ভ্রমণ করে এলাম ভারতের মেঘালয়, আসামের গৌহাটি ও কামরুপকামখ্যা
২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ০৬:৪৬ পিএম
রমনা পার্কের ব্যায়ামের সংগঠন " রমনা ঊষা সংঘ" এর উদ্দোগে আমরা ২১ সদস্যের একটি দল গত ১লা ডিসেমবর, ১৭ইং তারিখে ভারতের মেঘালয় ও আসাম রাজ্য ভ্রমণে গমণ করি। ইতিপুর্বে মেঘালয়ের শিলং শহরসহ ঊক্ত রাজ্যের দর্শনীয় স্থানসমুহ ভ্রমণের বিবরন লিখেছি। এখন আসাম এর রাজধানী গৌহাটি ও কামরুপ কামাখ্যা ভ্রমণের কিছু বিবরন দেয়া হলো।
ভারতের পুর্বাঞ্চলের ৭টি রাজ্যের মধ্যে আসাম রাজ্য অন্যতম। বাংলাদেশের সিলেট জেলার পুর্ব- দক্ষিন দিকে আসাম রাজ্য অবস্থিত। আসামের রাজধানী গৌহাটি। লোকসংখ্যা প্রায় ২.৭০ কোটি। আয়তন ৭৮,৪৩৮ বর্গ কি: মি:। ভারতের পুর্বাঞ্চলীয় ৭টি রাজ্যের মধ্যে আসামের জনসংখ্যা সবচেয়ে বেশী এবং আয়তনের দিক থেকে দিতীয়। ভাষা আসামীজ। এখানে বাংলা ভাষার অনেক লোকও বসবাস করে। আসামের প্রধান জেলাগুলি হচ্ছে- করিমগঞ্জ, শিলচর, হাইলাকান্দি, কাছাড়, তেজপুর, শিবসাগর, ডুব্রিগড়, গোয়ালপাড়া, কামপুর লাখিমপুর, হাফলং, কারর্বিয়াংলং, সোনিথপুর, দারাং ও নাগাওন।
প্রধান অর্থকরী সম্পদ: পেট্রোলিয়াম ও প্রাক্রিতিক গ্যাস, কয়লা, বনজ সম্পদ। এছাড়া প্রধান ঊৎপাদনকারী ফসলের মধ্যে ধান, পাট, চা, তুলা, তৈলবীজ, আখ অন্যতম। এছাড়া তাত শিল্পের জন্য বিখ্যাত।

উল্লেখ্য যে ২০১১সালে আমি আসামের দক্ষিন পুর্বাঞ্চলীয় জেলাগুলিতে ভ্রমণ করে এসেছি। ২০১১সালের ফেব্রুয়ারী মাসে সিলেটের জকিগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে আসামের করিমগঞ্জ জেলায় প্রবেশ করি। সেখান থেকে হাইলাকান্দি জেলায় গিয়ে অবস্থান করি। হাইলাকান্দি থেকে শিলচর জেলায় যাই। হাইলাকান্দি ৩দিন অবস্থান করে আমার ভগ্নিপতি জনাব মাসুকের সাথে মেঘালয় হয়ে গৌহাটি চলে যাই। গৌহাটি ২দিন থেকে আমরা ট্রেনে করে বোম্বের উদ্দেশ্য রওয়ান দেই। আমরা ৩দিনে বোম্বে গিয়ে পৌছাই। পথে আমরা ভারতের ৯টি রাজ্য অতিক্রম করি। রাজ্যগুলি হচ্ছে: আসাম, মেঘালয়, পশ্চিম বাংলা, ঝাড়খন্ড, ঊড়িষ্যা, বিহার, উত্তর প্রদেশ, মধ্য প্রদেশ ও মহারাষ্ট্র। আমরা বোম্বেতে ৭দিন
অবস্থান করে আবার গৌহাটি চলে আসি। গৌহাটিতে ৩দিন থেকে হালিয়াকান্দিতে এসে ৮দিন অবস্থান করি। অত:পর করিমগঞ্জ সীমান্ত পেড়িয়ে প্রায় একমাস পর বাংলাদেশে প্রবেশ করি। এই দীর্ঘ ভ্রমণের বিষয়টি পরবর্তিতে বিস্তারিত লিখব।
আমরা ১লা ডিসেমবর সকালে সিলেটের তামাবিল বর্ডার দিয়ে ভারতের মেঘালয় রাজ্যে প্রবেশ করি। মেঘালয়ের কাষ্টমস ও ইমিগ্রেশন এর আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে সকাল দশটায় শ্যামলী পরিবহনের বাসে ঊঠে শিলং এর উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেই। মেঘালয়ের পাহাড়িয়া অঞ্চলে ঢুকেই বেশ ঠান্ডা অনুভব করলাম। জানা গেল এখানে ৯ ডিগ্রী সে: চলছে। অথচ তামাবিলে তখন ২৬ ডিগ্রী সে:। তামাবিল থেকে মেঘালয়ের রাজধানী ৮৩ কি: মি:। মেঘালয়ের বিশাল বিশাল পাহাড় ও উচুনীচু পথ পেড়িয়ে আমরা ৩ঘন্টায় প্রায় দুপুর ১টার দিকে শিলং শহরে এসে পৌছাই। বাসষ্ট্যান্ড থেকে আমরা ট্যাক্সীযোগে বেলা ১.