''সচেতন হই, দুর্ভোগ কমাই''

প্রতিদিনেরচিত্র ডেস্ক

১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০৮:২৩ পিএম


''সচেতন হই, দুর্ভোগ কমাই''

প্রায় আমি বলি, 'আমি যা পারি অন্য অনেকেই তা পারে না। আবার অন্যরা যা যা পারে আমি তার অনেক কিছু পারি না'।
যা পারি তা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে চাই কিন্তু পারিনা। না পারা টা আমায় বার বার আঘাত করে, মনে করিয়ে দেয় আমি কি কি পারি না। সেই না পারার মাঝে কিছু আমায় পারতেই হবে। অভ্র আমার ছোট সন্তান। ও প্রায় বলবে, 'আমার কথা তো গায়ে লাগে না। সময় শেষ হলে তখন গায়ে লাগলেও কাজ হবে না।'

আমি পত্রিকায় লিখি, আগে কাগজে কলমেই লিখেছি। এখন মোবাইলে লিখি। আগের লেখা গুলো পত্রিকার লোকেরা কত কষ্ট করে কম্পোজ করে নিতেন। বাসায় কম্পিউটার ছিলো, আহসানের কাজে সাহায্য করার জন্যে কিছু অটোক্যাড এর কাজ শিখেছি। ইচ্ছে ছিল সেই সুযোগে লেখালেখি ও শিখব। কিন্তু অর্ধেক কাজে এসে কম্পিউটার নষ্ট। আমার ব্যক্তিগত কাজের জন্যে কেউ কম্পিউটার ঠিক করে দিবে না, তবুও চেষ্টা করেছি ঠিক করার। কিন্তু হল না। বড় মেয়ে ল্যাপটপ ব্যবহার করে ৪ বছর থেকে। কিন্তু আজও আমি তা চালানো শিখতে পারিনি। চার/পাঁচ হাজার শব্দের লেখা আমি মোবাইলের নোট এ লিখি। ছোট ছোট করে লিখে জোড়া দিয়ে পত্রিকায় পাঠাই। বিভাগীয় সম্পাদক সেই লেখা ছাপিয়ে আমায় ঋণী করেন। ল্যাপটপ এ না লিখে মোবাইলে দুই বা এক আঙ্গুলে লিখি শুনে নাদিম মজিদ ভাই বলেন, 'লিফট থাকতে আপনি সিঁড়ি দিয়ে উঠেন'। কথাটা বেশ লাগছে।

দেশের বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি লাইব্রেরীগুলো লেখক ও প্রকাশকদের কাছ থেকে প্রায় প্রতিবছর বই ক্রয় করেন। এটা আগে থেকেই জানা আমার। কি ভাবে কি করতে হয় আমি জানিনা। পত্রিকায় সার্কুলার দেখে লেখক হিসাবে বই জমা দিব। চৌধুরী সাব্বির ভাইয়ের সহযোগিতায় কাগজপত্র রেডি করে জমা দিই। গতবছর পাবলিক লাইব্রেরী আমার মুক্তিযুদ্ধের বই 'একাত্তর ও নারী' বইটি ক্রয় করেন। ইসলামী ফাউন্ডেশন বায়তুল মুকাররম মুক্তিযুদ্ধের বই 'একাত্তর ও নারী' ও প্রবন্ধের বই 'নক্ষত্ররাজির কথা' ১৩১ (একশ একত্রিশ)  কপি করে ক্রয় করেন। ২০১৯-২০ অর্থ বছরে বই ক্রয় করার জন্যে সার্কুলার দেয়। গতবছরের মতো সাব্বির ভাইয়ের সহযোগিতায় সিডি আর ফরম রেডি করি। এসব দেখেই অভ্র বলে, 'নিজে কাজ শিখো, ল্যাপটপ কেনো'। কিন্তু কে কিনে দিবে, কে শিখাবে? বই জমা দিতে যাবো শাহবাগ পাবলিক লাইব্রেরীতে। লেখালেখি করলেও আমার প্রথম কাজ পরিবারের তিন 'স'(স্বামী, সন্তান, সংসার) এর দায়িত্ব পালন করা। সাধারণত ভোর থেকে সকাল ৯/১০টা পর্যন্ত সংসারের কাজ করে পড়ালেখা করতে বসি ১২টা পর্যন্ত। এই দুই ঘন্টা ছুটা বুয়া কাজ করে। ১২টায় উঠে একটু কাজ সেরে নামাজ পড়ে ১টায় অভ্র'র স্কুলে। দিনের বাকি অংশ ওর জন্যে। আজ এই এই স্যার কাল ওই ওই স্যারের কাছে। সন্ধ্যা থেকে রাত সাড়ে নয়টা রাতের খাবার সেরে আবার লেখাপড়া করতে বসি রাত এগারোটা থেকে সাড়ে এগারোটা পর্যন্ত।

