নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের চ্যালেঞ্জসমুহ

মো. জিল্লুর রহমান

২২ অক্টোবর ২০২৪, ১২:৫৬ পিএম


নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের চ্যালেঞ্জসমুহ

মো. জিল্লুর রহমান

 

২২অক্টোবর নিরাপদ সড়ক দিবস কিন্তু দেশে প্রতিদিনই সড়ক দুর্ঘটনায় ঝরছে প্রাণ, আহত হয়ে দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছেন অনেকে। দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল কিছুতেই থামছে না। দুর্ঘটনা রোধে আমরা সরকারের পক্ষ থেকে নানা পদক্ষেপ গ্রহণের কথা শুনি। কিন্তু তাতে দুর্ঘটনা কমেনি। বেপরোয়া যান চলাচল বন্ধ হয়নি। এতে বোঝা যায়, দুর্ঘটনা রোধের পদক্ষেপগুলোয় অথবা সেসব কার্যকর করার ক্ষেত্রে নানা গলদ রয়ে গেছে। সেসব দূর করা খুবই জরুরি। দেশে সড়ক দুর্ঘটনার হার অনেক উঁচু। এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, শতকরা ৮০ ভাগ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে থাকে বিরামহীন গাড়ি চালনা, অত্যধিক গতিতে গাড়ি চালনা এবং চালকের অসাবধানতার কারণে। একজন চালক একটানা চার-পাঁচ ঘণ্টা গাড়ি চালানোর পর বিশ্রাম নিয়ে পুনরায় গাড়ি চালাবেন, এটাই নিয়ম। কিন্তু দেশের কোনো চালকই এ নিয়ম পালন করেন না। ফলে একজন ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত চালক যখন গাড়ি চালান, তখন স্বভাবতই দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে বেশি। এজন্য মূলত বাস মালিকদের অত্যধিক ব্যবসায়িক মনোভাবই দায়ী। এ প্রবণতা রোধে সরকারের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।

আজ থেকে ৩১ বছর আগে ১৯৯৩ সালের ২২ অক্টোবর 'নিরাপদ সড়ক চাই’ আন্দোলনের জন্ম হয়েছিল। চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন এক সড়ক দুর্ঘটনায় স্ত্রী জাহানারা কাঞ্চনকে হারিয়ে এ আন্দোলন গড়ে তোলেন। ২০১৭ সালের ৫ জুন মন্ত্রিসভার বৈঠকে ২২ অক্টোবরকে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস হিসাবে পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সেদিন থেকে দিবসটি জাতীয়ভাবে পালিত হয়ে আসছে। এ দিবস পালনের মধ্য দিয়ে প্রতিবছর দেশের সড়ক-মহাসড়কগুলোকে নিরাপদ করার জনদাবি জোরেশোরে উচ্চারিত হয়। তবে প্রশ্ন হলো, এর কোনো সুফল জনগণ পাচ্ছে কি না? আমরা সড়ক কতটুকু নিরাপদ করতে পেরেছি!

২০২৩ সালে বিআরটিএ এর তথ্য মতে, সারা দেশে সড়ক সড়ক দুর্ঘটনায় ৫,০২৪ জন এবং পুলিশের হিসাবে ৪,৪৭৫ জন মারা যায়। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্যে বলা হয়, ২০২৩ সালে ৬,২৬১টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭,৯০২ জন নিহত, ১০৩৭২ জন আহত হয়েছে। একই সময় রেলপথে ৫২০টি দুর্ঘটনায় ৫১২ জন নিহত, ৪৭৫ জন আহত হয়েছে। নৌপথে ১৪৮টি দুর্ঘটনায় ৯১ জন নিহত, ১৫২ জন আহত এবং ১০৯ জন নিখোঁজ রয়েছে। একই সময়ে ২,০৩১টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২,১৫২ জন নিহত ও ১,৩৩৯ জন আহত হয়েছে। সড়ক, রেল ও নৌপথে সর্বমোট ৬,৯২৯টি দুর্ঘটনায় ৮,৫০৫ জন নিহত এবং ১০,৯৯৯ জন আহত হয়েছে। বিগত ৯ বছরে নিবন্ধিত যানবাহনের পাশাপাশি ছোট যানবাহন বিশেষ করে মোটরসাইকেল ও ইজিবাইকের সংখ্যা ৪ থেকে ৫ গুণ বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি ইজিবাইক, মোটরসাইকেল ও ত্রি-হুইলার সরকারের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কে অবাধে চলাচলের কারণে সড়কে দুর্ঘটনা এবং প্রাণহানি বাড়ছে।