৩০মি: এ আমাদের নির্ধারিত হোটেলে গিয়ে উঠলাম। হোটেলে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আমরা পুলিশ বাজার এলাকায় দুপুরের খাবার সেরে নিলাম। এরপর প্রায় সবাই উক্ত এলাকায় মার্কেটে কিছু কেনাকাটি করে রাত্রে হোটেলে ফিরে এলাম। দলনেতা মহীউদ্দীন ভাই পরের দিন সকাল ৭টার মধ্যে হোটেলের নাস্তার টেবিলে সবাইকে উপস্থিত থাকার জন্য অনুরোধ জানালেন। তাই পরের দিন ভোরে আমরা আসামের রাজধানী গৌহাটি যাব বলে রাত ১০টার মধ্যে শুয়ে পড়লাম। রাত্রে বেশ শীত অনুভুত হোল। আমি ও আমার রুমমেট ইমতিয়াজ ভাই হোটেলের রুম বয়কে ডেকে রুম হিটারের ব্যবস্থা করলাম। তাতে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেয়ে রুম একটু গরম হোল। শিলং-এ ঐদিন তাপমাত্রা ছিল ৮/৯ ডিগ্রী।

আমরা ২রা ডিসেম্বর সকালে সবাই হোটেলের নাস্তার টেবিলে উপস্থিত হোলাম। সকাল ৭.৩০ এর মধ্যে নাস্তা সেরে আমরা সবাই ৮ টার মধ্যে পুলিশ বাজার এলাকায় বাসষ্ট্যান্ডে উপস্থিত হোলাম। ঢাকা থেকে যে শ্যামলী পরিবহনের বাসে আমরা শিলং এসেছিলাম। সেই বাসে করেই আমরা আসামের রাজধানী গৌহাটির উদ্দেশ্যে সকাল ৮.৩০মি: এ রওয়ানা দিলাম। শিলং থেকে গৌহাটি প্রায় ১০০কি:মি: পথ। এই যাত্রাপথেও সারি সারি বিশাল বড় পাহাড় ও উচুনীচু রাস্তা, পাশে নীচু খাদ, ঝর্ণা ও পাহাড়ের বাক ঘুরে ঘুরে আমরা প্রায় ৩ ঘন্টায় গৌহাটি পৌছে গেলাম। তখন বেলা প্রায় ১১.৩০মি:। গৌহাটি এসে আমাদের ঢাকার মতোই আবহাওয়া অনুভুত হোল। মেঘালয়ে বেশ শীত ছিল। একেবারে হাড় কাপানো ঠান্ডা। আবার গৌহাটিতে মোটেই শীত নেই। বাস থেকে নেমে কিছু নাস্তাপানি খেয়ে বেলা ১২ টার দিকে একটা মিনিবাসে করে আমরা কামরুপকামাখ্যার দিকে রওয়ানা দিলাম। বেলা ১.৩০ মি: এ আমরা কামখ্যা মন্দিরের কাছে চলে এলাম। কাছেই ব্রম্মপুত্র নদী।নদী পার হয়েই কামাখ্যা এলাকা। বেশ উচু পাহাড়ের উপর বিশাল এলাকা জুড়ে মন্দির এলাকা।
কথিত আছে যে, যাদু বিদ্যার তীর্থস্থান হলো কামরুপ কামাখ্যা। গৌহাটি শহরের পশ্চিমাংশে নীলাচর পর্বতে অবস্থিত হিন্দু দেবী কামাখ্যার একটি মন্দির। এই মন্দির চত্তরে দশমহাবিদ্যার মন্দির আছে। এই মন্দিরগুলোতে দশ মহাবিদ্যা অর্থাৎ ভুবনেশ্যরী, বগলামুখী, ছিন্নমস্তা, ত্রিপুরাসুন্দরী, তারা, কালী, ভৈরবী, ধুমাবতী, মাতংগী ও কমলা- এই দশ দেবীর মন্দির।এর মধ্যে ত্রিপুরা সুন্দরী,মাতংগী ও কমলা প্রধান মন্দিরে পুজিত হন। হিন্দুদের বিশেষত তন্ত্র সাধকদের কাছে এই মন্দির একটি পবিত্র স্থান। ঊক্ত স্থানের একজন পান্ডের (মন্দিরের সেবক) সাথে আলাপকালে জানালেন, প্রাক্রিতিক এক রহস্যময় গুহাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এই কামরুপ কামাখ্যা মন্দির। মুল মন্দিরে সিংহাসনে আসীন অষ্টধাতুর কামাখ্যা দেবীর বিগ্রহ। একসময় এ যায়গায় কেউ গেলে আর ফিরে আসতোনা। হাজার বছরের রহস্যময় স্থান কামরুপ কামাখ্যা। এখনও যাদুবিদ্যা সাধনার জন্য বেছে নেয়া হয় কামাখ্যা মন্দিরকেই। কামরুপ কামাখ্যার আশেপাশে অরণ্য ও নির্জন পথে নাকি ঘুরে বেড়ায় ভালো-মন্দ আত্মারা।
