আর্জেন্টিনাকে কাঁদিয়ে ১৬ বছর পর বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেন
২০ জুলাই ২০২৬, ০৮:৩২ এএম
বল দখল, নিখুঁত পাসিং আর একের পর এক আক্রমণে পুরো ম্যাচজুড়ে দাপট দেখাল স্পেন। তবে কাঙ্ক্ষিত গোলের দেখা যেন কিছুতেই মিলছিল না। নির্ধারিত ৯০ মিনিটের রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ে কোনো দলই জালের দেখা না পাওয়ায় ফাইনাল গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। অবশেষে সেখানে আর্জেন্টিনার জমাট রক্ষণ ভেঙে ১-০ গোলের মহাকাব্যিক জয়ে বিশ্বকাপের সোনালী ট্রফি নিজেদের করে নিল স্প্যানিশরা। লিওনেল মেসির দলকে কাঁদিয়ে বিশ্বফুটবলের নতুন রাজা এখন লুই দে লা ফুয়েন্তের শিষ্যরা।
ঐতিহাসিক এই মহারণটি অনুষ্ঠিত হয়েছে সোমবার (২০জুলাই)। বিশ্বের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর চোখ ছিল মেটলাইফ স্টেডিয়াম, নিউ জার্সি-এর দিকে, যেখানে বিশ্বজয়ের চূড়ান্ত লড়াইয়ে মুখোমুখি হয় ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার দুই পরাশক্তি।
এর আগে ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল স্পেন। এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ দেড় দশক। অবশেষে দীর্ঘ ১৬ বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ফুটবলবিশ্বে আবারও নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করল স্প্যানিশরা, ঘরে তুলল ইতিহাসের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা।
ম্যাচের শুরু থেকেই টিকিটাকা ফুটবলের পসরা সাজিয়ে আর্জেন্টিনাকে চেপে ধরে স্পেন। মাত্র ৫ মিনিটের মাথাতেই গোল পাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ তৈরি করে তারা। ডান প্রান্ত থেকে তরুণ তুর্কি লামিনে ইয়ামাল বক্সে ক্রস বাড়ানোর চেষ্টা করলে বলটি ডিফ্লেক্ট হয়ে দানি ওলমোর কাছে চলে যায়। ওলমো দারুণ বুদ্ধিমত্তায় বলটি আবার ইয়ামালের দিকেই বাড়িয়ে দেন। ইয়ামাল বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে শট নিলেও আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো মার্টিনেজ ও গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজের যৌথ প্রাচীর ভেদ করে বল জালে জড়াতে পারেনি।
সময় যত গড়িয়েছে, ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ তত বেশি স্পেনের দিকে ঝুঁকেছে। প্রথমার্ধে স্প্যানিশরা প্রতিপক্ষের গোল অভিমুখে ৩টি শট নেয়, যার ২টি ছিল অন-টার্গেট। বিপরীতে আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগ ছিল পুরোপুরি নিষ্ক্রিয়, তারা প্রথমার্ধে স্পেনের গোলপোস্টে কোনো শটই নিতে পারেনি।
ম্যাচের ৪১ মিনিটে স্পেনের ওয়ারজাবালকে বিপজ্জনক ফাউল করে ফাইনালের প্রথম হলুদ কার্ড দেখেন আর্জেন্টিনার লিসান্দ্রো মার্টিনেজ। এর ঠিক দুই মিনিট পর ইনজুরির কারণে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন এই ডিফেন্ডার, তার পরিবর্তে মাঠে নামেন অভিজ্ঞ নিকোলাস ওতামেন্দি। প্রথমার্ধের শেষ মুহূর্তে স্পেনের লেফট-ব্যাক মার্ক কুকুরেয়ার একটি দুর্দান্ত প্রচেষ্টা ডানপাশের পোস্টের সামান্য বাইরে দিয়ে চলে গেলে গোলবঞ্চিত হয় স্পেন।
পরিসংখ্যানও বলছিল প্রথমার্ধে স্পেনের একচেটিয়া আধিপত্যের কথা। এ সময় ৬৫ শতাংশ বল পজেশন ছিল স্পেনের নিয়ন্ত্রণে, যেখানে আর্জেন্টিনা বল ধরে রাখতে পেরেছিল মাত্র ৩৫ শতাংশ সময়। পাসের দিক থেকেও দ্বিগুণ ব্যবধানে এগিয়ে ছিল স্প্যানিশরা। প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনার ১৫৫টি নিখুঁত পাসের বিপরীতে স্পেন সম্পন্ন করে ৩১৩টি নিখুঁত পাস।
প্রথমার্ধের মতো দ্বিতীয়ার্ধেও আক্রমণের ধারা বজায় রাখে স্পেন। তবে আর্জেন্টিনার ‘বাজপাখি’ খ্যাত গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজ দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে বেশ কয়েকটি নিশ্চিত আক্রমণ নসাৎ করে দেন। নির্ধারিত ৯০ মিনিটের খেলা শেষে যোগ করা সময়ের (ইঞ্জুরি টাইম) তৃতীয় মিনিটে ঘটে নাটকীয় ঘটনা। স্প্যানিশ খেলোয়াড়কে বেপরোয়া ট্যাকল করায় আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডার এনজো ফার্নান্দেজকে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখান রেফারি। ফলে লাল কার্ড পেয়ে মাঠ ছাড়তে হয় তাকে, ১০ জনের দলে পরিণত হয় আর্জেন্টিনা।
১০ জনের আর্জেন্টিনাকে পেয়ে অতিরিক্ত সময়ে আক্রমণের ধার আরও বাড়ায় স্পেন। ম্যাচের ৯৬ মিনিটে বল জালে জড়িয়েছিলেন নিকো উইলিয়ামস, তবে ফাউলের কারণে রেফারি সেই গোলটি বাতিল করে দেন। তবে গোলের জন্য স্প্যানিশদের বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি। ম্যাচের ১০৬ মিনিটে কাঙ্ক্ষিত সেই স্বর্ণালী মুহূর্তটি আসে। নিকো উইলিয়ামসের চমৎকার অ্যাসিস্ট থেকে নিখুঁত ফিনিশিংয়ে গোল করে স্পেনকে উল্লাসে ভাসান ফেরান তোরেস।
১-০ গোলে পিছিয়ে পড়ে ম্যাচে সমতা ফেরাতে মরিয়া হয়ে ওঠে ১০ জনের আর্জেন্টিনা। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তারা বেশ কিছু আক্রমণ চালালেও স্পেনের রক্ষণভাগ ভাঙতে ব্যর্থ হয়। অবশেষে রেফারির শেষ বাঁশি বাজার সাথে সাথেই স্পেনের ফুটবলার ও সমর্থকদের উল্লাস কানায় কানায় পূর্ণ হয়, আর অশ্রুসিক্ত চোখে মাঠ ছাড়ে আলবিসেলেস্তেরা।




































