্ষমতায় প্রাথমিকভাবে হাজার হাজার মানুষ বাস্তুহারা হয়ে পড়ে। তারপর ক্ষতিগ্রস্থ মানুষগুলো ভিটে-মাটি, জায়গা-জমি ও কাজকর্মের সুযোগ হারিয়ে দেশের অন্যত্র চলে যায় বৈ কী যেতে বাধ্য হয়। পরবর্তীতে বাস্তুহারা এই মানুষগুলোর বেশিরভাগই রাজধানী ঢাকায় আশ্রয় নেয়। ঢাকায় বাড়তে তাকে জনসংখ্যা। পার্শ্ববর্তী দেশ সন্নিকটে হওয়ায় অনেকে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতেও আশ্রয় নেয়। কিন্তু এই বাস্তচ্যুত মানুষগুলো কী অন্যত্র আশ্রয় নিয়ে সুখী হতে পারে? আগের মত কী তাদের সংসার সাজাতে পারে? বরং তাদের অবস্থা আগের চেয়ে আরো খারাপ হয়ে যায়। নিজস্ব জমি-জমা না থাকায় তারা আয় করতে পারে না। ফলে বেড়ে যায় দরিদ্রতা। অনাহারে, অর্ধাহারে জীবনযাপন করে কাটাতে হয় দূর্যোগে বাস্তুচ্যুতদের।
এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে দেশে ক্রমশ জলবায়ু শরণার্থীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। দুর ভবিষ্যতে প্রাকৃতিক দূর্যোগ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা আরো বেশি হবে, তা এখনই অনুমান করা যায়। ইতোমধ্যে দেশে পদ্মা নদীর ভাঙ্গনে গ্রামের পর গ্রাম মানুষ তাদের বসতি হারাতে শুরু করেছে। বর্ষা মৌসুমের আগেও যারা বিত্তশালী ছিল, যাদের কাজের সুযোগ ছিল, তারাই আজ বাস্তুহারা। পদ্মার আগ্রাসনে বসত-বাড়ি সব কিছু বিলীন হয়ে গেছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, যদি সমুদ্রের পানির উচ্চতা ১০০ সেন্টিমিটার বেড়ে যায়, তাহলে দেশের উপকূলবর্তী এলাকার দুই কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হবে। একদিকে পদ্মা, যমুনার আগ্রাসনে বাস্তুচ্যুত মানুষ, অপরদিকে সমুদ্রের আগ্রাসনে বাস্তুচ্যুত মানুষ, এত মানুষের ঠাই কোথায় মিলবে? জানি, এর একটি বিরাট অংশ ঢাকায় পাড়ি জমাবে। জীবন-জীবিকার তাগিদে ভীড় করবে। আশ্রয়ের জন্য তাঁরা বস্তি গড়ে তুলবে। ঢাকাসহ অন্যান্য শহরে যারা ইতোমধ্যে পাড়ি জমিয়েছে, তারাও কোনো না কোনো দূর্যোগের শিকার। তবে তাঁদের অর্থনেতিক অবস্থা দিনের পর দিন খারাপ হচ্ছে। রোগ শোকে তারা জর্জরিত। শিক্ষালাভের সুযোগ নেই নতুন জন্মকৃত শিশুদের। ঢাকায় অবস্থানরত মোট জনসংখ্যার ৩০ ভাগ ভাসমান। এবং এদের মধ্যে কমপক্ষে ৮০ ভাগ জলবায়ু উদ্বাস্তু বা বাস্তুহারা মানুষ। কিন্তু এত সংখ্যক মানুষের জন্য কী গৃহায়ন করা সম্ভব? না কী খাদ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা দেওয়া সম্ভব?
বাংলাদেশের উপকূলে টর্নেডোর আঘাত ভয়াবহ। বিগত দিনে দেখেছি, এর ধ্বংসযজ্ঞ এতই নিঁখুত যে সেখানে কিছু গাছের চিহ্ন ছাড়া দাঁড়ানো আর কোনো বস্তু থাকে না। টর্নেডো ছাড়াও ঘূর্ণিঝড়ের নিয়মিত শিকার হয় বাংলাদেশ। এছাড়া বজ্রপাত, ভুমিকম্প প্রায়ই সংঘটিত হচ্ছে। [এই নিবন্ধ রচনাকালীন আমি ভূমিকম্পের কম্পনে আতঙ্কিত হই। পরে ভূমিকম্পের বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও অনলাইন মিডিয়ায় প্রচার হতে দেখা যায়। ১২ ই সেপ্টম্বর বুধবার সকাল ১০টা ৫৩ মিনিটে সংঘটিত ভূমিকম্পের তীব্রতা ছিল ৫ দশমিক ৩। ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল ঢাকা থেকে ২৯৩ কিলোমিটার উত্তরে সীমান্ত লাগোয়া উত্তর-পূর্ব ভারতের আসামে। এর গভীরতা ছিল মাটি থেকে ১০ কিলোমিটার গভীরে। তবে এতে দেশে ক্ষয়ক্ষতির কোনো খবর পাওয়া যায়নি।] সাম্প্রতিক সময়ের প্রাকৃতিক দূর্যোগ হতে যে বিষয়টি পরিলক্ষিত হয় তাহল- বাংলাদেশে এখন বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বিশেষ করে উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে সমুদ্রের পানি বৃদ্ধির ফলে দেশের সমুদ্র উপকূলীয় বিশাল এলাকা তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি হচ্ছে। আর এই আশঙ্কা যদি সত্য হয়, তবে দেশে বাস্তুহারা মানুষের সংখ্যা কোটি ছাড়াবে। তাই বাস্তুহারা মানুষের সংখ্যা হ্রাসকরণে এখনই জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। বিশ্বের অনেক দেশই ইতোমধ্যে এ বিষয়ে কার্যক্রম শুরু করে দিযেছে। তবে আমরা কেন পিছিয়ে থাকব? তাই এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি।
লেখক: কবি ও কলামিস্ট, ঢাকা।































