বেগম খালেদা জিয়া: আপসহীন নেতৃত্বে গণতন্ত্রের এক দীর্ঘ লড়াই

মোঃ সহিদুল ইসলাম সুমন

৩০ ডিসেম্বর ২০২৫, ১১:৩৪ পিএম


বেগম খালেদা জিয়া: আপসহীন নেতৃত্বে গণতন্ত্রের এক দীর্ঘ লড়াই


বাংলাদেশি রাজনীতির আকাশে একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র আজ অস্তমিত। বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া আমাদের মাঝে নেই। তার এই বিদায় কেবল একটি রাজনৈতিক দলের শূন্যতা নয়, বরং বাংলাদেশের ইতিহাসের এক বিশাল ক্যানভাসে এক সাহসী ও সংগ্রামী অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি। বর্ণাঢ্য এই মহিয়সী নারীর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তিনি ছিলেন এদেশের সাধারণ মানুষের আশা-ভরসার প্রতীক এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামের এক আপসহীন সেনানী।বাংলাদেশের রাজনীতিতে বেগম খালেদা জিয়া এমন এক নাম, যা কেবল ক্ষমতার স্মৃতি নয়—বরং সংগ্রাম, ত্যাগ ও গণতন্ত্রের নিরন্তর লড়াইয়ের প্রতীক। তাঁর রাজনৈতিক জীবনকে কোনো একক ঘটনার মধ্য দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না; বরং এটি বহু বাঁক, বহু সংকট ও বহু সিদ্ধান্তের সমষ্টি। তিনি ছিলেন সময়ের প্রয়োজনে উঠে আসা এক দৃঢ় নেতৃত্ব, যাঁর অবস্থান ইতিহাসের নানা পর্বে প্রভাব রেখেছে।

বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়েছিল এক চরম সংকটময় মুহূর্তে। বেগম খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে প্রবেশ ছিল না কোনো দীর্ঘ প্রস্তুতির ফল। ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর যখন বিএনপি এক কঠিন সময় পার করছিল, তখন দলের হাল ধরতে ঘর থেকে রাজপথে বেরিয়ে আসেন এক সাধারণ গৃহবধূ। তিনি কোনো পদ-পদবির আকাঙ্ক্ষা থেকে নয়, বরং জিয়াউর রহমানের আদর্শকে সমুন্নত রাখতে এবং দলের নেতাকর্মীদের ঐক্যের স্বার্থে নেতৃত্বে আসেন। ১৯৮৪ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিএনপি চেয়ারপারসন নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে তিনি গত চার দশক ধরে দলটিকে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তম রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করেছেন।

রাজনীতির প্রথাগত পাঠ বা অভিজ্ঞতা না থাকলেও খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি দলীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন। এই উত্তরণ দেখায় নেতৃত্ব কখনো কখনো পরিস্থিতি থেকেই জন্ম নেয়।বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও ইতিবাচক অধ্যায় স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা। তিনি কোনো মধ্যপন্থা বা আপসের রাজনীতিতে যাননি। রাজপথের আন্দোলন, দলীয় ঐক্য এবং গণমানুষের সম্পৃক্ততার মাধ্যমে তিনি একটি দীর্ঘ আন্দোলনকে পরিণতির দিকে নিয়ে যান।১৯৯০ সালের স্বৈরাচার পতন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এক মাইলফলক। এই অর্জনের পেছনে তাঁর নেতৃত্ব প্রশ্নাতীতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এটি প্রমাণ করে—গণতন্ত্র কখনো দয়া হিসেবে আসে না, তাকে অর্জন করতে হয়।

১৯৯১ সালে সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর বেগম খালেদা জিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ছিল সংসদীয় শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা। রাষ্ট্রপতি শাসিত কাঠামো থেকে সংসদীয় ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া ছিল শুধু সাংবিধানিক পরিবর্তন নয়, বরং ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও জবাবদিহিতার প্রতি রাজনৈতিক অঙ্গীকার।এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দেয় এবং ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য একটি গ্রহণযোগ্য কাঠামো তৈরি করে।বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেগম খালেদা জিয়া কেবল ইতিহাস সৃষ্টি করেননি, তিনি সমাজে নারীর রাজনৈতিক সক্ষমতার ধারণাকেও নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত করেন। একটি পুরুষতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে তাঁর নেতৃত্ব নারীদের আত্মবিশ্বাস ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।তিনি প্রমাণ করেছেন—নারী নেতৃত্ব কোনো প্রতীকী বিষয় নয়, বরং বাস্তব ও কার্যকর হতে পারে।

বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় স্থিতিশীলতা ছিল একটি উল্লেখযোগ্য দিক। শিল্পায়ন, বেসরকারি খাতের সম্প্রসারণ, বিদ্যুৎ ও অবকাঠামো উন্নয়নে তাঁর সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্ত অর্থনীতির গতি ধরে রাখতে সহায়ক হয়।গ্রামীণ অর্থনীতি, কৃষি উৎপাদন ও কর্মসংস্থানকে গুরুত্ব দেওয়া সাধারণ মানুষের জীবনে প্রত্যক্ষ প্রভাব ফেলেছিল। উন্নয়নের প্রশ্নে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল বাস্তবভিত্তিক, কাগুজে সাফল্যনির্ভর নয়।
মানবসম্পদ উন্নয়নে বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের ভূমিকা উপেক্ষণীয় নয়। প্রাথমিক শিক্ষা, মেয়েদের শিক্ষায় উৎসাহ এবং স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণে গৃহীত কর্মসূচিগুলো সামাজিক অগ্রগতিতে অবদান রাখে।নারী ও শিশু কল্যাণে নেওয়া পদক্ষেপগুলো সমাজের পিছিয়ে পড়া অংশের জন্য একটি নিরাপত্তাবলয় তৈরি করে—যা একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্রচিন্তার পরিচয় বহন করে।

বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক দর্শনের একটি মৌলিক দিক ছিল জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আপসহীনতা। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে তিনি ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি ও আত্মমর্যাদাশীল অবস্থানের পক্ষে ছিলেন।এই অবস্থান তাঁকে সমর্থকদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য এবং সমালোচকদের কাছেও গুরুত্ব পাওয়া একজন নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।বেগম খালেদা জিয়ার পররাষ্ট্রনীতি ছিল 'সকলের সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়'। তবে দেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে তিনি ছিলেন আপসহীন। মুসলিম বিশ্বের দেশগুলোর সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখা এবং সার্ককে (SAARC) শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা প্রশংসিত। তিনি সব সময় চাইতেন বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মাথা উঁচু করে দাঁড়াক। সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া বা অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যার দাবিতে তার দৃঢ় অবস্থান জাতীয়তাবাদী শক্তির অনুপ্রেরণা হয়ে আছে।

দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বেগম খালেদা জিয়া একাধিকবার কারাবরণ, অসুস্থতা ও রাজনৈতিক চাপের মুখোমুখি হয়েছেন। এসব প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি সহিংস বা প্রতিহিংসামূলক রাজনীতিকে উৎসাহ দেননি। বরং ধৈর্য ও নীতিগত অবস্থান বজায় রেখেছেন।এই ব্যক্তিগত ত্যাগ তাঁর রাজনৈতিক জীবনকে আরও মর্যাদাবান করে তুলেছে।
ব্যক্তিগত জীবনে বেগম জিয়া ছিলেন চরম ধৈর্যশীল ও মার্জিত। দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে তিনি কারাবরণ করেছেন, বারবার গৃহবন্দী হয়েছেন, এমনকি তার প্রিয় বড় ছেলে তারেক রহমান প্রবাসে এবং ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো অকালে প্রাণ হারিয়েছেন। কিন্তু কোনো শোক বা প্রতিকূলতা তাকে তার পথ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। চরম দুঃসময়েও তিনি দেশত্যাগ না করে এদেশের মাটিতেই রয়ে গেছেন, যা তার দেশপ্রেমের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
বেগম খালেদা জিয়া এমন এক সময়ে রাজনীতি করেছেন, যখন বাংলাদেশ রাষ্ট্র হিসেবে গণতন্ত্র ও স্থিতিশীলতার প্রশ্নে নানামুখী চ্যালেঞ্জের মুখে ছিল। সেই বাস্তবতায় তিনি ছিলেন এক দৃঢ় কণ্ঠ—যিনি সংসদীয় গণতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্রতিনিধিত্ব করেছেন।ইতিহাস তাঁকে স্মরণ করবে একজন সংগ্রামী নেত্রী হিসেবে, যিনি ক্ষমতার চেয়ে নীতিকে প্রাধান্য দিয়েছেন।খালেদা জিয়া কেবল একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন না, তিনি ছিলেন কোটি মানুষের আবেগ। তার মিছিলে সাধারণ মানুষের যে স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি দেখা যেত, তা প্রমাণ করে তিনি কতখানি জনবান্ধব নেত্রী ছিলেন। সাধারণ মানুষের জন্য তার মমতা এবং বিপদে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর গুণ তাকে 'দেশনেত্রী' থেকে 'মাদার অব ডেমোক্রেসি' বা 'গণতন্ত্রের জননী' উপাধিতে ভূষিত করেছে।

বেগম খালেদা জিয়ার কর্মময় জীবন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁর ইতিবাচক অবদান, আপসহীন নেতৃত্ব ও ত্যাগ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।এই শ্রদ্ধা নিবেদন কোনো দলীয় বক্তব্য নয়; এটি একটি রাজনৈতিক বাস্তবতার মূল্যায়ন। ইতিহাসের পাতায় বেগম খালেদা জিয়া থাকবেন গণতন্ত্রের লড়াইয়ে এক দৃঢ় ও স্মরণীয় নাম হিসেবে।

আজ যখন আমরা তাকে শেষ বিদায় জানাচ্ছি, তখন তার শূন্যতা প্রতিটি রাজপথ ও প্রতিটি জনসভায় অনুভূত হবে। বেগম খালেদা জিয়া একটি নাম নয়, একটি ইতিহাস। একটি জাতির সংগ্রাম ও উত্থানের প্রতীক। তার মৃত্যুতে যে শূন্যতা তৈরি হলো, তা অপূরণীয়। তবে তার রেখে যাওয়া আদর্শ, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং জাতীয়তাবাদের চেতনা চিরকাল বেঁচে থাকবে এদেশের মানুষের হৃদয়ে।আমরা এই মহান নেত্রীর বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করি এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই। বাংলাদেশ তার এই সাহসী কন্যাকে কখনো ভুলবে না।

লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক ও কলামিস্ট ।
Email : msislam.sumon@gmail.com 
 

Ads