অন্যদিকে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন এর তথ্য মতে, 
২০২৩ সালে ৬,৯১১টি সড়ক দুর্ঘটনায় কমপক্ষে ৬,৫২৪ জন নিহত এবং ১১,৪০৭ জন আহত হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ১,১২৮ জন শিশু এবং ৯৭৪ জন নারী। তাছাড়া, ২০২৩ সালে ২,৫৩২টি মোটর সাইকেল দুর্ঘটনায় ২,৪৮৭ জন নিহত হয়েছে, যা মোট নিহতের ৩৮.১২ শতাংশ। ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটেছে। ১,৯৬৭টি দুর্ঘটনায় ১,৬৯৪ জন নিহত হয়েছেন। সিলেট বিভাগে সবচেয়ে কম ৩৪৭টি দুর্ঘটনায় ৩৮৮ জন নিহত হয়েছে। একই সময়ে ১০৭টি নৌ-দুর্ঘটনায় ১৪৮ জন নিহত, ৭২ জন আহত এবং ৪৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন। ২৮৭টি রেলপথ দুর্ঘটনায় ৩১৮ জন নিহত এবং ২৯৬ জন আহত হয়েছেন। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০২২ সালে ২,৯৭৩ দুর্ঘটনায় ৩,০৯১ জন নিহত হয়। ২০২২ সালের তুলনায় ২০২৩ সালে দুর্ঘটনা বেড়েছে ১.২ শতাংশ, প্রাণহানি কমেছে ১৫.৪১ শতাংশ।

আসলে বাংলাদেশে সড়ক পরিবহণ ব্যবস্থা খুবই বিশৃঙ্খল এবং দুর্ঘটনাপ্রবণ, রাজধানী ঢাকার বাস সার্ভিস গুলোতে যা প্রকটভাবে দৃশ্যমান। শিক্ষার্থীরা ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনে নামে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য মতে, এর পর গত পাঁচ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৯,৫২২ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ২৮,২৯৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৫৮,৭৯১ জন আহত হয়েছে। হতাহতের মধ্যে শিক্ষার্থী ছিল ৩,৯৪১ জন। এরপরও বাস্তবায়ন হয়নি নিরাপদ সড়কের অঙ্গীকার। যাত্রী কল্যাণ সমিতির পর্যবেক্ষণ মতে সড়ক দুর্ঘটনার কারণগুলো- বেপরোয়া গতি, বিপদজ্জনক ওভারটেকিং, রাস্তাঘাটের নির্মাণ ত্রুটি, ফিটনেসবিহীন যানবাহনের অবাধে চলাচল, যাত্রী ও পথচারীদের অসতর্কতা, চালকের অদক্ষতা, চালকের বেপরোয়া মনোভাব, চলন্ত অবস্থায় মোবাইল বা হেড ফোন ব্যবহার, মাদক সেবন করে যানবাহন চালানো, লেভেলক্রসিং ও মহাসড়কে হঠাৎ ফিডার রোড থেকে যানবাহন উঠে আসা, রাস্তায় ফুটপাত না থাকা বা ফুটপাত বেদখলে থাকা। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের করা গবেষণা অনুযায়ী, এসব সড়ক দুর্ঘটনার ৫৩% ঘটে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর কারণে; ৩৭% চালকের বেপরোয়া মনোভাবের কারণে এবং বাকি ১০% গাড়ির ত্রুটি ও পরিবেশের কারণে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা ৫৮,৬৪,৫৩৬টি, এর মধ্যে মোটরসাইকেলের সংখ্যাই ৪২,৪০,৮৫৫ টি। ২০১৯ সালের ২০ অক্টোবরের হিসাব অনুযায়ী, এ সংখ্যা ছিল ২৭,৮৬,৯৫৪টি এবং এর বিপরীতে ড্রাইভিং লাইসেন্সের সংখ্যা ১৩,৬০,৯০৩টি। অর্থাৎ তখন সড়কে অবৈধভাবে মোটরসাইকেল চালক ছিল ১৪,২৬,২৫১ জন এবং বর্তমানে এ সংখ্যা অবশ্যই বৃদ্ধি পেয়েছে। আসলে গণমাধ্যমে যে পরিমাণ তথ্য প্রকাশিত হয়, প্রকৃত দুর্ঘটনা তার চেয়ে চার বা পাঁচ গুণ বেশি। সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে শুধু কমিটি গঠন এবং সুপারিশ করার চক্র থেকে সরকারকে বেরিয়ে আসতে হবে। এসবের চেয়ে বেশি প্রয়োজন জনবান্ধব পরিবহণ কৌশল প্রণয়ন করা। এসব কারণে সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকে।