আমাদের বাস কামাখ্যা মন্দিরের গেটে এসে থামলো। কামাখ্যা গেট থেকে মন্দিরের কাছে যেতে সময় লাগলো প্রায় পাচ মিনিট। মন্দির সংলগ্ন এলাকাটি বহু মানুষের উপস্থিতিতে সরগরম হয়ে রয়েছে। অভিনব স্থাপত্যশৈলীতে তৈরী কামাখ্যা মন্দিরগুচ্ছকে ঘিরে আছে সুন্দরভাবে বাধানো চাতাল। মন্দির গাত্রে শোভা পাচ্ছে দেবদেবী এবং নারী-পুরুষের মুর্তি। মন্দিরে ঢুকতে হলে জুতা ও ক্যামেরা বাইরে রেখে ঢুকতে হয়। মুল মন্দিরে ঢুকতে বিশাল লাইনে দাড়াতে হয়। মন্দিরের মুল গর্ভগ্রীহ অন্ধকার। শুধুমাত্র প্রদীপের আলোয় আলোকিত। আমাদের দলের দুএকজন লাইন ধরে মুল মন্দিরে প্রবেশ করলেও অন্যান্যরা বাইরেই ছিলেন। মন্দির এলাকাটিতে প্রচুর দোকানপাট আছে। মন্দিরে পুজা দেয়ার সামগ্রীসহ সব ধরনের জিনিষপত্র এখানে পাওয়া যায়। খাবারের হোটেলও আছে এখানে। আমরা বেলা ২.৩০ এর দিকে সবাই একত্রিত হয়ে বাসে করে গৌহাটি কেন্দ্রীয় বাসষ্ট্যান্ডে ফিরে আসলাম। এখানে দুপুরের খাওয়া সেরে সবাই বিভিন্ন মার্কেটে গেলেন। পল্টন বাজার এর আশেপাশে ছোট বড় বেশ কিছু মার্কেট আছে। এরমধ্যে বিগবাজার, ভিশাল সেন্টার অন্যতম। ফুটপাথের মার্কেটও আছে। তবে শিলং এর চেয়ে গৌহাটিতে জিনিষপত্রের মুল্য কম। আমাদের বাস বেলা ৬টায় শিলং এর উদ্দেশ্য ছেড়ে দিবে বলে দলনেতা মহীউদ্দীন ভাই সবাইকে ৬টার মধ্যে বাসষ্ট্যান্ডে উপস্থিত থাকতে অনুরোধ জানালেন। সেই অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ে সবাই উপস্থিত হলেন। আমাদের বাস ঠিক ৬টায় ছেড়ে রাত ৯টায় শিলং এ গিয়ে পৌছায়। আমরা রাত ৯.৩০মি: এ হোটেলে ফিরে এলাম। পরের দিন আমরা শিলং এর বিভিন্ন স্থান ঘুরে বিকেলে শহরে ফিরে আসি। সন্ধ্যায় সবাই বিভিন্ন মার্কেটে গিয়ে কেনাকাটি করে রাত ৯টার মধ্যে হোটেলে চলে আসেন। ৪ঠা ডিসেম্বর সকালে আমরা ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়ে রাত দশটায় ঢাকা পৌছে যাই।
আসামের কিছু দর্শনীয় স্থান: -
ক) গৌহাটি শহরে--কামাখ্যা মন্দির, নবগ্রহ মন্দির, উমানন্দ মন্দির, জনার্দান মন্দির, আসাম ষ্টেট মিউজিয়াম, আসাম ষ্টেট জু, শ্রীমান্ত সংকরাদেভ কলাশেট্র (নাচ, গান ও নাট্যকেন্দ্র)।
খ) গৌহাটির বাহিরে- বাসিস্থা ১১কি:মি:, হাজো ৩২কি:মি:, মদন কামদেভ ৩৪কি:মি:, বারপেটা ১৩৭কি:মি:, হাফলং ৩৪৫কি:মি।
গ) শিবসাগর, তেজপুর ১৯৮কি:মি:,
ঘ) উমরাংসু ২২৪কি:মি:
রমনা ঊষা সংঘের উদ্দোগে মেঘালয় ও আসাম ভ্রমণের ব্যবস্থাপনার বিষয়ে জনাব বতু মোল্লা প্রচুর পরিশ্রম করেছেন। এ ব্যাপারে জনাব মহীউদ্দীন ও শাহদাত ভাই প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন।একটি সফল ভ্রমণের ব্যবস্থা ও পরিচালনার জন্য তাদের সবাইকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
লেখক- মোঃ ইমরানুল হক
প্রাবন্ধিক ও অবসরপ্রাপ্ত এজিএম, জনতা ব্যাংক লিঃ।





























