ওষুধ শিল্পের বিকাশ আশাব্যঞ্জক
২৭ আগস্ট ২০১৮, ০১:৩৩ এএম
বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগে এদেশে ব্যবহৃত ওষুধের সিংহভাগই আমদানী করা হতো বিদেশ থেকে।অল্প সল্প যে ওষুধ দেশে তৈরী হতো তার গুণগত মান নিয়েও প্রশ্ন ছিলো। স্বাধীনতার ৪৭ বছর পর বাংলাদেশ নিজস্ব চাহিদার সিংহভাগই পূরণ করে চলছে। বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে পৃথিবীর ১৬০টি দেশে ওষুধ রপ্তানী হচ্ছে। যার মধ্যে ইউরোপ, আমেরিকার বাজারেও বাংলাদেশের ওষুধ প্রবেশ করছে।আপসহীন ওষুধের মান নিয়ে যাদের অবস্থান তারাও বাংলাদেশের ওষুধের ব্যাপারে সন্তুষ্টি প্রকাশ করছে। বর্তমান অর্থ বছরের প্রথম ১১ মাসে লক্ষ্য মাত্রার চেয়েও বেশী ওষুধ রপ্তানী হয়েছে। এ সময়ের লক্ষ্য মাত্রা ছিলো ৯ কোটি ডলার। এর বিপরীতে ওষুধ রপ্তানীর পরিমাণ ৯ কোটি ৬০ লাখ ডলারে উন্মীত। ওষুধ রপ্তানীতে প্রবৃদ্ধি ১৫ দশমিক ৮৯ শতাংশ।
ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তথ্যমতে,বাংলাদেশ থেকে ৫৪টি ওষুধ রপ্তানীকারী প্রতিষ্ঠান ১২৭টি দেশে রপ্তানী করে থাকে। ২০১১ সালে রপ্তানীকারী দেশের সংখ্যা ছিল ৪৭টি। এর পর কয়েক বছর কোনো প্রতিষ্টান চালু হয়নি। কিন্তু ২০১৫ সালে কোম্পানীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে দাড়ায় ১১৩টিতে। বর্তমানে ১২৭টিতে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে আমেরিকার উত্তর ও দক্ষিণে ২৫টি দেশে, ইউরোপের ২৬টি, অস্ট্রেলিয়ার ৫টি, আফ্রিকার ৩৪টি ও এশিয়ার ৩৭টি দেশে বাংলাদেশের ওষুধ রপ্তানী হয়। দেশের শীর্ষস্থানীয় ওষুধ রপ্তানীকারক প্রতিষ্টান বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড ২০১৫ সালের জুন মাসে দেশের প্রথম ওষুধ প্রস্তুতকারী কোম্পানী হিসেবে ইউএস এফডিএ কর্তৃক নিরীক্ষিত ও অনুমোদিত হয়। বর্তমানে কোম্পানীটি ৫০টিরও বেশী দেশে ওষুধ রপ্তানী করছে। বেক্সিমকো ফার্মা ইউএস এফডিএ, এজিইএস (ইইউ), টিজিএ অস্ট্রেলিয়া, হেলথ কানাডা, জিসিসি এবং টিএফডিএসহ বিশ্বের বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থা কর্তৃক স্বীকৃত।
অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গেল কয়েক বছরের দেশ থেকে ওষুধ রপ্তানী উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১১ সবমিলিয়ে ওষুধ রপ্তানী হয় ৪২৬ কোটি টাকা। ১২ সালে র্পতানী হয় ৫৫১ কোটি টাকা। ১৩ সালে ৬১৯ কোটি টাকা। ১৪ সালে ৭৩৩ কোটি টাকা। ২০১৫ সালে রপ্তানী হয়েছে ৮৩২ কোটি টাকা। সর্বশেষ গত ২০১৬সাল পর্য্ন্ত দেশে থেকে ওষুধ রপ্তানী হয়েছে ২ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা। অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলেন, দেশে বিশ্বমানের ওষুধ পরীক্ষাগারের কাজ চলছে।ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরকে আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা চলছে।এসব কাজ শেষ হলে এ শিল্পের অবস্থান আরও দৃঢ় হবে।ওষুধ প্রযুক্তি, বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের বিকাশ খুবই আশাব্যঞ্জক। বছর কয়েক আগেও জীবনরক্ষাকারী ৫০ শতাংশেরও বেশী ওষুধ আমদানী করতে হতো। এখন সেটি অনেক কমে এসেছে।ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এখনো দেশের বেশীরভাগ ওষুধের কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানী করতে হয়। দেশে ওষুধের কাঁচামালের বাজার প্রায় ১২০০ কোটি টাকা।বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের অগ্রযাত্রার মূল কারণ আমাদের ওষুধ নীতির যথার্থ বাস্তবায়ন।
