চট্টগ্রামে ওয়াসার ড্রেনেজে মাটি ধসে ২ শ্রমিকের মৃত্যু: উন্নয়নের গর্তে আর কত প্রাণ?
২৩ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৪৩ এএম
চট্টগ্রাম নগরীর আগ্রাবাদ বি-ফোর এক্সেস রোড এলাকায় ওয়াসা কর্তৃক পরিচালিত স্যুয়ারেজ (পয়ঃনিষ্কাশন) প্রকল্পের কাজ চলাকালে মাটি ধসে দুই শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) ভোর ৪টার দিকে সিঙ্গাপুর মার্কেটের সামনে এই দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন রাকিব ও তুষার। এ ঘটনায় সাগর ও এরশাদ নামে আরও দুই শ্রমিক গুরুতর আহত অবস্থায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
ফায়ার সার্ভিস ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, গভীর রাতে যখন নগরবাসী ঘুমে, তখন আগ্রাবাদ এক্সেস রোডে বিশাল গর্ত খুঁড়ে ওয়াসার পাইপ বসানোর কাজ করছিলেন একদল শ্রমিক। ভোর ৪টার দিকে হঠাৎ ওপর থেকে বিশাল মাটির স্তূপ চার শ্রমিকের ওপর ধসে পড়ে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাদের উদ্ধার করে চমেক হাসপাতালে পাঠালে কর্তব্যরত চিকিৎসক দুজনকে মৃত ঘোষণা করেন। নিহত তুষারের বাড়ি দিনাজপুর জেলায় বলে প্রাথমিক তথ্যে জানা গেছে।
চট্টগ্রাম ওয়াসার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আরিফুল ইসলাম জানান, চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘সিনো হাইড্রো’র অধীনে এই স্যুয়ারেজ প্রকল্পের কাজ চলছিল। মূলত মাটির গভীরতা পরীক্ষার জন্য ‘ট্রায়াল পিট’ করার সময় এই দুর্ঘটনা ঘটে। তিনি বলেন, “আমরা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছে দুর্ঘটনার কারণ জানতে চেয়ে রিপোর্ট তলব করেছি। নিহতদের পরিবারের সাথে যোগাযোগ করা হয়েছে এবং নিয়ম অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে।”
চট্টগ্রামে মেগা প্রকল্পগুলোর কাজ চলাকালীন এমন দুর্ঘটনা এবারই প্রথম নয়। নগরীর বিভিন্ন স্থানে অপরিকল্পিত খনন এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা (Safety measures) না রেখেই গভীর রাতে কাজ করার প্রবণতা বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্ষা মৌসুমের আগে তাড়াহুড়ো করে কাজ শেষ করার চাপে প্রায়ই শ্রমিকের নিরাপত্তার বিষয়টি উপেক্ষা করা হয়।
১. নিরাপদ বেষ্টনী ও শোরিংয়ের অভাব: গভীর গর্ত করার সময় পাশের মাটি ধরে রাখার জন্য ‘শোরিং’ বা শক্তিশালী কাঠের/লোহার বেষ্টনী থাকা বাধ্যতামূলক। এই ক্ষেত্রে তা সঠিক ছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
২. নাইট শিফটে তদারকির অভাব: দিনের যানজট এড়াতে রাতে কাজ করা হলেও অভিজ্ঞ সুপারভাইজার বা পর্যাপ্ত আলোর অভাব দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
৩. ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতা: বিদেশি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো কাজের গুণমান বজায় রাখলেও স্থানীয় শ্রমিকদের সুরক্ষায় কতটুকু বিনিয়োগ করছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
আগ্রাবাদ এলাকার ব্যবসায়ীরা বলছেন, এক্সেস রোডের এই কাজ চলায় দীর্ঘদিন ধরে যানজট ও জনভোগান্তি লেগেই আছে। এখন প্রাণের বিনিময়ে হওয়া এই উন্নয়ন যেন বিষাদে রূপ নিয়েছে। মৃতদের পরিবার যেন কেবল নামমাত্র ক্ষতিপূরণ নয়, বরং আইনি সুবিচার পায়—এমনটাই দাবি নগরবাসীর।
চট্টগ্রাম মেডিকেল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই নুরুল আলম জানিয়েছেন, মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য রাখা হয়েছে এবং আহতদের সর্বোচ্চ চিকিৎসা নিশ্চিত করা হচ্ছে। ঘটনার পর থেকে এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
উন্নয়ন প্রকল্পের গতি যেমন জরুরি, শ্রমিকের জীবনের মূল্য তার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। ওয়াসা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘সিনো হাইড্রো’র উদাসীনতা ছিল কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসা জরুরি। উন্নয়নের এই বিশাল কর্মযজ্ঞ যেন কোনো শ্রমিকের শেষ শয্যায় পরিণত না হয়, সেদিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কঠোর নজরদারি এখন সময়ের দাবি।



































