সামাজিক ভারসাম্য রক্ষায় ফত্ওয়ার প্রয়োগ

প্রতিদিনেরচিত্র ডেস্ক

০৬ নভেম্বর ২০১৮, ০৭:৫৮ পিএম


সামাজিক ভারসাম্য রক্ষায় ফত্ওয়ার প্রয়োগ

মানুষ সামাজিক জীব, সমাজ ও পরিবার বদ্ধভাবে মানুষের বসবাস। পরিবার গঠনের জন্য স্বামী-স্ত্রীর যৌথ সংসার। তারা একে অপরের পরিপূরক। বাংলাদেশের আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপটে এখানে আনুষ্টানিকতার মাধ্যমে ধর্মীয় ও সামাজিক রীতিনীতি অনুসরন করে বিবাহ বা স্বমী স্ত্রীর সম্পর্ক গড়ে উঠে। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে গড়ে উঠা সংসারে স্মামীর পিতা, মাতা, ভাই, বোন, দাদা, দাদী অনেকেই থাকেন। অন্যদিকে স্ত্রীর পক্ষে শ্বশুর, শ্বাশুরী তাদের পক্ষের অনেকেই থাকেন। সেটাই স্বাভাবিক। এর সাথে স্বামীর পাড়া প্রতিবেশী মহল্লা, গ্রামের অনেক আত্বীয় স্বজন থাকবেন। সেটায় স্বাভাবিক, সেভাবেই বাংলার সমাজ আবহমান কাল হতে চলে আসছে। সমাজকে সুশৃংখল ভাবে পরিচালনা ও রক্ষা করার জন্য কতিপয় সমাজগুনে গুনান্বিত মানুষদের নিয়ে গঠন করা হয়, পাড়া মহল্লা, কমিটি। তারা সমাজের ভালো মন্দ দেখে থাকে। কোনো কোনো এলাকায় শক্ত হাতে তাদের ক্ষমতা প্রয়োগ হতে দেখা যায়। বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে এসব সমাজ মহল্লা কমিটিগুলো নানা প্রলোভনে পড়ে অসহায় নিরীহ মানুষের উপর হয়রানী করে থাকে। তারা সমাজপতি হওয়ার কারণে দেখা যায় তখন প্রশাসন ও স্থানীয় চেয়ারম্যান, মেম্বার তাদের পক্ষ নেয়। সমাজে ছোট খাটো কোনো সমস্যার সৃষ্টি হলেই সেখানে মহল্লার এসব মোডলরা নাক গলায়। এ ধরনের কর্মকান্ড দীর্ঘদিন হতে বাংলাদেশে আবহমান গ্রামে গঞ্জে চলে আসছে। প্রতিদিন গ্রামবাংলার নানা চিত্র পত্র পত্রিকার পাতায় উঠে আসে। নিত্যদিন অহরহ ঘঠছে বাংলার জমিনে সংসার ভাঙ্গার চিত্র। এসব সংবাদে দেখা যায় বেশীরভাগ ক্ষেত্রে স্ত্রীর পক্ষ হতে স্বামীকে তালাক দেওয়ার প্রবনতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। মাত্র কয়েক মাস সংসার করার পর স্বামীকে পরিত্যক্ত ঘোষনা করছে প্রশাসনের সহযোগীতায়। পুরুষের পক্ষ হতেও নানা পরিবারিক সমস্যার কারণে স্ত্রীকে প্রশাসনিকভাবে তালাক প্রদান করতে দেখা যায়। সমাজ এভাবেই চলে আসছে। এটাকেই মেনে নিচ্ছে পুরুষ আর মহিলা। গ্রাম বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রতিদিন শত শত সংসার এভাবে ভাঙ্গছে। মহল্লা ও সমাজ নেতারা সংসার গড়ার চেয়ে ভাঙ্গার কারিগর বেশী। ভিলেইজ পলিটিক্যালে মারপ্যাচের খেলা খেলে সংসার ভাঙ্গার প্রবনতা ইদানিং আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। স্বামী-স্ত্রী, শ্বশুর-শ্বাশুরী, পরিবারের অন্য সব সদস্য সহ-৫৭ পরিবারের সংসার বাংলাদেশে বহু এলাকায় খোঁজ পাওয়া যাবে। আবার ৫৭ পরিবার ভেঙ্গে চুরামার করে হাজার হাজার পরিবার সৃষ্টি হচ্ছে। পারিবারিক সমস্যা সংসার ভাঙ্গা আবার জোড়া নেয়া সব-ই এ সমাজে হয়ে থাকে। স্বামী-স্ত্রীর সংসার ভাঙ্গার কারণের মধ্যে পরিবারের অন্য সদস্যদের ইন্দন থাকে। নানা সমস্যার ঝট তৈরী হতে হতে একটি সময়ে এসে সংসার ভেঙ্গে পড়ে এখানে পরিবার থেকে শুরু করে সমাজের একটি