পাবলিক লাইব্রেরি যাব অপেক্ষা করছি বুয়ার জন্যে। দশটায় আসার কথা থাকলেও এগারো টা পর্যন্ত অপেক্ষা করে বের হয়ে যাই। ইচ্ছে ছিল তাকে ঘরে রেখে এই ফাঁকে কাজ সেরে আসবো। কিন্তু নিয়মের ব্যাঘাত শুরু এখান থেকেই। ফার্মগেট থেকে শাহবাগ বাসে যেতে খুব বেশি হলে ১৫ মিনিট লাগার কথা। সেখানে ৪০ মিনিট সময়ে পৌছালাম কারওয়ান বাজার। ড্রাইভারের বাম পাশে দুই সিট, সামনের সিটে ৩৫/৩৮ বছর বয়সি এক নারী, পেছনের সিটে ৫০ বছর বয়সি এক নারী , আমি পেছনের সিটে বসি। একটু পর ৫০/৫৫ বয়সি এক লোক এসে বসে সামনের সিটের মহিলার পাশে। প্রায় সময় লোকটা মহিলার ঘাঢ়ের দিকেই তাকিয়ে ছিল, যা আমি পেছন থেকে দেখছি। মহিলা স্বাভাবিক পোষাকেই ছিল, জানিনা এই লোক মহিলার ঘাঢ় দেখে কি সুখ পাইলো।

কারওয়ান বাজার থেকে ১০ মিনিটে পরিবাগ পৌছাই। পরিবাগ যাওয়ার পর ড্রাইভার হেলফার বলল, ' বাস সোজা যাবে না, বাম দিক দিয়ে যাবে। যারা শাহবাগ নামার কথা তারা এখানে নেমে যান।' কথাটা শুনে পুরাই মাথা খারাপ। এখান থেকে হেঁটে পাবলিক লাইব্রেরী যাওয়া আমার সম্ভব নয়। কারণ আমার পায়ে সমস্যা। ৫/৬ জন যাত্রী শাহবাগ নামার কথা। আমি সহ দুই মহিলা। বাস সোজা কেন যাবে না জিজ্ঞেস করায় তারা জানায়, সোজা গেলে অনেক সময় লাগবে, সামনে জ্যাম। পেছন থেকে কয়েকজন পুরুষ যাত্রীর কথা, 'আপনাদের কয়েকজনের জন্যে কি সবাই জ্যামে থাকবে? ওই তো শাহবাগ দেখা যায়, একটু হেঁটেই যান। দুই মিনিট সময় লাগবে'। এই নিয়ে কথা কাটাকাটি, কিছুই হল না। বাধ্য হয়ে সেখানেই নামতে হয় আমায়। দশ মিনিটে হেঁটে শাহবাগ পাবলিক লাইব্রেরী গেলাম। মানে ফার্মগেট থেকে শাহবাগ আসতে একঘন্টা শেষ।