২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে বিবিসির সাথে সাক্ষাৎকারে একজন বাস চালক বাংলাদেশে বেশিরভাগ সড়ক দুর্ঘটনার জন্যে চালকদের অতিরিক্ত পরিশ্রমজনিত ঘুমকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেছিলেন, দিনরাত ২৪ ঘণ্টা ডিউটি করার কারণে ড্রাইভাররা খুবই ক্লান্ত হয়ে পড়েন। সর্বক্ষণ চালকের কাছে থাকা ইঞ্জিনের গরম হাওয়া এবং বাইরের ও আশেপাশের শব্দের কারণেও চালকরা ক্লান্ত হয়ে পড়েন। তাছাড়া, সারা রাত ডিউটি করার পর আমাদেরকে পরদিন সকালে আবার গাড়ি চালাতে হয়। একটা লোক কিভাবে ২৪ ঘণ্টা গাড়ি চালাতে পারে? এক সেকেন্ডের জন্যে চোখ বন্ধ হলেও তো অবস্থা খুব খারাপ! মুহূর্তের মধ্যে দুর্ঘটনা ঘটে যায়। এর জন্য ট্রিপ প্রথা দায়ী। যতদূরের যাত্রাই হোক আসা যাওয়া একজন ড্রাইভারকেই সামলাতে হয়। এরকম অতিরিক্ত পরিশ্রমের কারণে ঘুমে ঢলে গিয়ে তিনি নিজেও একবার দুর্ঘটনা ঘটিয়েছিলেন। তার মতে চালকের ডিউটি যদি সর্বোচ্চ ১২ ঘণ্টা বা তারও কম নির্ধারণ করে দেওয়া হয় তাহলে দুর্ঘটনার সংখ্যা অনেক কমে যাবে।

সড়ক নিরাপত্তা ও নিরাপদ সড়ক নিয়ে কাজ করে বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতি। সংগঠনটি সড়ক দুর্ঘটনার জন্য বেপরোয়া গতিতে যানবাহন চালানোসহ ৯টি কারণ চিহ্নিত করেছে। সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- যানবাহনের বেপরোয়া গতি, ফিটনেসবিহীন যানবাহন ও পণ্যবাহী গাড়িতে যাত্রী বহন, পণ্যবাহী যানবাহন বন্ধের সিদ্ধান্ত অমান্য করা, অদক্ষ চালক ও হেলপার দিয়ে যানবাহন চালানো। সংগঠনটি দুর্ঘটনা কমিয়ে আনতেও ১২টি সুপারিশও করেছে। সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে- অতিরিক্ত ভাড়া-নৈরাজ্য বন্ধ করা, চালকের প্রশিক্ষণ, ঈদযাত্রায় মোটরসাইকেল নিষিদ্ধ করা, ঈদের পরে মনিটরিং কার্যক্রম বহাল রাখা, চালক-শ্রমিকদের বেতন-বোনাস ও কর্মঘণ্টা নিশ্চিত করা, জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিলকে কার্যকর প্রতিষ্ঠানে গড়ে তোলা।

জনগণের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল দুর্ঘটনা রোধে একটি সময়োপযোগী সড়ক পরিবহণ আইন করার। আইন হয়েছে। কিন্তু এর সঠিক প্রয়োগ হচ্ছে না। দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের কঠোর শাস্তির নজির নেই। সড়ক পরিবহণ সেক্টরে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে এ সংক্রান্ত কমিটি ১১১টি সুপারিশ করেছিল, যেগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। এমনকি তখনকার প্রধানমন্ত্রী ২০১৮ সালের জুন মাসে ছয় দফা নির্দেশনা দিয়েছিল। নির্দেশনাগুলো হলো- দূরপাল্লার গাড়িতে বিকল্প চালক রাখা, একজন চালকের পাঁচ ঘণ্টার বেশি গাড়ি না চালানো, চালক ও তার সহকারীর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর সড়কের পাশে সার্ভিস সেন্টার বা বিশ্রামাগার তৈরি করা, অনিয়মতান্ত্রিকভাবে রাস্তা পারাপার বন্ধ করা বা সিগন্যাল মেনে পথচারী পারাপারে জেব্রা ক্রসিংয়ের ব্যবহার এবং চালক ও যাত্রীদের সিটবেল্ট বাঁধা নিশ্চিত করা।

সড়কের নিরাপত্তা একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যু। অথচ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে বিষয়টি তেমন গুরুত্বই পাচ্ছে না, যে কারণে দুর্ঘটনা কমছে না। ভুক্তভোগীদের দাবী, বিগত প্রধানমন্ত্রীর ছয় দফা নির্দেশনা, সড়ক পরিবহণ সেক্টরে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে এ সংক্রান্ত কমিটির ১১১ সুপারিশের দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। সড়ক পরিবহণ আইন যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। সড়কে নিত্যদিন কারও না কারও প্রাণ কেড়ে নিবে, মৃত্যুর মিছিল বাড়তেই থাকবে এবং সময় সময়ে নিরাপদ সড়ক দাবীতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন সংগ্রাম চলতেই থাকবে। এর অবসান হওয়া দরকার। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কবে সবার জন্য নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের স্বপ্ন নিশ্চিত হবে। নাকি নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের চ্যালেঞ্জগুলো অধরাই থেকে যাবে!

 

মো. জিল্লুর রহমান
ব্যাংকার ও কলাম লেখক,
সতিশ সরকার রোড, গেন্ডারিয়া, ঢাকা।

 

Ads