১৯৮২ সালে এদেশে যে ওষুধ নীতি ঘোষণা করা হয় তার সুফল আমরা পেতে যাচ্ছি। দেশে ওষুধ প্রস্তুতের কাচাঁমাল উৎপাদন বাড়াতে পারলে উৎপাদন ব্যায়ও কমবে। ওষুধের দামও মানুষের নাগালের মধ্যে রাখা সম্ভব হবে না।ওষুধ মানুষের দৈনন্দিন নিত্য ব্যবহার্য্ একটি পণ্য।মানুষের নিত্যদিনের নানা প্রকার রোগ ব্যাধি এখন সঙ্গি। রোগ ব্যাধির নিরাময়ে ওষুধ ও চিকিৎসা ছাড়া মানুষের রক্ষা নেই। তাই রোগ ব্যাধির নিরাময়ে ওষুধের ব্যবহার বেড়ে গেছে। চাহিদার সাথে পাল্লা দিয়ে ওষুধ কোম্পানী ও ওষুধ নিত্যদিন আবিষ্কার হচ্ছে।তবে ওষুধের মানের চেয়ে মূল্য নিয়ে জনভোগান্তি বলে শেষ করা যাবে না। একই কোম্পানীর ওষুধ মাত্র কয়েক গজের মাথায় ভিন্ন ভিন্ন মূল্যে বিক্রি করতে দেখা যায়। এক এক ফার্মেসীতে এক এক রেইটে ওষুধ বিক্রি করা জনগণের মধ্যে বিরূপ মন্তব্য শুনতে পাওয়া যায়।ফলে জনমনে ওষুধ কোম্পানীর বিরোদ্ধে সন্দেহ এবং সমালোচনার চোখে পড়তে হয়। এ ধরনের কার্য্কলাপ থেকে কোম্পানী এবং বিক্রেতাদের সতর্ক থাকা দরকার।বিজিএমএ‘র তথ্য মতে, দেখা যায় গত অর্থবছরে ২ হাজার ৮১৫ কোটি ডলারের পোষাক রপ্তাণী করেছে বাংলাদেশ। এর আগের বছর ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ২ হাজার ৮০৯ কোটি ডলারের পোষাক রপ্তানী হয়েছিল। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে পোষাক রপ্তানীতে প্রবৃদ্ধি ছিলো ১০.১৪ শতাংশ।
উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশের রপ্তানী বাণিজ্যে তৈরী পোষাকের অবদান অনস্বীকার্য্। রপ্তানী বহুমুখীকরণের ক্ষেত্রে ওষুধ শিল্প খুলে দিতে পারে সম্ভাবনার ধার। বাংলাদেশের ওষুধ রপ্তানী প্রতিবছরই বাড়ছে এবং আশা করা হচ্ছে এ শিল্প আগামীতে রপ্তানীর অন্যতম প্রধান খাত হয়ে উঠবে।এ উদ্দেশ্যে চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে ওষুধ শিল্পকে বিশষ সুবিধা দেয়া হয়েছে। ওষুধের কাঁচামাল উৎপাদনকারী প্রতিষ্টানকে ২০৩২ সাল পর্য্ন্ত দেয়া হয়েছে শুল্ক মৌকুফের সুবিধা। এছাড়া ওষুধের কাঁচামাল আমদানীতে ২০ শতাংশ শুল্ক ছাড় পাবেন আমদানীকারকগণ। দেশে ওষুধের কাঁচামাল উৎপাদনের জন্য মুন্সিগঞ্জের গাজারিয়ায় গড়ে তোলা হচ্ছে প্রথম ওষুধ শিল্প নগর। আগামী এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে পুরো দমে এখানে কার্য্ক্রম শুরু হবে। এরই মধ্যে ২৮টি প্রতিষ্ঠানকে ৪২টি প্লট বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। ওষুধ শিল্পের কাঁচামালের জন্য ভারত চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার উপর নির্ভরশীল হতে হচ্ছে ওষুধ শিল্পপ্রতিষ্টানকে। দেশে কাঁচামাল তৈরী হলে তা বিপুল পরিমাণ অর্থ সাশ্রয় করবে। এতে করে ওষুধের উৎপাদন খরচ হ্রাস পাবে। ফলে বিদেশে ওষুধ রপ্তানীর ক্ষেত্রে আরো প্রতিদন্ধীতায় এগিয়ে যাবে বাংলাদেশ। ওষুধের মতো জীবন রক্ষাকারী পণ্য মান সংরক্ষণ করে বিদেশে রপ্তানীর ফলে দেশের ভাবমূর্তি বাড়াতে সহায়তা করবে।
বাংলাদেশের অন্যান্য পণ্য রপ্তানীতেও এ ভাবমূর্তি অবদান রাখবে।ওষুধ শিল্পের পরিসর বৃদ্ধি পেলে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও ব্যাপক ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।সমস্ত প্রতিকূল অবস্থাকে ডিঙ্গিয়ে ওষুধশিল্পকে জাতির অর্থনৈতিক স্বার্থে এগিয়ে নিতে হবে।এ খাতকে আরো গতিশীল ও সম্প্র্রসারণ করা হলে রপ্তানী খাতে বাংলাদেশের অর্থনীতির উপর বিরাট অবদান রাখবে। পোষাক শিল্পের প্রতি রাষ্ট্রের যেভাবে আন্তরিকতা দায়িত্বশীলতা রয়েছে এ শিল্পের প্রতিও এ ধরনের মনোভাব ও রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতা অব্যাহত থাকলে এ শিল্পের বিকাশ পৃথিবী ব্যাপি ছড়িয়ে পড়বে। ওষুধ শিল্পকে একমাত্র অর্থ যোগানের খাত হিসেবে না দেখে দূরারোগ্য রোগির জীবন রক্ষায় সেবার উদ্দেশ্যে এ খাতের উন্নয়ন অগ্রগতির বিকল্প নেই।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও গবেষক


