কাজ সেরে ত্রিশ মিনিটের মাথায় আবার শাহবাগ এসে মিরপুরের একটা দোতলা বাসে উঠি। বাসটি তখন ফুলের দোকান গুলোর সামনে সিগনালে ছিলো। ঢাকা শহরে এমন অল্প সময়ের যাতায়াতে আমি দোতলা বাসেই পছন্দ করি, কারণ এগুলো দুই দুয়ারী বাস। উঠা নামায় ধাক্কাধাক্কি হয় কম। বাসে উঠেই সামনের সারির লাগানো চারটি সিটের একটিতে বসি। দুই পাশে দুই সিট খালি। সামনের দরজা দিয়ে উঠতে ডান পাশের দুই সিট মহিলাদের জন্যে বরাদ্দকৃত। মানে সেই 'নারী শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্যে' লেখা সিট। সেই দুই সিটে বসে আছে পুরুষরা। ব্যক্তিগত ভাবে নিজের জন্যে আমি বাসে উঠে কখনও পুরুষদেরকে বরাদ্দকৃত মহিলা আসন থেকে সরতে বলিনা। তবে অন্যদের জন্যে বলি। বঙ্গবন্ধু হাসপাতালের সামনে বাস আসলেই অনেকে উঠে। হেলফার বারবার পুরুষদের বলছে পেছনের গেইট দিয়ে উঠতে। কারণ সামনের গেইট দিয়ে মহিলারা উঠছে।

কয়েকজন মহিলা উঠলো, দুজন দাঁড়িয়ে আছে। অথচ মহিলা সিটে বসে ঘুমাচ্ছে একলোক। হেলপারকে বললাম সিট খালি করতে, বুঝলাম সে বললে ঘুমন্ত লোক উঠবেন না। তাই নিজেই বললাম। প্রথম বলার পর উঠেনি, পরে বললাম, 'বাসে লেখা মহিলা ও প্রতিবন্ধী, তার মানে মহিলা ছাড়া মহিলা সিটে যারা তাদের সবাই প্রতিবন্ধী'।
কথাটা খুব লেগেছে লোকের, বাধ্য হয়ে উঠলেন, মহিলারা বসলো। ২৫/৩০ বছর বয়সি এক মহিলা হাতে কলা, পাউরুটি, পানি নিয়ে উঠলেন। সিট পেয়ে বসেই কলা পাউরুটি খাওয়া শুরু করলেন। আমি অপেক্ষা করছি উনার কলার ছাল কই রাখে তা দেখার জন্যে। হায় হায়, মহিলা কলা খেয়ে টপ করে জানালা দিয়ে ছাল বাইরে ফেললো। আমি পুরাই অবাক। মনে হচ্ছে এই রাস্তাটা ওর বাপে রেখে যাওয়া ডাস্টবিন। অপেক্ষা করছি আরেকটা কলা খাওয়ার। দ্বিতীয় কলা প্রায় খাওয়া শেষের দিকে আসতেই বললাম,
'কলার ছালটা বাইরে না ফেলে আপনার ব্যাগেই রাখেন'।

কথা শুনে তিনি তাই করলেন। সাথে সাথে আশেপাশের দুইতিনজন মাথা নাড়ালেন। উনারা বুঝাতে চেয়েছেন যে আমি ঠিক কাজটাই করেছি। এরই মাঝে মহিলা তৃতীয় কলা খেলেন। খেয়ে কলার ছাল ব্যাগেই রাখলেন। হেলফার সামনের গেইট দিয়ে মহিলা উঠাচ্ছে দেখে কথা বললাম, সে জানালো, 'আপা চেষ্টা করি পুরুষদের পেছনের গেইট দিয়ে উঠাতে, কিন্তু কিছু লোক কথাই শুনেনা। তারা সামনে দিয়েই উঠবে'। উনাকে বললাম, 'আপনার দায়িত্ব আপনি পালন করবেন, সবাই না শুনুক, কিছু লোকতো শুনবেই। একদিন দেখবেন এটা নিয়ম হবেই যে পুরুষরা পেছনের গেইট দিয়েই উঠতে হবে। আর আমরা ও দাবী জানাচ্ছি সব বাস দুই দুয়ারী করার জন্যে'। কথা শুনে হেলফার খুশি হলেন। ফার্মগেট বাস চলে আসে, আমি নেমে পড়ি। হাঁটতে গিয়ে বুঝতে পারি আমার পায়ে ফোসকা পড়েছে সেই পরিবাগ থেকে হেঁটে যাওয়ার জন্যে। পায়ের জুতার পেছনের অংশ নামিয়ে দিয়ে অনেক কষ্টে বাসায় আসি ১২ টা ৪৫ মিনিটে। যাই অভ্র'র স্কুলে। বাসায় এসে শুনতে পারি বুয়া এসেছিল দুপুর ১২ টায়। অথচ তার আসার কথা  ছিলো ১০ টায়। শুনেছি এন্টিবায়োটিক ওষুধ একঘন্টা আগে বা পরে খাওয়া যায়। এর বেশি নড়চড় করা যায় না। আমিও বুয়ার জন্যে ১১টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেছিলাম, কিন্তু সে তখন আসে নি।

