একত্তরের জননী খ্যাত বীরঙ্গনা রমা চৌধুরীর জীবনাবসান, শোক গাঁথা

প্রতিদিনেরচিত্র ডেস্ক

০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০৫:০৬ পিএম


একত্তরের জননী খ্যাত বীরঙ্গনা রমা চৌধুরীর জীবনাবসান, শোক গাঁথা

ছবি - সংগৃহীত

চট্টগ্রাম, একত্তরের জননী’ খ্যাত বীরাঙ্গনা রমা চৌধুরী আর নেই। সোমবার (০৩ সেপ্টেম্বর) ভোর সাড়ে ৪টার দিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে দুই ছেলেকে হারানোর পাশাপাশি নিজের সম্ভ্রমও হারান রমা চৌধুরী। পুড়িয়ে দেওয়া হয় তার ঘর-বাড়ি। তবু জীবনযুদ্ধে হার মানেননি এ বীরাঙ্গনা। শুরু করেন নতুনভাবে পথচলা। লিখে ফেলেন ‘একাত্তরের জননী’, ‘এক হাজার এক দিন যাপনের পদ্য’ এবং ‘ভাব বৈচিত্র্যে রবীন্দ্রনাথ’সহ ১৮টি বই। এসব বই বিক্রি করেই চলতো তার সংসার ১৫ জানুয়ারি রমা চৌধুরী ভর্তি হন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এরপর থেকে সেখানেই চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। বার্ধক্য জনিত কারনে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হন তিনি। তার মৃত্যুতে পুরো চট্টগ্রামে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। বোয়ালখালীর মেয়ে। দুরন্ত কৈশোর, কর্মময় জীবন বোয়ালখালীতে কাটিয়েছেন। সেইসব স্মৃতি কথা তাঁর লেখনিতেই তিনি তুলে ধরেছেন বহুবার। এই মাটিতে রয়েছে তাঁর দুর্বিষহ যন্ত্রণার লিপি। আজ তিনি প্রয়াত। তাঁর নাড়ী ছেঁড়া ধনেরাও অকাল প্রয়াণে ঘুমিয়ে আছেন বোয়ালখালীতে। তাঁর স্বপ্ন ছিলো এ বোয়ালখালীকে ঘিরে। সদালাপী হাস্যময়ী রমা দি চলে গেছেন। সেই সাথে পাঠ চুকিয়ে দিলেন এক সংগ্রামী জীবনে। সমাপ্ত হলো কঠিন লড়াইয়ে এক অধ্যায়ের। কণ্টকময় পথ আঘাতে আঘাতে অমৃতসুধা ঝরিয়েছে। ক্ষরণ হয়েছে অন্তর জ্বালা। খাঁটি করেছে পুড়িয়ে পুড়িয়ে। এ এক ব্যতিক্রম নাটকীয় জীবন। তিনি শিখিয়েছেন, দেখিয়েছেন সংগ্রাম কাকে বলে! ধৈয্য, সহ্য ও বৈরাগ্য কি! আর আত্ম বিশ্বাস কেমনতর। রমা চৌধুরী ১৯৪১ সালে চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার পোপাদিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন রমা চৌধুরী। তিনিই ছিলেন দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রথম নারী স্নাতকোত্তর (এম.এ)। ১৯৬২ সালে কক্সবাজার বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। দীর্ঘ ১৬ বছর তিনি বিভিন্ন উচ্চবিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষিকার দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি তিন পুত্রসন্তানের জননী ছিলেন। থাকতেন পৈতৃক ভিটা বোয়ালখালী উপজেলার পোপাদিয়ায়। তাঁর স্বামী ভারতে চলে যান। ১৩ মে সকালে পাকিস্তানি সেনারা এসে চড়াও হয় তাঁর ঘরে। এ সময় দুগ্ধপোষ্য সন্তান ছিল তাঁর কোলে। এরপরও তাঁকে নির্যাতন করা হয়। পাকিস্তানি সেনারা গানপাউডার দিয়ে আগুন জ্বেলে পুড়িয়ে দেয় তাঁর ঘরবাড়ি। পুড়িয়ে দেয় তাঁর সব সম্পদ। নিজের নিদারুণ এই কষ্টের কথা তিনি লিখেছেন ‘একাত্তরের জননী’ গ্রন্থে।

জয়লাভের পর ২০ ডিসেম্বর তাঁর বড় ছেলে সাগর নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। এর ১ মাস ২৮ দিন পর মারা যায় আরেক ছেলে টগর। এরপর তিনি জুতা পরা বাদ দেন। পরে অনিয়মিতভাবে জুতা পরতেন তিনি। ১৯৯৮ সালের ১৬ ডিসেম্বর আরেক ছেলে মারা গেলে পুত্রশোকে তিনি আর জুতা  দেননি। খালি পায়ে হেঁটে নিজের লেখা বই বিক্রি করে চলতেন এই নারী।

২০ বছর ধরে লেখ্যবৃত্তিকে পেশা হিসেবে নিয়েছেন রমা চৌধুরী। যদিও তাঁর লেখ্যবৃত্তির পেশা একেবারেই স্বনির্বাচিত ও স্বতন্ত্র। তিনি প্রথমে একটি পাক্ষিক পত্রিকায় লিখতেন। বিনিময়ে সম্মানীর বদলে পত্রিকার ৫০টি কপি পেতেন। সেই পত্রিকা বিক্রি করেই চলত তাঁর জীবন-জীবিকা। পরে নিজেই নিজের লেখা বই প্রকাশ করে বই ফেরি করতে শুরু করেন। প্রবন্ধ, উপন্যাস ও কবিতা মিলিয়ে বর্তমানে তিনি নিজের ১৫টি গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন।

Ads