অব্যবহৃত ছাদেই লুকিয়ে আছে জ্বালানি সমাধান: রুফটপ সোলারে জাতীয় অগ্রাধিকারের আহ্বান
২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০১:৪১ এএম
বাংলাদেশের টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, পরিবেশ সুরক্ষা এবং বিদ্যুৎ খাতে বৈপ্লবিক রূপান্তরের লক্ষ্যে রুফটপ সোলার (ছাদ সৌরবিদ্যুৎ) প্রযুক্তিকে দ্রুত জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে ঘোষণার দাবি জানিয়েছে নাগরিক সমাজ ও কমিউনিটি প্রতিনিধিরা।
আজ ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ রোজ বৃহস্পতিবার রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ের সামনে জাবারাং কল্যাণ সমিতি, প্রতিবেশ ও উন্নয়ন ফোরাম-রাঙ্গামাটি (FED-Rangamati), ক্লিন, বিডাব্লিউজিইডি এবং স্থানীয় কমিউনিটি প্ল্যাটফর্মসমূহের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক বিশাল মোবিলাইজেশন কর্মসূচিতে বক্তারা বলেন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের সক্রিয় সমর্থন ও সরাসরি অংশগ্রহণ ছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নয়। সমাবেশে স্থানীয় সাংবাদিক, যুব প্রতিনিধি, নারী নেত্রী এবং পরিবেশ আন্দোলনের কর্মীরা অংশ নিয়ে জ্বালানি খাতের এই পরিবর্তনের পক্ষে সংহতি প্রকাশ করেন।

সমাবেশে মূল বক্তব্যে প্রতিবেশ ও উন্নয়ন ফোরাম-রাঙ্গামাটি (FED-Rangamati) এর সদস্য কবি শিশির চাকমা বলেন, দেশের বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘদিন ধরে কেন্দ্রীয়ভাবে ব্যয়বহুল ও আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, যা বর্তমানে দেশের অর্থনীতির ওপর বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর বিপরীতে রুফটপ সোলার একটি পরিচ্ছন্ন, সহজলভ্য এবং অত্যন্ত কম ব্যয়বহুল সমাধান হওয়া সত্ত্বেও এটি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যথাযথ অগ্রাধিকার পাচ্ছে না।
কবি আনন্দ জ্যোতি চাকমা বলেন, রুফটপ সোলার কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রযুক্তি নয়, বরং এটি সাধারণ মানুষের জন্য 'জ্বালানি গণতন্ত্র' প্রতিষ্ঠার সুযোগ। ইউনিয়ন পরিষদ ভবন থেকে শুরু করে স্কুল, হাসপাতাল এবং গ্রামীণ বাজারগুলোর বিশাল অব্যবহৃত ছাদ যদি সৌরবিদ্যুতের আওতায় আনা যায়, তবে স্থানীয় পর্যায় থেকেই একটি বৃহৎ জ্বালানি বিপ্লব শুরু করা সম্ভব।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর জেলা সমন্বয়কারী বেনজিন চাকমা বলেন, বর্তমানে দেশের গ্রামীণ ও শহরাঞ্চলে বিপুল পরিমাণ ছাদ কোনো কাজে আসছে না। সেখানে পরিকল্পিতভাবে সৌর প্যানেল স্থাপন করলে একদিকে যেমন জাতীয় গ্রিডের ওপর লোড-শেডিংয়ের চাপ কমবে, অন্যদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে আমদানিকৃত জীবাশ্ম জ্বালানির নির্ভরতা হ্রাসের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে।
সংহতি বক্তব্যে জাবারাং কল্যাণ সমিতির নির্বাহী পরিচালক মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা বলেন, জ্বালানির এই রূপান্তর কেবল পরিবেশই রক্ষা করবে না, বরং স্থানীয় পর্যায়ে দক্ষ টেকনিশিয়ান ও উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে কর্মসংস্থানের বিশাল বাজার সৃষ্টি করবে। বিশেষ করে নারী ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলোর জন্য কমিউনিটি ভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা একটি সাশ্রয়ী ও ন্যায্য জ্বালানি ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।

কর্মসূচি শেষে অংশগ্রহণকারীরা রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসক ও পৌর প্রশাসকের নিকট ৫-দফা জোরালো দাবি জানিয়ে স্মারকলিপি পেশ করেন। দাবিসমূহ হলো- স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহকে (ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সিটি কর্পোরেশন) রুফটপ সোলার সম্প্রসারণে সুনির্দিষ্ট নীতিগত ও আর্থিক বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে; প্রতিটি সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত ভবনের ছাদে বাধ্যতামূলকভাবে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করতে হবে; সাধারণ মানুষের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, সরকারি ভর্তুকি এবং প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তার গ্যারান্টি দিতে হবে; জ্বালানি রূপান্তরের প্রক্রিয়ায় নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হবে; এবং পরিবেশ ধ্বংসকারী জীবাশ্ম জ্বালানি ভিত্তিক মেগা প্রকল্পের পরিবর্তে স্থানীয়ভাবে বাস্তবায়নযোগ্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির রোডম্যাপ গ্রহণ করতে হবে।

উন্নয়নকর্মী পূর্ণা চাকমা’র সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত মানব বন্ধনের সভাপতি ফোরাম অন ইকোলজি এন্ড ডেভেলপমেন্ট (FED Ranagmati)-এর সভাপতি মুজিবুল হক বুলবুল তাঁর সমাপনী বক্তব্যে বলেন, নতুন সরকারের কাছে জনগণের অনেক আশা-আকাঙ্খা আছে। স্থানীয় সরকার ও জনগণকে সম্পৃক্ত করেই সকল ধরণের উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে পারলে তা টেকসই হবে। সারাদেশব্যাপী যেন সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করা হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। যদি তা করা হয়, তাহলে দেশ বৈদেশিক মুদ্রা খরচ থেকে রেহায় পাবে। দালানের ছাদগুলোতে সৌরবিদ্যুতের বিপ্লব সংঘটিত করার জন্য তিনি আহবান জানান। বাংলাদেশ যদি এখনই রুফটপ সোলারকে অবহেলা করে, তবে দেশ পুনরায় ব্যয়বহুল ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক জ্বালানি সংকটের আবর্তে নিমজ্জিত হবে বলে তিনি মতব্যক্ত করেন।
উল্লেখ্য, ‘দশ লাখ রুফটপ সোলার, দশ লাখ কর্মসংস্থান- সানরাইজ’ প্রকল্পটি উপকূলীয় জীবনযাত্রা ও পরিবেশ কর্মজোট (CLEAN-Coastal Livelihood and Environmental Action Network)-এর সহায়তায় রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলায় কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে জাবারাং কল্যাণ সমিতি। এই কর্মসূচিতে স্থানীয় সুশীল সমাজের আন্দোলন হিসেবে প্রতিবেশ ও উন্নয়ন ফোরাম-রাঙ্গামাটি (FED-Rangamati) সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এছাড়াও সারাদেশব্যাপী এই আন্দোলনের অংশ হিসেবে বিডাব্লিউজিইডি ও অন্যান্য স্থানীয় নেটওয়ার্কসমূহ সহযোগী হিসেবে কাজ করছে।



