মাত্র দুই ঘন্টার কিছু কথা এখানে, যার অধিকাংশ অংশ জুড়ে রয়েছে অনিয়ম, সচেতনহীন ব্যক্তিদের উদাসিনতা। যাওয়ার সময় জ্যামে প্রচুর সময় লাগে, আসার সময় অল্প। কিন্তু যাওয়া আর আসা দুই সময়েই দেখেছি বাস চালকদের প্রতিযোগিতা। যা সম্পূর্ণ রুপে বেআইনি। যাওয়ার সময় জ্যাম ছাড়লেই বাস চলতে গিয়ে লাগিয়ে দেয় অন্য বাসের সাথে। আসার সময় রাস্তা ফ্রি, পাশাপাশি মিরপুরের দুই বাস হওয়াতে কে কার আগে যাবে। অথচ আমরা একটু সচেতন হলেই কোন অনিয়ম থাকে না। প্রতিটা ব্যক্তিই যদি নিজের কাজ ঠিক সময়ে করি তাহলে সমস্যাই থাকেনা। যদি ঠিক দায়িত্ব পালন করি কেউ কাউকে কিছু বলতে পারবে না। বাধ্য হয়ে বাসায় ফিরে নিজের টাইমলাইনে লিখি, "রহিমা তুই ঘর থেকে বের হওয়ার কোন দরকার নাই, তুই বাসায় থাক। কে বাসে তাকালো, কে বাস জোরে চালালো, কে মহিলা, কে প্রতিবন্ধী আর কে কলার ছাল ফেললো তা দেখতে হবে না। তুই ঘরে বসে জীবনের তিন 'স' (স্বামী, সন্তান,সংসার) এর দায়িত্ব পালন কর। সাহিত্যিক সাংবাদিক কলামিস্ট হওনের দরকার নাই, সেসব হওনের অনেক লোক আছে"।

জুতার পেছনের অংশ নামিয়ে হাঁটার কারণে পায়ের গোড়ালির ব্যাথা বেড়ে যায়। বাসায় কষ্ট করেই চলছি, ঘরের লোককে বলতে পারছিনা পা ব্যাথার কথা। কারণ তিনি জানেন ই না আমি পাবলিক লাইব্রেরী গিয়েছি। শুধু কি তাই, আমার ১২ খানা বই বের হয়েছে, মেয়ের দুইখানা বই, মা ও দুই মেয়ের যৌথ বই(বাংলাদেশে প্রথম মা ও মেয়ের যৌথ বই এটি) তার খবর ও তিনি জানেন না। সে অনেকটা ব্যক্তিগত বিষয়।

প্রিয় পাঠক, আমার এতো সমস্যার কথা শুনে হয়তো বলবেন, আমি বাসে না গিয়ে সিএনজি বা উবারে যাইনি কেনো? শাহবাগ যেতে আর আসতে আমার খরচ হয়েছে ১০+৫=১৫/- টাকা। আর সিএনজি বা উবারে যেতে ভাড়া লাগতো ২০০/২৫০ টাকা আবার আসতে  ২০০/২৫০ টাকা। যেখানে নিয়ম মেনে বাস গেলে আমি ১৫টাকায় যাওয়া আসা করতে পারি, সেখানে ৪০০/৫০০ টাকা খরচ করবো কেনো? বা কই থেকে? মহিলাদের চলার পথে পাবলিক বাসে উপযুক্ত সেবা না পেয়ে অতিরিক্ত খরচে চলতে হয় এমন ঘটনা নিয়ে বহু লিখেছি। পরিশেষে একটাই কথা নিয়ম আর নীতি ঠিক রাখলে থাকলে প্রতিটা সময় আমাদের নিরাপদ হতে পারে।

লেখক- সাহিত্যিক কলামিস্ট ও প্রাবন্ধিক।

 

Ads