মোডল শ্রেনী জড়িয়ে পড়ে। এসব কারণে বেশীর ভাগ গ্রাম বাংলার পারিবারিক শৃংখলা ভেঙ্গে পড়ছে। তারই একটি চিত্র পত্রিকার পাতায় গুরুত্বপূর্ণ খবর হয়ে আসে ২২ জানুয়ারী। ঘঠনাটি ঘটেছে সাতকানিয়ার এক কৃষক পরিবারে। সংসার থাকলে সেখানে কিছু বিষয় নিয়ে তর্ক বিতর্ক হবে। বাক বিতন্ডা হওয়া স্বাভাবিক। এ ধরনের বিষয়ে এক পর্যায়ে স্বামী স্ত্রীকে অথবা স্ত্রী স্বামীকে তালাক বা ডিবোর্স দেয়ার রীতিনীতি সমাজে প্রতিষ্টিত আছে। এখানে কখনো কখনো ভুল বুঝা বুঝির নিরসন হলে পুঃসংসার আবার জোড়া লাগে। এমন সংবাদও বাংলার জমিন থেকে পাওয়া যায়। এখানে সমস্যা হচ্ছে ইসলামী শরীয়তের ফত্ওয়া এবং সমাজ পতিদের চলচাতুরী। ফত্ওয়ার বিষয় বললে দেখা যায়, আনাড়ী মার্কা, তথা কথিত নামধারী হুজুর দিয়ে একটা ফত্ওয়া সংগ্রহ করা হয়। যেটা লোক দেখানো ফত্ওয়া মাত্র। ফত্ওয়া দিতে হলে তাকে শরীয়ত, দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং ঐ পরিবারের অবস্থা সম্পর্কে মুফতি বা মাওলানার ধারনা থাকতে হবে। এ সব বিষয়ে পূর্ণ ধারনা না থাকলে কোনো আলেম বা মুফতি ফত্ওয়া প্রদান করা শরীয়ত সম্মত নয়। অর্থলোভে প্ররোচনায় ফেলে কখনো কখনো গ্রাম বাংলায় এখনো এ ধরনের ফত্ওয়ার অপপ্রয়োগ দেখা যায়। এ ধরনের শরীয়ত বিরোধী ফত্ওয়ার প্রয়োগে শত শত পরিবার খান খান হয়ে যাচ্ছে। এতে করে পরিবারে আগত সন্তানদের ভবিষ্যত অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। সমাজের শৃংখলাপূর্ণ পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। সমাজ তার দীর্ঘদিনের লালিত শান্তিপূর্ণ পরিবেশ হতে বঞ্চিত হচ্ছে। এর জন্য যে বা যারাই দায়ী তাদেরকে প্রশাসনিক ভাবে বিচারের কাট গড়ায় দাঁড় করা দরকার। সংসারে ভূল বুঝা বুঝি কিছুটিা কথা কাটা কাটি হবেই। হওয়াটায় স্বাভাবিক। এখানে যারা হাত ঢুকিয়ে দিয়ে পরিবেশটাকে সমান্য অর্থলোভে শেষ করার ষড়যন্ত্র করে তাদেরকেই সমাজের বিষপোড়া হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে। এসব সমাজ ও মহল্লা কমিটির অযথা হয়রানী ও ষড়যন্ত্রের শিকার গ্রাম গন্জের অসংখ্য পরিবার। এসব অপ সংস্কৃতি আর তৎপরতা যেনো বেড়ে উঠতে না পরে সেটায় এখন করতে হবে দায়িত্বশীল মহলকে। ফত্ওয়া নামক স্পর্শকাতর বিষয় যেনো কোনো নামধারী মাওলানা অপপ্রয়োগ করতে না পারে সে বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসনকে গুরুত্ব দিতে হবে। সামাজিক এ বিষয়ে ফত্ওয়া প্রদানের উদ্দেশ্য যোগ্য একটি ফত্ওয়া বোর্ড় দেশব্যাপী থাকা চাই। নির্দিষ্ট এ সব ব্যক্তির নিকট গিয়ে যেনো শরীয়তের সঠিক পরামর্শ পায় সেটা প্রশাসনকে নিশ্চিত করা দরকার। যে কেউ যেনো তেনো ভাবে তালাকের মতো স্পর্শ কাতর বিষয়ে ফত্ওয়া না দিতে পরে সে ক্ষেত্রে কঠোর আইন ও শাস্তির বিধান করা দরকার। সাতকানিয়ার এ পরিবারকে ধ্বংসের পিছনে যে বা যাদের সম্পৃক্ততা খোঁজ পাওয়া যাবে তাদের আইনের কাটগড়ায় এনে কঠোরভাবে শাস্তি দেওয়া হউক। যাতে করে সমাজে স্পর্শকাতর ফতওয়া সংক্রান্ত এই আইনকে যেনো কেউ নিজের হাতে তুলে নিতে না পরে।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও গবেষক

 

Ads